শিশুর হাতে স্টিয়ারিং

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

একটি মিনিবাসে ৪০ থেকে ৫০ জন যাত্রী উঠেন। টেম্পুতে ১০ থেকে ১২ জন, লেগুনায় ১২ থেকে ১৫ জন, নসিমন-করিমনে ১৫ থেকে ২০ জন যাত্রী যাতায়াত করেন। এসব যানবাহনের যাত্রীদের নিরাপত্তা নির্ভর করে ড্রাইভারের দক্ষতার উপর। কিন্তু ড্রাইভিং সিটের স্টিয়ারিং যদি অদক্ষ শিশুর হাতে থাকে তাহলে যাত্রীদের জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করতে হয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ১ লাখ ৫৫৫ জন শিশু কিশোর বাস-ট্রেম্পু-লেগুনা-পিকআপ-মোটর সাইকেল-নসিমন-করিমনের ড্রাইভার হিসেবে কাজ করছেন। প্রশিক্ষণহীন, লাইসেন্সহীন এইসব শিশু চালক-সহযোগিদের দ্বারা পরিচালিত দেশে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ কর্মস্থলে এবং বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করছেন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা, প্রতিদিন সড়কে গড়ে এখন ৯শর বেশি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের হাতে স্টিয়ারিংয়ের যানবাহনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। তবে মানুষ বাধ্য হয়েই শিশু ড্রাইভার চালিত যানবাহনে মানুষ চলাচল করে। অন্যদিকে শিশু ড্রাইভারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের রোজগারে সংসার চলে। সংসারে অর্থের জোগান দিতেই বাধ্য হয়েই তারা কাজে নামেন।

অনুসন্ধান করে দেখা গেছে রাজধানী ঢাকায় ট্রেম্পু-লেগুনা-পিকআপ এবং গ্রামগঞ্জে নসিমন-করিমনে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। কেউ ড্রাইভিং সিটে কেউ সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। পরিবহণ শ্রমিক হিসেবে এরা কাজ করলেও শ্রমিক সংগঠনে এসব শিশু শ্রমিক তালিকাভ্ক্তু নয়। ফলে শিশু শ্রমিকদের পরিচালিত যানবাহন দুর্ঘটনার মুখে পড়লে সেগুলো পরিবহণ সংগঠনের মালিক শ্রমিক নেতারা গুনতিতে নেন না। তা ছাড়া ‘ঘুষ ছাড়া লাইন্সেস পাওয়া যায় না’ বাস্তবতায় শিশু শ্রমিকরা প্রশিক্ষণ নিলেও ড্রাইভিং লাইন্সেস পান না। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক এবং রাজধানীর সংযোগ সড়ক-মহাসড়ক বাড়ছে দুর্ঘটনা। প্রতিদিন গড়ে এখন ৯শর বেশি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। অথচ বিআরটিএ ঘুমিয়েই সময় পার করছেন।

রাজধানীর গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ি, খিলগাও, রামপুরা, পুরান ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, গাড়ির (ট্রেম্পু-লেগুনা) চালকের আসনে শিশুরা। স্টিয়ারিংহাতে যানবাহনে করে বিভিন্ন যায়গায় চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন যাত্রীদের। এসব শিশু-কিশোরাদের হাতে গাড়ির স্টিায়ারিং থাকার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা আর এসব দুর্ঘটনায় অকালে ঝরছে সাধারণ মানুষের প্রাণ। আর শিশু-কিশোররা যেসব গাড়ি চালান এসব গাড়ির বেশিরভাগের নেই ফিটনেস। রাজধানীসহ সারাদেশে এখন লাখ লাখ ফিটনেসহীন লক্কর-ঝক্কর গাড়ি চালাচ্ছে শিশু-কিশোররা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার জানান, একজন প্রশিক্ষিত ও মাদকমুক্ত চালক নিরাপদ সড়ক ও নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করে। যেসকল বাস মালিক ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোর দিয়ে গাড়ি চালান, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ডিএমপিও এই লক্ষ্যে কাজ করছে। নতুন করে যারা পেশাদার ড্রাইভিং লাইন্সেস নিতে আসছেন, তাদের জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আর ৮ম শ্রেণি পাস না হলে কাউকে ড্রাইভিং লাইন্সেস দেয়া হবে না।

সারাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে। শিক্ষা সুবিধা থেকে ঝরে পরাদের মধ্য থেকে সংসার চালাতে পরিবহন খাতে শ্রম দিচ্ছে ১ লাখ ৫৫৫ জন শিশু কিশোর। প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সহীন এই চালক-সহযোগিদের দ্বারা পরিচালিত বাস-ট্রেম্পু-লেগুনা-পিকআপ-মোটর সাইকেল-নসিমন-করিমন এবং অটোরিশায় বাড়ছে দুর্ঘটনা, প্রতিদিন গড়ে এখন নয়শতর উপরে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। যার অধিকাংশ শিশু শ্রমিকদের অংশগ্রহণের কারণে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ৩৬ হাজার ৫০, চট্টগ্রামে ১৯ হাজার ৫০, খুলনায় ১৪ হাজার ৩৮০, বরিশালে ৮ হাজার ২৬০, সিলেটে ৮ হাজার ৩৪০, রাজশাহীতে ৬ হাজার ৩৫০, রংপুরে ৫ হাজার ৫৬৫ এবং ময়মনসিংহে ৪ হাজার ১৬০ জন শিশু-কিশোর এই পরিবহন খাতে গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে আছে। করোনা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক-পরিবারিকসহ বিভিন্ন কারণে এই বড় অংকের শিশু-কিশোর পড়ালেখার আলো বঞ্চিত হয়ে এখন নির্মম এ পেশায় জড়িত হয়েছে। এতথ্য জানিয়েছেন সেভ দ্য রোড-এর মহাসচিব শান্তা ফারজানা।

আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লা বাস-এ ১৩,৮০০, ট্রাক-এ ২২,৬৬৫, পিকআপ-ভ্যান-এ ৪৬,৪৪০ এবং লেগুনা-নসিমন-করিমন-অটো-স্থানিয় মোটরসাইকেল রাইড-এ ১৭,৬৫০ জনসহ সারাদেশে ১,০০,৫৫৫ শিশু শ্রমিক পরিবহনখাতকে করে তুলছে দুর্ঘটনাপ্রবণ। পরিবহন খাতে সারাদেশে বিভাগীয় পর্যায় থেকে মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১,০০,৫৫৫।

এই বড় অংকের শিশু শ্রম থেকে পরিবহনখাতকে মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে সেভ দ্য রোড-এর ৩ টি প্রস্তাব রয়েছে- যাদের বয়স ১৭ বছরের উপরে তাদেরকে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ-এর ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয়ভাবে করার পাশাপাশি বৈধ লাইসেন্স সরকারী অর্থায়নে দেয়া এবং যাদের বয়স ১৭ বছরের নিচে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পড়ালেখার ব্যবস্থা করা। শিশু শ্রমের হাত থেকে পরিবহনখাতকে মুক্তি দিতে শিশু শ্রমিকদেরকে চিহ্নিত করে তাদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করা এবং তাদের পরিবারকে কমপক্ষে মাসিক ৫ হাজার টাকা প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা করা এবং লেগুনা শ্রমিক ও মালিক সংগঠন, বাস-ট্রাক-পিকআপ-রিকশা মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সহায়তায় শিশু শ্রমিক নিয়োগ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।

জানা যায়, রুট পারমিট বা সড়কে চলাচলের অনুমতি আছে লাখ লাখ গণপরিবহণ চলছে সড়কে। অধিকাংশ মিনিবাসের ফিটনেস নেই। বেশিরভাগ লেগুনার ফিটনেস নেই। এসব লেগুনার সামনে পিছনে ভাঙা। নেই কোন নাম্বার প্লেট। কোনো টার নাম্বার প্লেট থাকলে ভাঙা তাতে কি লিখা তা জানাই দূরহ। এসব লেগুনার চালক ও চালকের সহযোগীদের বেশির ভাগই শিশু-কিশোর। তাদের চালকের আসনে বসার সনদও নেই তাদের।
রাজধানীর গুলিস্তান রাজউকের সামনে, টিএন্ডটি অফিসের সামনে, কাপ্তানবাজার এলাকায় মুরগী মার্কেটের সামনে, ব্যাংক পাড়া মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এছাড়াও আরও বেশকয়েকটি এলাকায় ফিটনেসহীন লেগুনা চলাচল করে যার বেশিরভাগ চালকই অপ্রাপ্ত।

