শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা প্রসঙ্গে

মো. শহীদুল ইসলাম।।

অনেকটা দ্রুত গতিতে দেশে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে। যখন মহামারি শুরু হয় তখন সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে আসার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়। কিন্তু পুরোপুরি চালু হওয়ার পূর্বেই আমরা করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে প্রবেশ করেছি। পাশের দেশ ভারতে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক রাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আমাদের দেশে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার মধ্যেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাকেরাও সরকারের সঙ্গে একমত পোষণ করছেন। করোনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না। ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনার সর্বোচ্চ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। ইউনিসেফ বারবার সতর্ক করছে, আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করলে তা শিক্ষাব্যবস্থায় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

আপাতত দৃষ্টিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক-দুই বছর বন্ধ রাখলে তা দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু এর সামাজিক প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাবও শীঘ্রই প্রতীয়মান হবে। বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে পৃথিবীব্যাপী সব সরকার সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই বেছে নিয়েছে। সব কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু রাখা হলেও শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল। প্রায় সব দেশেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে সবার শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

এই দীর্ঘ বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীর কতটা ক্ষতি হলো, তার সঠিক হিসাব আমাদের সামনে নেই। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য খুবই খারাপ ফল বয়ে আনবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে লাগল অনেক শিক্ষার্থী অনুপস্হিত। অনেক মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। মহামারির সময় কত জন শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে এবং কত জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কাজে যোগ দিয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় দুই লক্ষ শিক্ষার্থীর অনুপস্হিতি কিছুটা হলেও ক্ষয়ক্ষতির আভাস দিতে পেরেছে। কত জন শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে এবং কত জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজে যোগ দিয়েছে, তার সঠিক হিসাব বের করা প্রয়োজন। এসব শিক্ষার্থীর আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার জন্য যা করার, তাই করতে হবে।

করোনার মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখা অবশ্যই সরকারের একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। কিন্তু শিক্ষার্থীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়াটা যেন নিরাপদ হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে আমরা বরাবরই উদাসীন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। মাস্ক পরিধান, হাতধোয়া, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা। কারো উপসর্গ দেখা দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ১২ বছরের ওপরের সব শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়ার চলামান প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে। দেশে টিকার পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও টিকা গ্রহণে জনগণের মধ্যে উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেহেতু শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকবে, সুতরাং পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের বিশেষ করে গার্ডিয়ানদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন দিয়ে টিকা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

ইতিমধ্যেই কতগুলো সেবার ক্ষেত্রে টিকা কার্ড প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে। তাহলে শিক্ষার্থীর গার্ডিয়ানের জন্য কেন নয়? এতে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সার্বিক টিকাদান কার্যক্রমেও গতিশীলতা লাভ করবে। করোনার থেকে আমরা কেউ নিরাপদ নই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেও শিক্ষার্থীরা বাসায় বসে থাকবে না। এর থেকে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি মেনে, শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শিক্ষাকার্যক্রম চলমান রাখতে হবে। কখনো যদি করোনার প্রকোপ অনেক বেড়ে যায় এবং অফিস আদালত, কলকারখানা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রয়োজন হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে সবার শেষে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়