সন্তানকে গড়ে তুলুন ইসলামের আলোয়

মাইশা বিন মেরী।।

মহান আল্লাহ প্রদত্ত একমাত্র ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে মানবজাতির জন্য মনোনিত করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে ইসলামই একমাত্র দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা।’ (৩ : ১৯)

মহান আল্লাহর ১৮ হাজার সৃষ্টির মধ্যে মানুষ সেরা। আল্লাহ তায়ালা যুগযুগ ধরে হাজার হাজার নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন মানুষের হেদায়েতের জন্যই। আর এই ধারা পূর্ণতা পেয়েছে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর আগমনের মাধ্যমে। আমরা আখেরি নবীর উম্মত, আমাদের রয়েছে ঐশীবাণী আল কুরআন। যেখানে একজন মুমিন মুসলমানের ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজ জীবনসহ সব দিকের সব কিছুর নির্দেশনা রয়েছে।

ইসলামী পরিবার হবে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক। এখানে থাকবে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ শান্তি ও তৃপ্তির কেন্দ্র। সন্তান বাবা-মায়ের কাছে অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। মহান আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের একটি হলো সন্তান। শিশু সবসময় নিষ্পাপ হয়েই দুনিয়াতে আসে, দুনিয়ার শিক্ষা শিশুকে কলুষিত করে আর এই দুনিয়ার শিক্ষাই শিশুকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত করে। বাবা-মা হিসেবে দায়িত্ব সন্তানকে ইসলামী সংস্কৃতির আলোকে জীবন গড়তে সাহায্য করা।

ইসলামী পরিবারে সন্তান জন্ম নিলে সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক ইসলামী সংস্কৃতি অনুযায়ী সন্তানের ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামাত দেয়া ইসলামের বিধান। এতে শিশুকে জানিয়ে দেয়া হয় সে মুসলিম ঘরের সন্তান।

কোনো দ্বীনদার ব্যক্তির খেজুর বা মিষ্টি জাতীয় ফল বা খাবার চিবিয়ে আঙ্গুলে নিয়ে শিশুর মুখে দেয়াকে তাহনিক বলে; যা করা সুন্নত। হজরত মুসা আশআরি রা: বর্ণনা করেন, আমার একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করল। আমি তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে গমন করলাম। রাসূলুল্লাহ সা: তার নাম রাখলেন ইবরাহিম। খেজুর দিয়ে তাকে তাহনিক করলেন, তার বরকতের জন্য দোয়া করলেন, অবশেষে তাকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিলেন। (সহিহ বুখারি)

সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে মাথার চুল মুণ্ডন করা এবং চুলের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য দান করা মুস্তাহাব। এতে শিশুর বিপদাপদ দূর হয়।
শিশুদের ইসলামী অর্থপূর্ণ নাম রাখা উত্তম। অনৈসলামিক কোনো নাম রাখা ইসলামী সংস্কৃতির পরিপন্থী। হাদিসে আছে, ‘কিয়ামতের দিন তোমাদের ডাকা হবে তোমাদের নিজেদের ও পিতার নাম ধরে। সুতরাং তোমরা তোমাদের নামকে সুন্দর করো।’ (সুনানে আবু দাউদ) ইসলামে প্রতিটি শিশু পিতৃপরিচয় ও বংশ জানার অধিকার রাখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো, এটি আল্লাহর দৃষ্টিতে ন্যায়সঙ্গত।’ (৩৩ : ৫)

সন্তানের আকিকা ও খাতনা করা সুন্নত। হাদিসে আছে, ‘প্রত্যেক শিশু আকিকার সাথে দায়বদ্ধ’। (ইবনে মাজাহ, বায়হাকি)
ইসলামে শিশুকে মায়ের দুধপানের অধিকার দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধপান করাবে।’ (২ : ২৩৩) আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও মায়ের দুধের পুষ্টিগুণের কথা স্বীকার করে।

পিতা-মাতার উচিত শিশুকাল থেকেই সন্তানকে সুশিক্ষা দেয়া যাতে প্রকৃত ঈমানদার হিসেবে গড়ে ওঠে। লোকমান আ: যে শিক্ষাগুলো সন্তানদের দিয়েছেন তা দুনিয়ার সব সন্তানের জন্য। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে তা বর্ণনা করেছেন- ‘হে আমার পুত্র! তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয় শিরক অত্যন্ত জুলুম।’ (৩১ : ১৩)
পুত্র-কন্যার সাথে সমান আচরণ করতে হবে। অনেকেই সম্পত্তিতে কন্যাসন্তানের হক যথাযথ আদায় করে না। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের ব্যাপারে সমতা রক্ষা করো।’ (সহিহ মুসলিম)

সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দিতে হবে। সাত বছর বয়সে নামাজ পড়তে আদেশ করতে হবে এবং ১০ বছর বয়স হলে নামাজের জন্য শাসন করতে হবে। সর্বোপরি, শিশুদের ভালোবাসতে হবে, সর্বক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

যারা ইয়াতিম শিশু তাদের খেয়াল রাখতে হবে, তাদের অধিকার আদায় করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ইয়াতিমদের প্রতি লক্ষ রাখবে যে পর্যন্ত তারা বিবাহযোগ্য না হয়, আর তাদের মধ্যে ভালো-মন্দ বিচারের জ্ঞান দেখলে তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও। তারা বড় হয়ে যাবে- এমন ভেবে অপচয় করে তাড়াতাড়ি তাদের সম্পদ খেয়ে ফেলো না।’ (৪ : ৬)

প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে হাসি-তামাশা করা যাবে না। ইসলাম তা সমর্থন করে না। তাদের সাথে সহানুভূতি, ভালোবাসা দিয়ে কথা বলতে হবে। প্রাণ ও জীবনের নিরাপত্তা দিতে হবে, সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের (ধনীদের) ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও সুবিধাবঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (৫১ : ১৯) ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবন্ধিতা কোনো অভিশাপ নয়, নয় কোনো পাপের ফসল; বরং ব্যক্তির জন্য আখিরাতের মর্যাদা লাভের সোপান। আর আখিরাতের মর্যাদাই আসল মর্যাদা। হজরত আবু হুরায়রা রা: বর্ণনা করেন- রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে বিপদগ্রস্ত করেন।’ (সহিহ বুখারি) আগামীর ভবিষ্যৎ কর্ণধার শিশু। তাদের নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দিতে হবে। শৈশবের শিক্ষাই আসল শিক্ষা।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়