সাত দ‌লের সমন্বয়ে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’র আত্মপ্রকাশ

নিউজ ডেস্ক।।

ফ্যাসীবাদী দুঃসাহসের বিরু‌দ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণসংগ্রাম জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে সাত‌টি রা‌জনৈ‌তিক দ‌লের সমন্বয়ে গঠিত ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ আত্মপ্রকাশ ক‌রে‌ছে।

সোমবার (৮ আগস্ট) দুপু‌রে ঢাকা রি‌পোর্টার্স ইউ‌নি‌টি মিলনায়ত‌নে এক সাংবা‌দ স‌ম্মেল‌নের মাধ্য‌মে এই রাজ‌নৈ‌তিক মোর্চা আত্মপ্রকাশ করে।

জেএস‌ডির আ স ম আব্দুর রব, নাগ‌রিক ঐ‌ক্যের মাহমুদুর রহসান মান্না ও শহীদুল্লাহ কায়সার, বাংলা‌দেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পা‌র্টির সাইফুল হক, গণসংহ‌তি আ‌ন্দোল‌নের জোনা‌য়েদ সাকী, গণ অ‌ধিকার প‌রিষদের ড. রেজা কিব‌রিয়া ও ভি‌পি নূর, ভাষানী অনুসারী প‌রিষদের র‌ফিকুল ইসলাম বাবলু এবং রাষ্ট্র সংস্কার আ‌ন্দোলনের হাসনাত কাইউম এই সময় উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জেএসডির আ স ম আব্দুর রব বলেন, বাংলাদেশ ৫০ বছর পার করলেও এখনও পর্যন্ত দেশে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচিত হয় তার মূলনীতিতে গণ-আকাঙ্ক্ষার কিছু প্রকাশ থাকলেও সংবিধানের ক্ষমতা কাঠামো রয়ে গেছে পুরোপুরি স্বৈরতান্ত্রিক। ফলে বাংলাদেশে যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারা মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিপরীতেই দেশকে পরিচালনা করেছে।

রব বলেন, বাংলাদেশে কখনোই এমন অবস্থা ছিল না যে, এখানে কার্টুন আঁকাও নিষিদ্ধ, অনলাইনে কিছু লিখলে তাকে বিনা পরোয়ানায় ধরে নিয়ে যাওয়া আইনসিদ্ধ, প্রধানমন্ত্রীর নাম ধরে কোন সমালোচনা করা যাবে না। পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রী দূরে থাক, এখন পদ্মা সেতুর ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও প্রায় অপরাধতুল্য। গুম-খুন-হামলা-মামলার মাধ্যমে দমন-পীড়ন পরিণত করা হয়েছে স্বাভাবিক বিষয়ে।

নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সরকার নিজেদের দুর্নীতি, লুটপাট আর সীমাহীন ব্যর্থতার দায় চাপাচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর। অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির নাম, বাড়ি ভাড়া, পরিবহন ভাড়ার চাপে কোটি কোটি মানুষ দিশেহারা। মড়ার ওপর ঘাঁড়ার ঘায়ের মতো হাজির হয়েছে লোডশেডিং আর বিদ্যুৎ সংকট। এবং তার ওপর সরকার চোরাগোপ্তা কায়দায় মধ্যরাতে ডিজেল কেরোসিন সহ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করেছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার পরিপূর্ণভাবে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। তারা আগের রাতেই ভোট সম্পন্ন কিংবা ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচন করেছেন। তাই, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণকামী ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষে ৭টি রাজনৈতিক দল ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ নামে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহত্তর এই ঐক্যের ভিত্তিতে গণআন্দোলন গণসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনকে বিদায় দিতে না পারলে মানুষের ভোটের অধিকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনসহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কিছুই অর্জন করা যাবে না।

গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকী বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনে দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো অবকাশ নেই। জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা এবং অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হবে এবং একটি রাজনৈতিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ হবে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। এই লক্ষ্যে তারা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করবে, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক রদবদল করবে, দল নিবন্ধন আইন, নির্বাচন আইন ও বিধিমালার যথাযথ সংস্কার করবে এবং ইভিএম ব্যবস্থা বাতিল করে স্বচ্ছ ব্যালট বাজে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে।

গণঅধিকার পরিষদের ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমতা তৈরিতে সহায়তা করবে। সেই লক্ষ্যে প্রয়োজন এক ব্যক্তির হাতে জবাবদিহিতাহীনভাবে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার ব্যবস্থার বদলে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গ যথা সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ও সরকারের জবাবদিহিতার কার্যকরি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক বলেন, সংসদ সদস্যদের মতামত প্রদানের অধিকার খর্বকারী বিদ্যমান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার করে সরকার গঠনে আস্থা ভোট ও বাজেট পাশ ব্যতিরেকে সকল বিলে স্বাধীন মতামত প্রদান ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান এককেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তে বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থার লক্ষ্যে বিদ্যমান সংবিধানের স্থানীয় শাসনের বিপরীতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিক সেবা এবং এর প্রয়োজনীয় বাজেট প্রণয়ন, কর সংগ্রহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার। একইসাথে বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নিম্ন আদালতকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তার পরিচালনা ও তদারকি উচ্চ আদালতের হাতে ন্যস্ত করা, প্রধান বিচারপতিসহ বিচারক নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইসহ ব্যক্তির মতপ্রকাশ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী উপনিবেশিক ও নিবর্তনমূলক সব আইন বাতিল করা; গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হবে।

ভাষানী অনুসারী পরিষদের রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতিতে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জীবন ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যার যার অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। অর্থনৈতিক আইন কানুন সংস্কারের মাধ্যমে লুটপাট ও পাচার বন্ধ করে অর্থনীতির উৎপাদনশীল পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানস ও অর্থনীতির টেকসই প্রকৃতিবান্ধব ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সকল জনগণের জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইউম বলেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গীয় পরিচয় ও শ্রেণি-নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে আমাদের প্রাথমিক দায়িত্ব। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ করা; রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও সাম্প্রদায়িক হামলার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা; গুম হওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা।

গণঅধিকার পরিষদের ভিপি নূর তার বক্তব্যে বলেন, দেশের প্রতিটি শিশুর শিক্ষাসহ সবার জন্য একই মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা, মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অধিকার এবং শিক্ষাকে জাতীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট কাজে এবং সব নাগরিক সেবা পেতে ঝামেলামুক্ত ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কার্যকর করা। দেশের উদ্যোক্তা শ্রেণির জন্য বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ করা। বিদ্যুৎ খাতসহ সর্বত্র দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং পাটকলসহ সব বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ। শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য ন্যূনতম মর্যাদাপূর্ণ মজুরি ঘোষণা। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গণপরিবহনের ব্যবস্থা, বাসা ভাড়ার যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ।

যে সাতটি দলের সমন্বয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ যাত্রা শুরু করেছে সেই দলগুলো হচ্ছে- জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।