শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে প্রধান শিক্ষকের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

শরিফুল ইসলাম, নীলফামারী।।

বিদ্যালয়ের প্রবেশপথের দুই পাশে ফুলের গাছ, আঙিনায় নানা ধরনের খেলার সরঞ্জাম, বিভিন্ন ফুল-ফলের গাছ। মনোরম এমন পরিবেশে পড়াশোনা ও খেলাধুলার সুযোগ পেয়ে বিদ্যালয়বিমুখ শিক্ষার্থীরা হয়েছে বিদ্যালয়মুখী। এতে বেড়েছে উপস্থিতি ও পড়াশোনার চাহিদা।

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রাম সাউথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফজালুর রহমান শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন। এতে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পেরে খুশি অভিভাবকরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের সামনে নানা জাতের ফুল গাছের মাধ্যমে করা হয়েছে সৌন্দর্যবর্ধন। তারই মাঝে বসানো হয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন খেলার সরঞ্জাম। ক্লাসের বিরতিতে ছাত্র-ছাত্রীরা স্লিপার থেকে পিছলে পড়ছে, কেউবা দোলনায় দোল খাচ্ছে, আবার কেউ ব্যালেন্সিং যন্ত্রে ওঠানামা করছে বিদ্যালয়ে মাঠে স্থাপন করা দোলনা, স্লিপার, ব্যালান্সিং, ল্যাডার কিংবা অন্যান্য খেলনা সামগ্রীতে।

প্রধান শিক্ষক আফজালুর রহমান  বলেন, এই স্কুলে আমি যখন ২০১৬ সালে জয়েন করি। তখন লক্ষ করেছিলাম যে বিদ্যালয়ের ভেতরে ধু-ধু মরুভূমির মতো একটা মাঠ। এখানে যদি শিশুসুলভ একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে শিক্ষার পরিবেশ বাড়বে। এ নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে মিটিং করে বাগানের দিকে ছোট ছোট গাছ লাগানো শুরু করি। একটা-দুইটা করে করে ২০২২ সালে এসে ইনশা আল্লাহ আমার বিদ্যালয় ফুলে ফুলে ভরে গেছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের খেলার সরঞ্জাম প্রদান করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এতে আমাদের বিদ্যালয় পরিপূর্ণভাবে বিকশিত ও শিশুদের জন্য শতভাগ প্রস্তুত হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রাইদা   বলে, আমি আগে নীলফামারী শহরের একটি স্কুলে পড়তাম। বাবার চাকরির সুবাধে এই স্কুলে ভর্তি হয়েছি। আমার আগের স্কুলের থেকে এই স্কুলের পরিবেশ অনেক ভালো। আমার অনেক ভালো লাগে এই স্কুলে আসতে। টিফিনের সময় আমি দোলনা, স্লিপারে খেলি, বন্ধুদের সঙ্গে মজা করি।

একই ক্লাসের ছাত্র মিরাজ হোসেন বলে, এই স্কুলে অনেক ভালো লেখাপড়া হয়। স্কুলে আগে মাঠে একটা বাগান ছিল। সেই বাগানের জায়গায় এখন বিভিন্ন ধরনের খেলনাসামগ্রী বসানো হয়েছে। একদম পার্কের মতো। এই স্কুলে আমার অনেক ভালো লাগে। প্রতিদিন আমি স্কুলে আসি। আমরা পড়ার সময় পড়ি এবং টিফিনের সময় খেলাধুলা করি।

চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল কাদের জিলানী বলে, আমি আগে অন্য স্কুলে পড়তাম। এই স্কুল দেখতে সুন্দর। লেখাপড়াও ভালো হয়। স্কুলমাঠে বাগান আছে। মাঠে খেলনা বসানো হয়েছে। তাই এখানে আসতে আমার ভালো লাগে।

তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র রাফাত আল ফিয়াজ বলে, এই স্কুল আমার অনেক ভালো লাগে। বন্ধুদের সঙ্গে মাঠের খেলনাগুলোতে খেলি। অনেক মজা করি। আমি নিয়মিত স্কুলে আসি। এই স্কুলের স্যার-ম্যামরাও অনেক ভালো।

