সমাজের আলোকবর্তিকা শিক্ষকদের প্রাপ্তি কতটুকু!

আবদুল কাদের নাগিব : শিক্ষক একটি অত্যন্ত মহান শব্দ। শিক্ষক হলেন জাতির আলোকবর্তিকাবাহী এবং মানব জাতির ভবিষ্যতের রূপকার। যার মধ্যে লুকিয়ে আছে ন্যায়, নিষ্ঠা, আদর্শ ও আত্মত্যাগ। যে আমাদের বন্ধু, দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক। শুধু পুঁথিগত বিদ্যাই নয়, শিক্ষকদের থেকে যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা অর্জন করি, তা জীবনের বাকি দিনগুলোতে বহন করে থাকি আমরা। আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতির শিহরণ লাভ করতে পারে না। যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি ততই উন্নত সর্বত্র বিদিত। আর শিক্ষার এ মহান কাজটি যিনি করে যান তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের শিক্ষক। একজন আদর্শবান শিক্ষক একটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে তার শিক্ষাদানের মাধ্যমে বদলে দিতে পারে। একটি শিশু, শিক্ষিত ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে একজন শিক্ষক। নিজের সন্তানের মতো আদর-স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষাদান করে থাকেন আমাদের রাষ্ট্রের প্রতিটি জায়গাই এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডেল সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্বপূর্ণ নাগরিক তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান থাকে একজন শিক্ষকের। শিক্ষকের মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহতায়ালা বাড়িয়ে দিয়েছেন। শিক্ষকের মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আহজাবের ভেতরে বর্ণনা করেছেন, সব মানবজাতির জন্য তিনি তার প্রত্যেকটা নবী ও রাসুলকে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং তাদের ভেতরেই উত্তম আদর্শ রেখে দিয়েছেন। প্রিয়নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেছেন, তোমরা জ্ঞান অর্জন করো এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব-শিষ্টাচার শিখ এবং যার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করবে, তাকে সম্মান করো। আল-মুজামুল আওসাত হাদিস নং-৬১৮৪। শিক্ষকের মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং আমাদের প্রিয় কবি, কবি কাজী কাদের নেওয়াজ তার কবিতা ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতায় একজন শিক্ষকের যথাযথ মর্যাদা তিনি তুলে ধরেছেন।

শিক্ষা অনুযায়ী মানব চরিত্র ও কর্মের সমন্বয় সাধনই হচ্ছে রাসুলের (সা.) তাগিদ। নিজে শিক্ষা অর্জন করার পরক্ষণেই অপরকে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত ও চরিত্র গঠন করার দায়িত্বও শিক্ষকের। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর পরে, রাসুলের পরে ওই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা মহানুভব, যে বিদ্যার্জন করে ও পরে তা প্রচার করে (বুখারি:৪৬৩৯)। রাসুল (সা.) শিক্ষা, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক ও শিক্ষার ব্যাপকীকরণে সদা সচেষ্ট ছিলেন। সুতরাং যার থেকে জ্ঞান অর্জন করা হয়, তিনিই আমাদের শিক্ষক। শিক্ষকের মর্যাদায় ইসলামের বক্তব্য সুস্পষ্ট। একবার হজরত জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) তার সওয়ারিতে ওঠার জন্য রেকাবে পা রাখলেন। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) রেকাবটি শক্ত করে ধরেন। হজরত জায়েদ বললেন, চাচাতো ভাই, আপনি (রেকাব থেকে) হাত সরান।’ উত্তরে ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, ‘না, আলেম ও বড়দের সঙ্গে এমন সম্মানসূচক আচরণই করতে হয় (আল ফকিহ ওয়াল-মুতাফাক্কিহ, ২/১৯৭)।’ সম্মানজনক জীবনধারণের জন্য শিক্ষকদের যথেষ্ট অর্থ প্রয়োজন। অথচ এই মহান পেশায় যারা নিয়োজিত, তাদের নেই কোনো অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, সামাজিক মর্যাদা ও তাদের প্রতি ভালোবাসা। অথচ জ্ঞান অন্বেষণের গুরুত্ব ও শিক্ষকের মর্যাদা প্রসঙ্গে আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? (জুমার)।’

শিক্ষকরা সমাজের বিবেক ও স্পন্দন। খেলাফতের শাসন ব্যবস্থায় শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে তখন শিক্ষকের জন্য সম্মানজনক পারিশ্রমিকও নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদিও দ্বিনি শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষকরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান বিতরণ করতেন। আর তারা যেহেতু নিজেদের জীবিকার পেছনে ব্যতিব্যস্ত সময় পার না করে শান্ত মস্তিষ্কে জ্ঞান বিতরণের পবিত্র কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন, তাই তৎকালীন খেলাফত ব্যবস্থা বা সরকার তাদের সম্মানে অভিষিক্ত করেছিল। তাদের জ্ঞান বিতরণের এ মহৎ কাজকে সম্মান জানিয়ে পরিবার-পরিজনের যাবতীয় আর্থিক খরচ বহন করেছিল, যেন জীবনের তাগিদে শিক্ষকদের ভিন্ন কোনো পথে পা বাড়াতে না হয়। উমর (রা.) ও উসমান (রা.) তাঁদের শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁরা শিক্ষক ও ধর্মপ্রচারকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। হজরত উমর (রা.), ওসমানের (রা.) যুগে মুয়াজ্জিন, ইমাম ও শিক্ষকদের সরকারি ভাতা দেয়া হতো (কিতাবুল আমওয়াল, ১৬৫)।

