শীতের মধু খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

প্রকাশিত: ৯:২২ অপরাহ্ণ, শনি, ১৪ নভেম্বর ২০

মোঃ মাহমুদুল হাসান (মুক্তা), নলডাঙ্গা, নাটোরঃ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। বৈচিত্র্যপূর্ণ ছয় ঋতুর দেশ আমাদের এই সোনার দেশ। এদেশের এক এক ঋতুর রয়েছে এক এক রকমের বৈশিষ্ট্য। তেমনি এক বৈচিত্র্যপূর্ণ ঋতু হেমন্ত। এই ঋতুতেই দেখা মিলে শীতের। হিমেল হাওয়া ও হালকা কুয়াশায় উত্তরের জনপদ নাটোর জেলায় এখন শীতের আমেজ চলছে। শীত মৌসুম শুরুর সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে নাটোর জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ।

শুরু হয়েছে শীতের মধু খেজুর রস আহরণ। এই রস আহরণে গাছিরা এখন যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ মৌসুমে আবহমান বাংলায় খেজুর রস আহরণ, খেজুর গুড় আর নবান্নের উত্‍সব একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। আর খেজুর রসের পিঠা পায়েস বাংলার উপাদেয় খাদ্য তালিকায় এখনও জনপ্রিয়।

এই শীতের সময় পাওয়া যায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু পানীয় খেজুরের রস। শীতের সকালে মিষ্টি রোদে বসে মিষ্টি সুস্বাদু এই খেজুরের রস খাওয়ার মজা ও স্বাদই আলাদা। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে কদর বেড়ে যায় খেজুর গাছের। গাছ থেকে রস সংগ্রহ, গুড় তৈরি, আর রস ও গুড়ের নানা শীতকালীন পিঠা তৈরির ধুম পড়ে আবহমান গ্রাম বাংলায়।

সারাবছর অবহেলিত খেজুর গাছগুলোকে ঝুড়ে এই সময় নতুন রূপ দেন গাছিরা। নাটোরের বিভিন্ন উপজেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে রস সংগ্রহের জন্য খেজুর গাছগুলোকে প্রস্তুত করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।

শীত শুরুর সঙ্গে সঙ্গে খেজুর গাছ প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নাটোরের বেশ কিছু এলাকার গাছিরা। খেজুর গাছ থেকে রস আহরণের জন্য দা, সেনি (গাছ ঝুড়ার জন্য এক ধরনের খুবই ধারালো হাসুয়া) ও কোমরে দড়ি বেঁধে খেজুর গাছে উঠে নিপুণ হাতে গাছ প্রস্তুত করছেন অনেকে।

আগে নাটোরের গ্রামগুলোতে মাঠে আর মেঠোপথের ধারে সারি সারি খেজুর গাছ থাকলেও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছটি। আধুনিকায়ন ও নগরায়নের ফলে বাংলার ঐতিহ্যের অংশ এই খেজুর গাছ আজ বিলুপ্ত প্রায়। ইটভাটায় অবাধে খেজুর গাছ পোড়ানোর কারণে গাছ কমে গেছে।

তবে কিছু গাছ দাঁড়িয়ে আছে এখনও কালের সাক্ষী হয়ে। জানা গেছে, এক সময় এ জেলার যেখানে-সেখানে সারিবদ্ধভাবে নয়ন জুড়ানো খেজুর গাছের দৃশ্য চোখে পড়তো। লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের গাছিরা জানান, খেজুরের রস সংগ্রহের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গাছ ঝুড়ার কাজ শুরু করেছেন তারা।

এ বছর আবহাওয়াটা অনুকূলেই রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে বাজারে চাহিদা ও দাম ভালো পাওয়া যাবে। আক্ষেপ করে তারা বলেল, আগের মতো গাছ নেই। যেসব গাছ আছে সেগুলোতে তেমন রসও নেই। এখন যেটুকু রস ও গুড় পাওয়া যাচ্ছে আগামী কয়েক বছর পর হয়তো এ গাছের আর দেখাই মিলবে না।

