স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ নিয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো দুশ্চিন্তায়

প্রকাশিত: ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ, রবি, ২৪ জানুয়ারি ২১

নিউজ ডেস্ক।।

টানা ১১ মাস ধরে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত দেশের সাড়ে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী ঘরবন্দি। করোনার টিকা আসায় অবশেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। শুক্রবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছেন প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা।

গতকাল শনিবার থেকে স্কুল-কলেজে শুরু হয়েছে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। বন্ধ থাকা ক্লাসরুম, ধুলা পড়া ব্ল্যাকবোর্ড আর প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় চলছে ধোয়া-মোছার কাজ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার প্রস্তুতির খবরে ঘরবন্দি শিক্ষার্থীরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। তারা দ্রুত ক্লাসে ফিরতে চায়।

তবে একসঙ্গে নয়, ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে খুলে দিলে কোনোভাবেই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা সম্ভব হবে না। এজন্য গ্রামাঞ্চলে ও করোনায় অপেক্ষাকৃত কম আক্রান্ত জেলা, উপজেলাগুলোর স্কুল-কলেজ আগে খুলে দিতে হবে। তাদের অভিমত, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে একটু পরে খোলা যুক্তিসংগত হবে।

এদিকে রাজধানীর বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। যদি এখনই খুলে দেওয়া হয়, তাহলে রাজধানীর বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি বজায় রাখা যাবে না। কারণ কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ২৮ থেকে ৩০ হাজার ছাত্রছাত্রী। এসব প্রতিষ্ঠানের রয়েছে একাধিক ক্যাম্পাস। খোদ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভায় স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হলেও এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না তারা। আশঙ্কা ভর করেছে অভিভাবকদের মনেও। জানা গেছে, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ২৮ হাজার ছাত্রী। বেইলি রোডের মূল ক্যাম্পাস ছাড়াও রাজধানীর ধানমন্ডি, আজিমপুর ও বসুন্ধরায় তাদের আরও তিনটি ক্যাম্পাস। খ্যাতনামা অপর প্রতিষ্ঠান মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের রয়েছে ৩০ হাজার শিক্ষার্থী। কলেজ শাখা শুধু মেয়েদের। মতিঝিলের মূল ক্যাম্পাস ছাড়াও বনশ্রী ও মুগদায় তাদের আরও দুটি শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। মিরপুরে মনিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজারের কাছাকাছি। মনিপুরে মূল বালক ও মূল বালিকা শাখা ছাড়াও রূপনগর, শেওড়াপাড়া ও ইব্রাহীমপুরে তিনটি শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। ভর্তির চাপ থাকায় করোনার আগে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই একাধিক সেকশন এবং প্রতিটি সেকশনে আবার ঠাসাঠাসি, গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হয়। এখন এসব প্রতিষ্ঠানে কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে খোদ শিক্ষকরাই অনেকে দুশ্চিন্তায়।

এ বিষয়ে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক শনিবার বলেন, কোনোভাবেই গাদাগাদি বা ঠাসাঠাসি করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার সুযোগ নেই। আমরা বলে দিয়েছি, প্রতিটি বেঞ্চ ৫ ফিট দূরত্বে বসাতে হবে। আর সব শিক্ষার্থীকে একই দিনে ক্লাসে আসতে হবে না। কোন ক্লাসে কাদের কবে আসতে হবে তা আমরা শিগগিরই জানিয়ে দেব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঠিক কবে প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে সে বিষয়ে এখনও তারা কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা পাননি সরকারের কাছ থেকে।

মাউশির সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক-১) আমিনুল ইসলাম টুকু জানান, শুক্রবার নির্দেশনা দেওয়ার পর শনিবার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানরা বিদ্যালয়ে জোরেশোরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করেছেন।

মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ হাফিজুল ইসলাম শনিবার জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শ্রেণিকক্ষ পরিস্কার কাজ শুরু হয়েছে। তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানে কলেজ শাখা পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী। তিনি ভাবছেন যে একটি শ্রেণিকক্ষে ২০ জনের বেশি বসাবেন না। ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সাবিনা ইয়াসমিন জানান, পুরো বিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিস্কার কাজ হচ্ছে। তারা ছাত্রদের আসার অপেক্ষায়। রূপনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা কামরুন নাহার চৌধুরী বলেন, তিনি একটু আগেভাগেই বিদ্যালয় পরিস্কার করে রেখেছেন। ছাত্ররা আসছিল, ভর্তি হচ্ছিল, বই দিচ্ছিলেন। এবার পুরোপুরি খুলে দিলেই তিনি ক্লাস শুরু করতে পারবেন।

স্কুল খোলার প্রস্তুতি হিসেবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে উৎসাহের সঙ্গেই অংশ নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী নীল মণি কান্ত বিশ্বাস বলেন, ভালো লাগছে, আবার স্কুল জমজমাট হয়ে উঠবে। খুশি শিক্ষকরাও। তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক সাজেদুল আলম বলেন, ছাত্রীদের পদচারণায় আবার বিদ্যালয়ের আঙিনা মুখরিত হবে, আমরা আবার ক্লাসরুমে পাঠদানে ফিরে যেতে পারব, ভালো লাগছে।