স্কুলের সহকারী শিক্ষক কানিজ তানজিনা আক্তার   বলেন, আমি মনে করি আমাদের স্কুল বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্কুল। এ স্কুল আমাদের বাড়ির মতো। এখানে সবাই আমরা মিলেমিশে কাজ করি। প্রধান শিক্ষক ও সবার সহযোগিতায় এটা বাস্তবায়িত হলো। গ্রামের বাচ্চাদের তো বিনোদনের ব্যবস্থা কম। তাই স্কুলে তাদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ কারণে শিশুরা বিদ্যালয়মুখী বেশি হচ্ছে।

সহকারী শিক্ষক কায়েজ রহমান বলেন, আমরা অনেক দিন ধরে শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছি। নতুন করে খেলনাসামগ্রী দিয়ে বিদ্যালয়টাকে সাজালাম। নানা ধরনের ফুলের গাছ লাগিয়েছি। বিদ্যালয়ের দেয়ালে শিক্ষামূলক চিত্রাঙ্কন করেছি। এতে শিক্ষার্থীরা সার্বিক বিষয়ে জ্ঞান লাভ করবে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীসংখ্যা ৩৪৭। এ বিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়। বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে ও রাখতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। টিফিনের সময় শিশুরা বেশি মজা পায়।

প্রধান শিক্ষক আফজালুর রহমান আরও বলেন, এই স্কুলের পরিবেশ-প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমি কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেষ্টাও করেছি। যেমন আমাদের এখানে নামাজঘর আছে। সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক যারা আছেন, ওখানে নামাজ আদায় করেন। আমাদের সাইকেল গ্যারেজে সেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা সাইকেল রাখতে পারে। শিক্ষকরা মোটরসাইকেল রাখতে পারেন। স্কুলের শহীদ মিনার উপজেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে নির্মাণ করেছি। এখানে শহীদ দিবস ও জাতীয় দিবসগুলোয় ছাত্রছাত্রীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। বিদ্যালয়ের সব গাছের গোড়া পাকা করা হয়েছে। শিশুদের জন্য অবসর সময়ে বসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর সমাপনী পরীক্ষায় স্কুল থেকে উপজেলার শ্রেষ্ঠতম স্থান দখল করে আসছে। আমরা সে ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছি।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আহাম্মেদ হোসেন  বলেন, শিশুরা আকর্ষণ পেলে আনন্দিত হয়। সেই আকর্ষণটা তৈরি করেছেন বালাগ্রাম সাউথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। এ রকম আমার ইউনিয়নে প্রতিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি মনোরম পরিবেশ প্রধান শিক্ষকরা করতে পারেন, আমার পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের আমিও সহযোগিতা করব।

তিনি আরও বলেন, আগে ৩৩ শতাংশ জমিতে স্কুলটা নির্মিত হয়েছে। সেখানে বাচ্চাদের খেলার মাঠ হলে আরও ভালো হতো। বিনোদনের কারণে এই স্কুলে লেখাপড়া ভালো হয়। এ কারণে অভিভাবকরা সেখানে সন্তানদের ভর্তি করানোর জন্য আগ্রহী হচ্ছেন।

সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান   বলেন, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে শিশুরা শিখবে হেসেখেলে, এই লক্ষ্য সামনে নিয়ে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো এগিয়ে যাচ্ছে। আমার মেয়েকেও বালাগ্রাম সাউথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি। এ স্কুলে আমিও একজন অভিভাবক। আমার মেয়ে এখানে খেলাধুলা করে। এখানে খেলাধুলার সরঞ্জাম সুন্দরভাবে স্থাপন করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে শিশুরা ভীতিকর পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসে এবং আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব হাসান  বলেন, করোনাকালে আমাদের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকার কারণে তারা পিছিয়ে গেছে। তাদের স্কুলমুখী করার জন্য প্রধান শিক্ষক মাঠে শোভাবর্ধন ও খেলাধুলার সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছেন, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ। এ বিষয়ে উপজেলা পরিষদ, মাননীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করছে এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে গেছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করার জন্য অন্য স্কুলগুলোয় উপজেলা প্রশাসনের এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। সুত্র ঢাকা পোষ্ট