নলডাঙ্গা উপজেলার বুড়িরভাগ বিলপাড়া এলাকার আব্দুল মান্নান ফকির নামের এক গাছি জানান, কার্তিক মাসে খেজুর গাছগুলোর মালিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে গাছ কাটা শুরু করেছে। কার্তিক মাসের শেষ নাগাদ পুরোপুরি গাছগুলো কাটা শেষ করে শুরু হবে রস সংগ্রহের প্রতিযোগিতা।

অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ এই তিন মাস খেজুরের গাছগুলো থেকে রস আহরণ আর গুড় তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে তারা। গাছগুলো থেকে আহরণকৃত কিছু রস বাজারে বিক্রিসহ বেশি ভাগ রসই নিজ বাড়িতেই আগুনে জ্বাল দিয়ে যে গুড় ও লালি তৈরি করে পরে তা বাজারে বিক্রি হবে। তিনি আরো জানান, ইট ভাটায় খেজুর গাছের চাহিদা বেশি হওয়ায় এবং গ্রামের সাধারণ মানুষ অভাবের তাড়নায় অবাদে তাদের খেজুর গাছগুলো বিক্রি করে দিচ্ছেন।

এ ছাড়াও অনভিজ্ঞ গাছিরা গাছ কাটার সময় ভুল করায় অনেক গাছ মরেও যাচ্ছে। তাই এখন আর আগের মতো এ উপজেলায় খেজুর গাছ দেখা যায় না। ফলে এক সময় খেজুর রসের যে সমারোহ ছিল তা অনেকাংশে কমে গেছে। এক সময় শীতের সকালে রস বিক্রিতারা ভাঁড় বাঁশে হাঁড়ি কাঁধে নিয়ে খেজুরের রস বিক্রি করত।

কালের বিবর্তণে এখন আর সেই দৃশ্য আগের মতো চোখে পড়ে না। শীতের সকালে গ্লাস ভরে খেজুরের রস খাওয়াই ছিল লোভনীয়। এ ছাড়াও খেজুর রসের তৈরি গুড়, পাটালির চাহিদা এখনো রয়েছে। পুরো শীত নামার সাথে সাথেই প্রতিটি ঘরে ঘরে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা-পুলি আর পায়েশ তৈরির ধুম পড়বে।

চিড়া মুড়ি পিঠা খাওয়া কৃষক পরিবার থেকে শুরু করে সবার কাছে প্রিয়। শীত মৌসুম এলেই জেলার সর্বত্র শীত উদযাপনের নতুন আয়োজন শুরু হয়। তাইতো শীত মৌসুমের শুরুইে এলাকার গাছিরা খেজুরের গাছ থেকে ছাল তুলা- চাঁছা আর কাটা, গাছে নলি বসানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ সময় এলাকার গাছিদের মুখে ফুটে উঠে রসাল হাসি।

শিক্ষক ও সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান মুক্তা বলেন, আগে অগ্রহায়ণের প্রথম সপ্তাহেই গ্রামের ঘরে ঘরে খেজুর রস আর গুড় দিয়ে নতুন আমন ধানের পিঠা-পুলি ও পায়েশ তৈরির ধুম পড়়ত। আসন্ন পৌষ-পার্বন-পুষনা বা পীঠা-পুলির উত্‍সবে এই খেজুর গুড় ও রস নতুন মাত্রা আনবে গৃহস্থদের রসুইখানায়।

কৃষি অধিদফতর নাটোর অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোস্তফা কামাল হোসেন শিক্ষাবার্তা ডট কম পত্রিকাকে বলেন, নাটোর জেলায় কি পরিমাণ খেজুর গাছ আছে বা ছিলো তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

তবে এটা বলা যাচ্ছে দিন দিন খেজুর গাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যেসব এলাকায় খেজুর গাছ আছে সেগুলোর রস সংগ্রহে গাছির সংকট দেখা দিয়েছে। খেজুর গুড়ের গুরুত্ব ও চাহিদা থাকলেও দিন দিন কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা। আগের মতো বাড়ির আশপাশে ও সড়কের পাশে খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যের দেখা মিলছে না খুব একটা আমাদের গ্রাম বাংলায়।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.