লেগুনা চালক রাহাত করোনাকলীন সময়ে স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। সেসময় থেকে চালাতেন অটোরিকশা এখন সে লেগুনার চালক। তিনি বলেন, করোনায় স্কুল বন্ধ হওয়ার সময় থেকে গাড়ি চালাচ্ছি। আমার কোন লাইসেন্স নেই সবাই কলে আমার লাইসেন্স করার বয়স হয়নি। তাই লাইন্সে ছাড়াই চালাই। আমি সেসব গাড়ি চালাই এগুলো পুলিশ ধরে না। আমরা লাইনম্যানকে টাকা দিয়েই গাড়ি চালাই।
চালকদের বেশির ভাগ শিশু-কিশোর হওয়ায় এসব লেগুনা ও বাস ঘন ঘন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নগরবাসী। শিশুশ্রম আইন ২০১৩-তে ১৮ বছরের নিচের সবার জন্য গাড়ির চালকের সহকারীর কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। চালকের সহকারীর কাজইও সুযোগ নেই। এটা ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে শিশু-কিশোরদের চালক হওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। এবং শিশু-কিশোররা যাতে এসব কাজে যুক্ত না হতে পারে সেই বিষয়টাও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

রাজধানীসহ সারা দেশে লোকাল গণপরিবহনগুলোর বেশির ভাগই চলছে কিশোর বয়সের চালক দিয়ে। লোকাল বাস, টেম্পো, লেগুনা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তুলে দেয়া হচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের হাতে; যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও লাইসেন্স থাকা তো দূরের কথা অভিজ্ঞতাও নেই। এসব কিশোর চালকদের জন্য একদিকে যেমন অহরহই ঘটছে দুর্ঘটনা, তেমনি সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। প্রতিদিন বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে টেম্পো, লেগুনা, মিনিবাস, হিউম্যান হলারসহ বিভিন্ন গণপরিবহন। নগরবাসী ছাড়াও প্রতিদিন কয়েক লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ রাজধানীতে আসেন। তাদেরকে নগরীতে এসেই উঠতে হয় এসব গাড়িতে এসব গাড়ির চালকদের। যাদের ন্য‚নতম সড়ক আইন সম্পর্কে ধারণা নেই, এমন কিশোরদের দিয়েই ভাড়ায় পরিবহন চালাচ্ছেন পরিবহন সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও এক্ষেত্রে সেই আইনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন না ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকা এসব গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা।

তবে রফিকুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, শিশু-কিশোর বয়সের চালকদের ভরসায় হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে চলাচল করতে হয় কিন্তু কি করার প্রতিদিন এভাবেই চলাচল করছি। লাভের আশায় শিশু-কিশোরদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন এসব পরিবহন মালিকরা। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব চললেও দেখার যেন কেউই নেই। বিশেষ করে রাজধানীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলোতে এভাবে শিশু-কিশোর চালকদের দৌরাত্ম্য দেখা গেলেও এর কোনো প্রতিকার নেই।

সেভ দ্য রোডের মহাসচিব শান্তা ফারজানা   বলেন, অপ্রাপ্ত বয়সের চালক ও পরিবহনের সহযোগী থাকার কারণে দিন দিন দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। এই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনকে শিশু-কিশোররা যাতে চালকের আসনে বসতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে হবে।

পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন) আহসান হাবীব প্রামানিক  বলেন, অপ্রাপ্ত বয়সের চলকদের বিষয়ে আমরা অভিযান পরিচালনা করি। অভিযানের পর কিছুদিন শিশু-কিশোরদের গাড়ি চালাতে দেখি না। কয়েকদিন পর আবার তারা গাড়ি নিয়ে বেড় হয়। তবে রাজধানীর ভিতরে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে শিশু চালক তেম দেখা যায়না যতটা দেখা যায় ঢাকার আশে পাশের এলাকাগুলোতে। শহরের সাইট এলাকা ও বেঁড়িবাধ এলাকায় এদের বেশি দেখা যায়।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আমরা এক পরিসংখ্যানে দেখেছি প্রায় ৭৩ শতাংশ লেগুনা চালায় অপ্রাপ্ত বয়স্করা। পুলিশের অভিযানের কারণে বাসে অনেকটা কমে এসেছে। অন্যান্য যানবাহনে বিশেষ করে মোটর চালিত রিকশায় শিশু-কিশোর চালকের সংখ্যা হবে ৫০ শতাংশ। আমি মনে করি এটা দ্রæত কমে আসা জরুরি।