খুশি অভিভাবকরাও। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল খোলার প্রস্তুতিতে আমরা খুশি। তবে খোলার পর যেন স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি প্রতিপালিত হয়। তিনি বলেন, গত বছর শ্রেণিপাঠে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। স্কুল খোলার পর তা পুষিয়ে নিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য সরকার যেন দ্রুত একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে।

তবে একসঙ্গে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিপক্ষে বিশেষজ্ঞরা। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী শনিবার  বলেন, অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। তবে তা ধাপে ধাপে। একসঙ্গে সব বা আগে শহরাঞ্চলের প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া ঠিক হবে না। আর অন্তত দুই সপ্তাহ প্রস্তুতি নিয়ে তা খুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল নয়, এটি খোলার সঙ্গে অভিভাবক, প্রতিটি পরিবার ও প্রতিটি শিক্ষকও সমভাবে জড়িত। তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা ও শহরে সার্ভেইল্যান্স টিম গঠন করতে হবে। যেন খোলার পর কোনো সমস্যা তৈরি হলে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

মাউশির নির্দেশনা: শুক্রবার রাতে সারাদেশের স্কুল-কলেজপ্রধানদের একটি নির্দেশনা পাঠায় মাউশি। সেখানে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে স্কুল-কলেজ খোলার জন্য প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে একটি গাইড লাইনও দেওয়া হয় এ নোটিশের সঙ্গে।

গাউড লাইনে বলা হয়, তিন ফুট দূরত্বে ক্লাসরুমের বেঞ্চগুলো স্থাপন করতে হবে। পাঁচ ফুটের কম দৈর্ঘ্যের একটি বেঞ্চে একজন শিক্ষার্থী এবং পাঁচ থেকে সাত ফুট দৈর্ঘ্যের বেঞ্চে দু’জন শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যবিধি মেনে গাইড লাইন অনুসারে ক্লাস করতে পারবে। স্কুলে ঢোকার আগেই থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে হবে।

কভিড-১৯ বিস্তার রোধে প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সময় সবার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সবার জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষার্থীরা যাতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলাফেরা করতে পারে এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থারও পরিকল্পনা নিতে হবে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের যে মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে তা থেকে মুক্ত করার জন্য নিরাপদ ও আনন্দঘন শিখন কার্যক্রমের পরিকল্পনা নেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা: করোনার কারণে ১৭ মার্চ থেকে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো বন্ধ রয়েছে সারাদেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। কবে এসব প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে যখনই খুলে দেওয়া হোক না কেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বেঁধে দেওয়া শর্তাবলি প্রতিপালন করে বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার জন্য একটি পরিকল্পনা (স্কুল রি-ওপেনিং প্ল্যান) তৈরি করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১৮ আগস্ট এই পরিকল্পনা জারি করেছে এ মন্ত্রণালয়। এতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, স্কুল খুলে দেওয়ার পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালিত হবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুখে মাস্ক পরা, হাত পরিস্কার ও থার্মোমিটার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। আগের মতো প্রতিদিন সব বিষয়ের ক্লাস হবে না। কবে কোন বিষয়ের ক্লাস হবে তা শিক্ষক ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির (এসএমসি) সদস্যরা বসে নির্ধারণ করবেন।

এ পরিকল্পনায় রয়েছে, বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের গেটে বা প্রবেশের স্থানে হাত ধোয়ার জন্য সাবান ও পানির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করবে। থার্মোমিটার দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মেপে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে প্রবেশ করানো হবে।

পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আগের মতো ক্লাসে এক বেঞ্চে তিন বা চারজন শিক্ষার্থী বসতে পারবে না। দূরত্ব বজায় রেখে পাঠদান করা হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এক বেঞ্চে দু’জন শিক্ষার্থীকে বসাতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের আগের মতো আর সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস হবে না। একটি স্তরে সপ্তাহে দুই বা তিন দিন অথবা প্রতিদিন দুই-তিনটি ক্লাস নেওয়া হবে। তবে ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ শ্রেণিকে অধিক গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যক্রম নির্বাচন করে কোন দিন কোন বিষয়ের ক্লাস নেওয়া হবে তা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও এসএমসির সদস্যদের নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।

বিদ্যালয় চলাকালে করণীয় হিসেবে এ পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ে আসতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক মুখে মাস্ক পরে আসতে হবে। বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে ভিড় করে খেলাধুলা, আড্ডা-গল্প করতে পারবে না। সামাজিক দূরত্ব রেখে হাঁটাচলা করতে হবে। নোটিশ বোর্ডে বিদ্যালয় শিক্ষক, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যোগাযোগ নম্বর লিখে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তাকে চিকিৎসা দিতে বলা হয়েছে।সুত্র সমকাল

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.