শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা ও রুটিন তৈরির ব্যস্ততা

প্রকাশিত: ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গল, ৭ সেপ্টেম্বর ২১

নিউজ ডেস্ক।।

 প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত ৩ কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থীর প্রায় সবাই সরাসরি পাঠদানের প্রহর গুনছে । বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই ঘরবন্দি। শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরাও বাসার বাইরে যাওয়ার তেমন একটি সুযোগ পায়নি। তাই স্কুলে আবার যাবে, মাঠে খেলবে, মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেবে-এই ভাবনায় আপ্লুত তারা। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক স্তরে ২ কোটি ১৫ লাখ ৫১ হাজার ৬৯১ আর মাধ্যমিক স্তরে ১ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৩ শিক্ষার্থী আছে। এর বাইরে আছে মাদ্রাসায় দাখিল স্তরে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী।

উদয়ন স্কুলের অধ্যক্ষ জহুরা বেগম বলেন, ‘আসলে আমরা শিক্ষকরাও ছাত্রছাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করছি। কতদিন ওদের সংস্পর্শ পাচ্ছি না! তবে এই ক্লাস চালুকে সামনে রেখে বিশাল দায়িত্ব চলে এসেছে আমাদের ওপর। মহামারিকালে সবাইকে স্বাস্থ্যগতভাবে সুরক্ষিত রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা স্কুল প্রস্তুত করছি। সরকার ইতোমধ্যে ৩৮ পৃষ্ঠার সুলিখিত গাইডলাইন পাঠিয়েছে। সেখানে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কথাও আছে। তাদের সচেতন করতে আমরা ৯ সেপ্টেম্বর অভিভাবকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা করব। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ভাগ করে শ্রেণি ও শিফট অনুযায়ী আলাদা সময়ে আনার জন্য রুটিন করছি। এসএসসি ও এইচএসসির দুই ব্যাচে আমাদের যে সংখ্যক শিক্ষার্থী কেবল তাদের জন্যই ৪৮টি কক্ষ দরকার। বাকি কেজি থেকে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও সমন্বয় করতে হবে। সবমিলে আসলে এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।’

ঢাকার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩৮ পৃষ্ঠার গাইডলাইন এবং সর্বশেষ রোববার পাঠানো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরেও (মাউশি) ১৯ দফা নির্দেশিকার আলোকে পাঠদান উপযোগী করার কাজ চলছে। তবে নাম প্রকাশ না করে অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষা প্রশাসন তদারকি না করলে এই পরিচ্ছন্ন কাজ প্রত্যাশিত পর্যায়ে হবে না। ওই অভিভাবক মিরপুরের একটি স্কুলের নাম উল্লেখ করে বলেন, কয়েকদিন আগে তিনি তার এসএসসিপড়ুয়া ছেলের সঙ্গে স্কুলে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে যান। তখন দেখা গেছে, ক্লাসরুমে বেঞ্চিগুলোতে ধুলোর পাহাড় জমেছে। ওয়াশরুমে গিয়ে তার সন্তানের বমি করার দশা হয়েছে। একজন শিক্ষক নেতা ওই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক। আর এই অভিভাবক দেশের বড় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) কর্মরত।

এদিকে এই আনন্দের মাধ্যেও দুশ্চিন্তা নিয়ে এসেছে দেশের ১৩টি জেলার বন্যা পরিস্থিতি। দিন দিন ওইসব জেলায় এর প্রকোপ বিস্তৃত হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে তীব্র নদীভাঙন। ইতোমধ্যে বেশকিছু স্কুল ও মাদ্রাসা ভেঙে নদীগর্ভে চলে গেছে। ১২ সেপ্টেম্বরের আগে বন্যার পানি নেমে না গেলে ওইসব এলাকার প্রতিষ্ঠানে বিকল্প পন্থায় পাঠদান করা হবে বলে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারকদের হাতে দুর্গত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল-কলেজের তথ্য নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এমনকি এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনাও তৈরি হয়নি।

