বিশ্বের ২০ নারী ক্রিকেটারদের তালিকায়  কুষ্টিয়ার মুর্শিদা

প্রকাশিত: ১২:২১ অপরাহ্ণ, শুক্র, ২০ নভেম্বর ২০

ক্রীড়া ডেস্ক।। 

আগামীর এক দশক ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করবেন এমন ২০ নারী ক্রিকেটারের তালিকা করেছে ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো। সাবেক সফল খেলোয়াড়, কোচ ও ধারাভাষ্যকারদের মতামতের ভিত্তিতে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের মুর্শিদা খাতুন।

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলে মুর্শিদা খাতুনের আবির্ভাব ২০১৮ সালে। তারপর দেশের হয়ে ৫টি ওয়ানডে ও ১০টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন এই ২১ বছর বয়সী ওপেনিং ব্যাটার। এরমধ্যে নজর কাড়া ইনিংস খেলেছেন বেশ কয়েকটি। গত ফেব্রুয়ারিতে ব্রিসবেনে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩৮ বলে ৬টি চারে ৪৩ রানের ইনিংস খেলে আলাদাভবে নজরে এসেছিলেন মার্শিদা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ২৬ বলে ৩০ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ জমিয়ে তুলে ছিলেন। ২১ বছর বয়সী এই তরুণীকে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যত মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।

কুষ্টিয়ার এই বাঁহাতি ক্রিকেটারকে জাতীয় দলের ওপেনিং পজিশননে সেট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট।

২০১৮ সালের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অভিষেকের পর পাঁচটি ওয়ানডে খেলে ৫৫ রান করেছেন মুর্শিদা। সর্বোচ্চ ৪৪, গড় ১১। টি-টোয়েন্টিতে ১০ ম্যাচ খেলে রান করেছেন ১৫৪। গড় ১৭.১১, সর্বোচ্চ ৩৩।
ক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুর্শিদা নিজের লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন, ‘আমি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দুই ফরম্যাটেই শীর্ষ দশ ব্যাটিং র‌্যাঙ্কিংয়ে থাকতে চাই। একাধিক বিশ্বকাপে সেরা রান সংগ্রাহক হতে চাই।’

 হ্যাপী কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার থানাপাড়ায় ১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। পূর্ণ নাম- মুর্শিদা খাতুন হ্যাপী। ৬ ভাই ৫ বোনের মধ্যে হ্যাপী সর্বকণিষ্ঠ। তাঁর পিতা কাজী গোলাম মোস্তফা ও মাতা হাওয়া খাতুন হ্যাপীকে শৈশব থেকেই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন।

হ্যাপী নিজ এলাকার বিদ্যালয়েই প্রাথমিক শিক্ষার পর্বটি সম্পন্ন করেন। কৈশোরেই অনুভব করেন; দেশের জন্য কিছু করাটা নৈতিক দায়িত্ব। ক্রিকেট খেলার মাধ্যমেই তা করা সম্ভব বিষয়টি হৃদয়াঙ্গম করেন। স্থানীয় পর্যায়ে খোকসার মাঠে ছেলেদের সঙ্গে নিয়মিত প্রাকটিস ও ক্রিকেট খেলে প্রতিভার প্রতি আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেন। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা তাকে স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে মনোবল বৃদ্ধি করে। কুষ্টিয়া শেখ রাসেল স্টেডিয়াম ও কুষ্টিয়ার বাশার ক্রিকেট কেয়ার একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়ে ক্রীড়া কর্মকর্তা, কোচ ও অন্যান্য ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন।

সবাই তাকে খেলার মানোন্নয়নে সহযোগিতা করেন ও উপযুক্ত পরামর্শ দেন। খুলনা বিভাগীয় দলের কোচ এমদাদুল বাশার রিপন বলেন, ” হ্যাপী ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রথম থেকেই সম্ভাবনাময় ছিলেন, বোলিং কৌশলও তাঁর যথেষ্ট ভালো। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অনেক কিছু দেবার যোগ্যতা ও সক্ষমতা তাঁর রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, কুষ্টিয়ার ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট সিনিয়রদের উৎসাহেই শুরু হয়ে যায় তাঁর ক্রিকেট খেলা নিয়ে উচ্চাশা। এরই মধ্যে সুযোগ এসে যায় নিজেকে যোগ্য খেলোয়াড় তৈরী করার। অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পর সুযোগ পান ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (BKSP) শিক্ষার্থী হবার।

২০১২ সালে সেখানে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। বিকেএসপি-র তত্ত্বাবধানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত পরামর্শে তাঁর খেলার ধরণ আরও শাণিত হয়ে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত মেয়েদের প্রিমিয়াম লীগে খেলা শুরু করেন। অনুশীলন, পরিশ্রম, সাধনা, খেলার কৌশল জ্ঞান আহরণ তাকে পরিণত ক্রিকেটার হতে সহায়তা করে। ২০১৩-১৪ ঘরোয়া লীগে ব্যাটিং ও বোলিংয়ে সফল হওয়ায় তিনি ২০১৫ সালে ন্যাশনাল ক্যাম্পে সুযোগ পান।

ন্যাশনাল লীগের ম্যাচগুলোতে নিয়মিত সাফল্য পাওয়ায় তাঁর সুনাম বৃদ্ধি পায়। ২০১৬ সালে লীগে সিলেটের হয়ে ব্যাটিং -বোলিংয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখেন। সিলেট বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়। লীগের সর্বোচ্চ রান তাঁর ব্যাট থেকেই আসে। একইবছর প্রিমিয়াম লীগে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের নির্বাচকমণ্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন।

২০১৭ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের জন্য বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ও ওপেনার হিসেবে একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাঁর অভিষেক হয়। পর্যায়ক্রমে দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা, পাকিস্তান সফরে ব্যাট হাতে দ্যুতি ছড়ান। তিনি দক্ষিণ এশীয় গেমস্ ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের জন্য বাংলাদেশ দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ফাইনালে শ্রীলংকাকে ২ রানে হারিয়ে বাংলাদেশ দল স্বর্ণপদক জিতেছিল।

সেক্ষেত্রে হ্যাপীর অবদান ছিল মনে রাখার মতো। সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বকাপ ক্রিকেট সমাগত হয়। ২০২০ সালে অষ্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মহিলা দলের হয়ে বাঁহাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলে তিনি মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটিতে তাঁর পারফরমেন্স সত্যিই মনে রাখার মতো। জাতীয় ক্রিকেটার নিগার সুলতানার ভাষায়, ” সাম্প্রতিক সময়ে হ্যাপী ভালো ফর্মে আছে।

আর আমি মনে করি, সে আমাদের দলের সেরা খেলোয়াড় হতে যাচ্ছে।”

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.