বস্তুত ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে ইসলাম ও ইসলামের মনীষীরা শিক্ষক ও গুরুজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়ে আসছেন। নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞান বিতরণের দীক্ষাও দিচ্ছেন নিরন্তরভাবে।

১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে মহাপরিচালক ড. ফ্লেডারিক এম মেয়রের ঘোষণার মাধ্যমে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সূচনা হয়। ১৯৯৫ সালে ৫ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০০টির মতো দেশে দিবসটি পালন করে। আবার ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস পালন হয়। মাত্র একটা দিন পালন করে শিক্ষকদের ঋণ শোধানো কি যায় আসলে? চীনে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের ডক্টর উপাধিপ্রাপ্ত শিক্ষকের সমান মর্যাদা দেয়া হয়, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ায় একজন শিক্ষকের মর্যাদা অনেক ওপরে রাখা হয়। শ্রীলঙ্কায় মন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হয়, পার্শ্ববর্তী ভারতেও শিক্ষকদের উচ্চতর স্বতন্ত্র স্কেলে বেতন প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের শিক্ষকদের কাছে শিক্ষকতার প্রতিদান আমরা বিভিন্ন সময় টেলিভিশন এবং বিভিন্ন পত্রিকায় পায় লাঞ্ছনার, অপমানের আর উপেক্ষার খবর।

একজন শিক্ষকের কাছে তার শিক্ষার্থী শুধু স্নেহের পাত্রই নয়, বরং সম্মানেরও। কারণ শিক্ষক ক্লাসে শত ক্লান্তিতেও পুরো ক্লাস দাঁড়িয়ে ক্লাস নেন আর শিক্ষার্থীরা বসে থাকে পরিপাটি হয়ে। পরীক্ষার হলে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে কাগজ প্রশ্ন দিয়ে আসেন, কিছু বোঝার থাকলে শিক্ষক তাদের কাছে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেন। এটা কি সম্মানের নয়? এর কারণ, তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আহরণের অতিথি ভেবে নিজের সন্তান ভেবে সেবা দিয়ে যান। আজ আপনি বড় হয়েছেনÑপড়াশোনা শেষ, বড় চাকরি, বাড়ি আর দামি গাড়িতে চড়েন কিন্তু আপনার সেই শিক্ষক আজও সেই ক্লাসে আপনার মতো হাজারো শূন্যর বামপাশে একটি এক যুক্ত করার যুদ্ধে হাতেকলম বা চকের অস্ত্র ধরে সাদা বা কালো বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে। অথচ একবার আপনি ভাবছেন না যে জীবনের প্রতিবিম্ব আপনাকে ওই কলম বা চক দিয়েই দেখানো হয়েছিল একদিন। স্যারের হাতে চক বা কলম ছিল না, সেটা ছিল আপনার জীবনগাড়ির হেডলাইট যে আলোতে জীবন আজ জীবনের পথ পেয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, সে দিনগুলো ভুলে যাওয়া অস্বীকার করা। শিক্ষকদের আসলে কিছু করার নেই; কারণ তারা বাবার মতো, মায়ের মতো ভালোবেসে নিঃস্বার্থে অনেক কিছু করেন কিন্তু তাদের তো মা-বাবার মতো সত্যিকারের কোনো অধিকার থাকে না; তাই আমরা অকৃতজ্ঞ। তাও তারা অশ্রুসিক্ত নয়নে দীর্ঘশ্বাসে হাজারো স্বপ্ন পূরণে নিঃশব্দে করে চলেছে আত্মনিয়োগ। দেশ সেবার আশায় পরকালে পূর্ণের নিমিত্তেই।

গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন, যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তারা অভিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়। শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে; শিক্ষা বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’ দেশব্যাপী শিক্ষকদের বৈধ অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষা করা, শিক্ষকদের জীবনের মান উন্নত করার ব্যাপারে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, আদর্শ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হলে সর্বোপরি দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করবে। একজন আদর্শ শিক্ষক দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও শ্রেষ্ঠ মানুষের অন্যতম। জাতি সঙ্গত কারণেই শিক্ষকের কাছে অনেক প্রত্যাশা করে। শিক্ষকদের এই কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি শিক্ষিত জাতি। প্রকৃত মানুষ গড়ার কারিগর মহান শিক্ষকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, সালাম ও পরকালীন জীবনে সৃষ্টিকর্তা পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান প্রাপ্তির দোয়া করি।

লেখক, শিক্ষার্থী,ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/১৯/২৩