সীমিত হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স কোর্স কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে অনার্স বা স্নাতক কোর্সের কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। প্রচলিত অধ্যয়ন কৌশলেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আগামী বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট গ্রাজুয়েট বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ১২টি কোর্স।

মোদ্দাকথা উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমকে যুগোপযোগী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অধীনে দেশের ২২৮৩ কলেজে প্রায় ২৯ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স কোর্স নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-পর্যালোচনা এবং শিক্ষাবিদদের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারি কলেজের সংখ্যা ৩০৭। বাকিটা বেসরকারি। গত দুই বছরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নতুন করে কোনো কলেজকে অধিভুক্ত করেনি। উল্টো যেসব কলেজে অনার্স চালু আছে তা কতোটা সক্ষমতা সম্পন্ন তা নতুন করে খতিয়ে দেখার চিন্তা-ভাবনা করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। গত দুই বছরে ডিগ্রিতে প্রায় চার লাখ আসন কমানো হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স কোর্স সম্পন্নকারীদের মধ্যে মাত্র ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে ঢুকতে পারে। বাকিরা ব্যবসা, অভিবাসনসহ অন্য বিকল্প পথে হাঁটতে বাধ্য হয়। তবে আশার দিক হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে চাকরিতে প্রবেশ করা মোট শিক্ষার্থীদের ৬২ শতাংশই ব্যবসায় প্রশাসনের।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)’র ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে ২০১৭ সালে। পৌঁছে গেছে ১২.৮ শতাংশে। আর উচ্চ শিক্ষিতদের মাঝে বেকারত্ব ১০.৭ শতাংশ। যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মাঝে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের দেশে বেকার ছিল ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। যা আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পায় ৮৭ হাজার। প্রতি বছর শ্রমবাজারে ১৩ লাখ মানুষ প্রবেশ করে। আর প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মাঝে ৪৭ শতাংশই বেকার থেকে যাচ্ছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে বর্তমানে ৩০টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে। যার মধ্যে অধিকাংশ কলেজগুলোতে থাকা অধিকাংশ বিষয়সমূহই চাকরি বাজারের সঙ্গে অনুপযোগী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সব থেকে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, বাংলা, ইতিহাস, দর্শন ও ইংরেজি। অর্থাৎ মানবিকের বিষয়সমূহ। এসব বিষয়লব্ধ জ্ঞান চাকরি বাজারে কোন কাজে আসছে না।

শিক্ষার্থীদের চাকরি বাজারে দক্ষতা বাড়াতে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্স চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আগামী বছরের শুরু থেকে পর্যায়ক্রমে চালু হবে এসব কোর্স। এ ধরনের মোট ১২টি ডিপ্লোমা কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোর্সগুলো হলো ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি), ল্যাংগুয়েজ ইংলিশ অ্যান্ড অ্যারাবিক, অন্ট্রাপ্রেনারশিপ, ফার্মিং টেকনোলজি, ডাটা অ্যানালাইসিস, ট্যুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেল ম্যানেজমেন্ট, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ক্যাপিটাল মার্কেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, সার্টিফাইড অ্যাকাউন্টিং টেকনিশিয়ান, সাইবার সিকিউরিটি ও সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটা সময় তীব্র সেশনজটের ছোবলে জর্জরিত ছিল। এরপর ধীরে ধীরে তা কমিয়ে আনা হয়। যদিও করোনার কারণে কিছুটা সেশনজটের কবলে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতে চাহিদা বৃদ্ধি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। চলতি বছরে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় প্রশাসনের জন্য এসএসসি ও এইচএসসি উভয় ক্ষেত্রে চাওয়া হয়েছে ন্যূনতম জিপিএ-৩.৫।

আর মানবিক বিভাগের জন্য এসএসসি’তে ৩.৫ ও এইচএসসিতে ৩.০। পূর্বে অনার্সে আবেদনের জন্য এসএসসি এবং এইচএসসি মিলিয়ে সর্বনিম্ন ৫ (২.৫০+২.৫০) পয়েন্ট চাওয়া হয়েছিল। যদিও এই সিদ্ধান্তে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। তাদের ক্ষোভের কারণ ছিল ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে মোট আসন ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার। এর মধ্যে প্রথমবর্ষে ভর্তি হয়েছিল ৩ লাখ ৯৭ হাজার শিক্ষার্থী। ব্যাপক পরিমাণ আসন ফাঁকা থাকার পরও ভর্তি যোগ্যতা শিথিল না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেক ভর্তিপ্রত্যাশীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের অনার্স বা ডিগ্রি থেকে সরিয়ে ডিপ্লোমা ও শর্ট কোর্সগুলোতে ভর্তি করাতে চায়। তারা শিক্ষিত বেকার তৈরি না করে দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান প্রসার উপযোগী করে গড়ে তোলা। আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে শিক্ষক সংকট। এই সংকট নিরসনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ধরনা দিতে হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে। তারা নিজেরা নিয়োগ দিতে পারেন না শিক্ষক।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর মো. মশিউর রহমান বলেন, আমরা অনার্সের পরিসর আর বড় করছি না। আবার নতুন কলেজ অন্তর্ভুক্তিতে যাচ্ছি না। যুগোপযোগী, যুৎসই প্রয়োজনীয় বিষয় মনে হলে ভবিষ্যতে নতুন বিষয় খোলার পরিকল্পনা আছে আমাদের।

আমরা শিক্ষার্থীদের অনার্স বা ডিগ্রিতে না নিয়ে ধীরে ধীরে ডিপ্লোমা ও শর্ট কোর্সগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যেতে চাচ্ছি। সেটাও রাতারাতি সম্ভব হবে না। ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্সে শর্ট কোর্সগুলোকে এমবেডেড করবো। আইসিটি, ল্যাংগুয়েজ, এন্ট্রাপ্রেনারশিপ কম্পলসারি করবো। তবে আমরা শিক্ষক সংকটের কারণে খুব সহজে এসব করতে পারছি না। তবে কলেজে আপাতত না দিলেও কেন্দ্রীয়ভাবে শুরু করার পরিকল্পনা আছে।