সীতাকুণ্ড ট্রাজেডি এবং চট্টলাবাসীর মানবিকতার অনন্য নজির

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম।।

গত ৪ জুন রাতে সীতাকুণ্ড বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ও বিষ্ফোরণে এই লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৯ জন দমকল বাহিনীর সদস্য রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরো বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়ার কারণে অনেককে চেনাও যাচ্ছেনা।

যে কারণে ডিএনএ টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অগ্নিকান্ডে আহত হয়েছেন আরো চার শতাধিকেরও বেশি মানুষ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা ও স্বজনদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়। চট্টগ্রামে এ ধরণের মর্মান্তিক ঘটনা এর আগে ঘটেছে বলে জানা নেই।

নিহত এবং তাদেের স্বজনদের এক একটি দৃশ্যপট হৃদয়ে বেদনার সৃষ্টি করে। আহতদের জন্য প্রচুর পরিমাণে রক্তের প্রয়োজন হয় বিধায় অনেকে রক্ত দান করতে ছুটে আসেন হাসপাতালে। রক্তদাতাদের এমন মানবিক আচরণ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। অনেক দূর থেকেও লেকজন ছুটে আসেন রক্ত দিতে। শুধু রক্ত নয়, ঔষধসহ যাবতীয় সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছেন চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ যাদের মধ্যে তরুণ ও যুবকদের আধিক্য দেখা গেছে।

এছাড়া, চট্টগ্রামের এপিক হেলথ কেয়ার, শমসের পাড়া মেডিকেল, ইবনে সিনাসহ বেশ কয়েকটি ক্লিনিক আহতদের বিনামূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা করার ঘোষণা দেয়। নানা সংগঠন, সংস্থাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এই দুর্যোগকালে সহযোগিতা ও সহমর্মিতা এবং মানবিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন চট্টলাবাসী। মানুষ মানুষের জন্য – এ কথাটি আবারো প্রমাণ করেন এ অঞ্চলের মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সব সামর্থ্য নিয়ে নিজেদের উজাড় করে দিতে উন্মূখ চাঁটগাবসী।

পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা ছিল খুবই প্রশংসনীয়। তাদের কর্মীদের প্রাণ উৎসর্গই সেটা জানান দিয়েছে। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল সেটা তদন্তের আগে পুরোপুরি জানা সম্ভব নাও হতে পারে। একেকজন একেক মন্তব্য করেছেন। কন্টেইনারে রাখা দাহ্যপদার্থ আগুনের সংষ্পর্শে এসে বিষ্ফোরিত হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। এই দাহ্য পদার্থ যাতে কোনভাবেই সমুদ্রের পানিতে না মেশে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

যেহেতু আগুন নেভাতে দীর্ঘসময় ধরে চেষ্টা হয়েছে সেহেতু ধোঁয়ায় ডিপোর আশপাশের পরিবেশ দূষিত হতে পারে। এমনিতে বিষ্ফোরণে ডিপোর বাইরে পাঁচ মাইল এলাকা কেঁপে উঠে। ভেংগে যায় বাড়িঘরের জানালার কাঁচ এবং দরজা।

এত মানুষের হতাহতের দায় নেবে কে? সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা উচিত। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকান্ডের ঘটনা সংঘটিত হয় এবং তাতে মারা যায় শত-হাজার মানুষ। কিন্তু অসহায় ও দুর্বল শ্রেণির মানুষেরাই ঠকেছে সবসময়। বিচার পায়নি তারা, পায়নি যথাযথ সাহায্য-সহযোগিতা। জীবনজীবিকার তাগিদে তারা শ্রম দিয়ে গেলেও তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবসময় উপেক্ষিত থেকেছে। বারবার আগুনে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে মানুষ। অথচ ব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে আগের মতোই।

শ্রমিক কিংবা কর্মরত সব কর্মজীবী মানুষের চাকরিস্থলে পূর্ণ নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সীতাকুণ্ড ট্রাজেডিতে নিহত ও আহতদের পরিবারসহ ক্ষতিগ্রস্ত সব মানুষকে উপযুক্ত সাহায্য প্রদান করতে হবে। সর্বাগ্রে মালিকপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। যদিও ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থা থেকে সাহায্যের ঘোষণা এসেছে। পাশাপাশি সরকার ও সামর্থ্যবান মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। আর কোন ট্রাজেডি আমরা চাইনা। আসুন সবার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলি।

লেখক: শিক্ষক ও কলাম লেখক।