জানা গেছে, বন্যাকবলিত এলাকার তথ্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরেও (মাউশি) নেই। গত ১০-১২ দিন ধরে বন্যা চললেও সোমবার সংস্থাটি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের (ডিইও) নিয়ে বৈঠক করে তথ্য পাঠাতে বলেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক বেলাল হোসাইন। তিনি ৎ বলেন, ডিইওরা দু-একদিনের মধ্যে তথ্য পাঠালে সংস্কার ও মেরামত সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কোথাও স্কুল ভেঙে গিয়ে থাকলে বিকল্প পন্থায় পাঠদানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টিকার চ্যালেঞ্জ সামনে : ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব শিক্ষক এবং কর্মকর্তাকে টিকা দেওয়াও আরেক চ্যালেঞ্জ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, প্রাথমিক স্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে ১৬ হাজার ৭৪ জন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ রোববার পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন। এই স্তরে শিক্ষক আছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৭১২ জন। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ১০ হাজার ৩০০ টিকা নিয়েছেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব এসব তথ্য জানান। তিনি আরও বলেন, খোলার আগে অবশিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী টিকা পাবেন।

এদিকে সবচেয়ে বেশি হযবরল চলছে মাধ্যমিক থেকে পরবর্তী স্তরে। এই স্তরে কতজন টিকা পেয়েছেন আর পাননি সেই তথ্যও ঠিকমতো জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, ১৮ বছরের বেশি বয়সি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মাউশির অধীনে, যাদের কেউ কেউ উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ে। বাকিরা সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে আছে কিছু শিক্ষার্থী। সবমিলে প্রায় সাড়ে ৪৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৫১ শিক্ষার্থী আছে। এছাড়া আছে ৪৩ সরকারি ও ৯৬ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক প্রায় ৩২ হাজার, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ৪৫ হাজার।

ইউজিসি সূত্র জানায়, উল্লিখিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৫ লাখের এনআইডি আছে। আর এদের মধ্যে ৩ লাখ ৩৭ হাজার ন্যূনতম এক ডোজ টিকা পেয়েছেন। আর শিক্ষকদের মধ্যে ৮৫-৯০ শতাংশ টিকা পেয়েছেন। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিকা পেয়েছেন।

ইউজিসি সচিব (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ড. ফেরদৌস জামান জানান, ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংক্রান্ত তথ্য আমরা চেয়েছি। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় তথ্য দিয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে আমরা পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাব।

আর মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) জানান, মাধ্যমিক স্তরে সরকারি বিদ্যালয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ টিকা পেয়েছেন। বেসরকারি স্কুল ও কলেজের কোনো তথ্য তিনি জানাতে পারেননি।

জন্মনিবন্ধনে টিকা, হবে টিকা বুথ : সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ন্যূনতম ১৮ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই এমন শিক্ষার্থী প্রায় ৩০ লাখ হওয়ার কথা। তবে ইউজিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কিছু কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক লাখ বয়স্ক শিক্ষার্থী আছে, যারা নিয়মিত শিক্ষার্থীর মধ্যে পড়েন না, তারাও সাড়ে ৪৪ লাখ শিক্ষার্থীর হিসাবের মধ্যে আছেন। ওইসব শিক্ষার্থীর এনআইডি আছে এবং টিকাও নিয়েছেন। সেই হিসাবে এনআইডিবিহীন শিক্ষার্থী বেশি নয়। এরপর এনআইডি যাদের নেই তারা দুটি সুবিধা পাবেন। প্রথমত, নিকটস্থ নির্বাচন অফিসে গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের এনআইডি করে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনে যোগাযোগ করেছে। এছাড়া এ ধরনের শিক্ষার্থীরা জন্মনিবন্ধন কার্ড দিয়েও টিকা নিতে পারবেন।

রোববার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, যারা এখনো টিকা নিতে পারেনি, তাদের জন্য আলাদা বুথের ব্যবস্থা করা হবে। প্রথম চিন্তা হচ্ছে, সংশ্লিষ্টদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ) টিকার বুথ হবে। আর সেটা সম্ভব না হলে বিশেষ স্থানে কেবল ছাত্রছাত্রীদের জন্য ভেন্যু করা হবে। ২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.