শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত একটি বাস্তবতা

করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের তাণ্ডবে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ বিপর্যস্ত। এমন সময় বাংলাদেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির বিপর্যয় ঘটবে না তা ভাবা নিতান্তই বোকামি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, পরিস্থিতি যেকোনও সময় খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে। বিশেষ করে গত বছরের শেষ সপ্তাহ থেকে ভারতে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়াটা ছিল খুব স্বাভাবিক। এর সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের জনগণের বিশাল অংশের স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলার প্রবণতা। এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই সপ্তাহে দেশে করোনা পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। বলা যায়, দেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। দৈনিক শনাক্তের হার ১ শতাংশ থেকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা ২০০ থেকে ছাড়িয়ে ১১ হাজারে চলে গেছে। এভাবে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যে এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। 

আমরা জানি, করোনার কারণে প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সরকার বিভিন্ন রকম চেষ্টা করেছিল। সব বাধা উপেক্ষা করে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সঙ্গে গত বছরের সেপ্টেম্বরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয় সরকার। ইতোমধ্যে এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি আবারও নাজুক হতে থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে।
করোনা শনাক্তের হার বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দিক থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের দাবি ওঠে। একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে রাখার দাবিও উচ্চারিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটির সঙ্গে দফায় দফায় সভা করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে মন্ত্রণালয়। এর একটি উদ্দেশ্য ছিল– ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। বর্তমান দ্রুত অবনতিশীল করোনা পরিস্থিতির বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যেমন জরুরি; ঠিক একইভাবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও তাদের আশেপাশের জনসাধারণের স্বাস্থ্যগত দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলেই আবারও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। উচ্চশিক্ষার স্তরে সশরীরে ক্লাস বন্ধের নির্দেশনা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এরপরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সশরীরে ক্লাস বন্ধ রেখেছে। তবে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত না হয়। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবাসিক হল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আমাদের মাথায় রাখতে হবে, দেড় বছরের বেশি সময় বাসায় বন্দি থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা হলেও বিরক্তি এসে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর তারা নিজেদের সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিল। আবারও আবাসিক হল বন্ধ করে দেওয়া হলে তাদের উদ্বেগ আরও বাড়তে পারতো। তাছাড়া একটি গোষ্ঠী সবসময় ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য ব্যস্ত থাকে। হল বন্ধ রাখার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা হতে পারে।

অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খোলা রাখলে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রাবাসে বা হলে একই কক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে অবস্থান করতে হয়। সেক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কতটা নিশ্চিত করা যাবে তা পরিষ্কার নয়। যদিও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আবাসিক হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবুও এ বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ শিক্ষার্থীরা বয়সে তরুণ। তাছাড়া করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ধারণা জন্মেছে, এটি শুধু সাধারণ সর্দি জ্বরের মতো। ফলে দেশের বেশিরভাগ জনগণের মতো শিক্ষার্থীরা এটি খুব হালকাভাবে নিচ্ছে। তারা স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই চলাফেরা করছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তির হার অত্যন্ত কম। কিন্তু যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের মধ্যে যদি ১ শতাংশ রোগীরও হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় তাহলে খুব অল্প সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এ বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক বারবার গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষ ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হলেও আমাদের দেশে এখনও ডেল্টার সংক্রমণ রয়েছে। ভারতের মতো বাংলাদেশেও যারা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হচ্ছে তাদের অনেকের অবস্থা গুরুতর। সেই বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কীভাবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়া যায়। বাংলাদেশকে আঘাত করা করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সহজে বলা যায়, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আগামী দুই-তিন মাস এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে আবারও একটা বড় সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই আমাদের অনলাইন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শিক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যে যেখানে সম্ভব সেখানেই অনলাইন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলেছেন। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনাকে প্রাধান্য দিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। করোনার বাধা পেরিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। করোনার ভয়াল থাবা থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষা করতে হলে অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করা ছাড়া উত্তম কোনও বিকল্প আমাদের হাতে এই মুহূর্তে নেই।

অনেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তটি নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর চেয়ে ভালো কোনও বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কোনোভাবেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলার সুযোগ নেই। এমনকি করোনা বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশ ছিল– কিছুদিনের জন্য হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা। সরকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা নিয়েই সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে।

আমরা আশা করি, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে শিক্ষার্থীরা আবারও সশরীরে শিক্ষাজীবন শুরু করতে পারবে। ততদিন পর্যন্ত কীভাবে শিক্ষার্থীদের অনলাইন কার্যক্রমের মধ্যে রাখা যায় সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অনুঘটকের দায়িত্ব। অতিমারিকালীন অনলাইন ও অফলাইনের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে আমাদের।  

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর