সরকারি জমি দেখিয়ে ঋণ ২০ কোটি

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জালিয়াতির মাধ্যমে ৫৪ শতাংশ খাস জমি বন্ধক রেখে ঋণ দেওয়ার ঘটনায় ১২ ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারের বিরুদ্ধে সম্প্রতি চার্জশিট দিয়েছে দুদক। অভিযোগ, অনিয়মের মাধ্যমে যমুনা ব্যাংক থেকে দেওয়া ঋণের ১১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন ব্যবসায়ী হুমায়ন কবিরসহ কয়েকজন। ২০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হলেও সাকিব স্টিল ইন্ডাস্ট্রি সাড়ে ৮ কোটি টাকা সমন্বয় করেন। কিন্তু সরকারের আইন-কানুন না মেনেই ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা মিলেমিশে ব্যাংকের ১১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। অভিযুক্তদের জালিয়াতির পৃথক ব্যাখ্যা তুলে ধরে গত অক্টোবরে চট্টগ্রাম আদালতে চার্জশিট দাখিল করে দুদক। ২০১০ সালে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেননি হুমায়ন কবির। তার পরও এই ব্যবসায়ীসহ তাঁর সহযোগীদের নজিরবিহীনভাবে ফের ঋণ দেয় যমুনা ব্যাংক।

দুদক চট্টগ্রাম-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ব্যাংকের সব নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে যমুনা ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ১২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যবসায়ী হুমায়ন কবির সমকালকে বলেন, ঋণ নেওয়ার পর তিনি সাকিব স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ গিয়াস উদ্দিন কুসুমের কাছে বিক্রি করে দেন। সেই বিক্রির চুক্তিতে শর্ত ছিল, এ ঋণের অর্থ গিয়াস উদ্দিন কুসুম পরিশোধ করবেন। কুসুম তা পরিশোধ না করায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকটির ভাটিয়ারী শাখার অভিযুক্ত তৎকালীন ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আজম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ঋণ জালিয়াতিতে দুই ভাই :দুদক সূত্র মতে, সীতাকুণ্ডের সাকিব স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী হুমায়ন কবির ও মজিবুর রহমান মিলন। তাঁরা দুই ভাই। তাঁরা ব্যাংকের সঙ্গে অবৈধ চুক্তি করে প্রতারণার মাধ্যমে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি সম্পত্তির তথ্য গোপন করে অবৈধভাবে ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে ২০১৯ সালে ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। দুই ভাইয়ের অপকর্মে সহযোগিতা করেন সীতাকুণ্ডের সলিমপুর এলাকার মোহাম্মদ মিয়ার ছেলে গিয়াস উদ্দিন কুসুম, কদমরসুল এলাকার আজিজুর রহমানের ছেলে মো. আজাদ রহমান ও একই এলাকার বাদশা মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ জানে আলম। কিছু ব্যাংক কর্মকর্তারও যোগসাজশ ছিল। তাঁরা খাস জমি শনাক্ত করেননি।

সরকারি যে জমি বন্ধক দিয়ে ঋণ জালিয়াতি

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর শীতলপুর এলাকায় সরকারের ৫৪.৬৯ শতক সম্পত্তি যমুনা ব্যাংকের ভাটিয়ারী শাখায় বন্ধক রাখেন চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং এলাকার নুর চেম্বারের সভাপতি হুমায়ন কবির। সরকারি জমি বন্ধক রাখার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ব্যাংকারদের যোগসাজশে হুমায়ন কবিরসহ সহযোগীরা সরকারের নামে নামজারি করা জমি ব্যাংকে বন্ধক রাখতে সক্ষম হন। এভাবে জালিয়াতি করে ঋণ গ্রহীতাদের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দেওয়া হয়।

দুদকের তদন্তে ব্যাংক কর্মকর্তারা

সূত্রমতে, ঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাতের ঘটনায় যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (বর্তমানে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের এফভিপি) মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী, ফার্স্ট এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রায়হান, ব্যাংকটির ভাটিয়ারী শাখার ব্যবস্থাপক (বর্তমানে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক প্রধান) মোহাম্মদ আজম, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নাসিরাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, ভাটিয়ারী শাখার এক্সিকিউটিভ অফিসার (বর্তমানে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকের কর্মকর্তা) সাহাব উদ্দিন, যমুনা ব্যাংকের এফএভিপি (অডিট) সুব্রত সেবক বড়ুয়া ও (বর্তমানে ইউনিয়ন ব্যাংকের এভিপি) মো. গোলাম সরোয়ারুল হকসহ সাতজনকে অভিযুক্ত করেছে দুদক। গ্রাহকের ঋণ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধককৃত সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তির রেকর্ড যাচাই-বাছাই না করেই ব্যাংকের সাত কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরস্পর যোগসাজেশে গ্রাহককে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতে সহায়তা করেন বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে। ব্যবসায়ী হুমায়ন কবিরের ২০১০ সালের পর ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার বিষয়টিও যাচাই-বাছাই করেননি ব্যাংক কর্মকর্তারা।

অভিযুক্ত ১২, জামিনে মুক্ত ৯ জন

ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ১২ জনকে চার্জশিটভুক্ত করে দুদক। ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদক মামলা করে। তদন্ত শেষে গত ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ১২ জনের মধ্যে ৯ জন জামিনে আছেন। তারা হলেন- ব্যাংকার সাহাব উদ্দিন, সুব্রত সেবক বড়ুয়া, গোলাম সরোয়ারুল হক, মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী, শহীদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ রায়হান। ব্যবসায়ী আজাদ রহমান ও জানে আলম। ‘পলাতক’ ব্যবসায়ী হুমায়ন কবির, মজিবুর রহমান মিলন ও গিয়াস উদ্দিন কুসুম। সুত্রঃ সমকাল

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/২২/২৩