শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতীক্ষার অবসান

প্রকাশিত: ৯:০০ পূর্বাহ্ণ, রবি, ১২ সেপ্টেম্বর ২১

নিজস্ব প্রতিনিধি।।

দেড় বছর পর আজ স্কুল-কলেজ-মাদরাসা খুলছে। বন্ধের এই সময়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য আগ্রহভরে অপেক্ষায় ছিল ছাত্র-ছাত্রীরা। আজ তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে।

দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আজ থেকেই ক্লাস শুরু হবে। ফলে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

শিক্ষক-অভিভাবকসহ সচেতন মহল বলছেন, স্কুল-কলেজ খোলার পর স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ। যদিও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর-মাউশি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর সার্বিক প্রস্তুতি দেখতে আজ সকালে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আজিমপুর গার্লস স্কুল ও কলেজ পরিদর্শনে যাবেন।

তথ্যমতে, স্কুল-কলেজ খোলার প্রস্তুতি হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধুলোমাখা বেঞ্চ, ব্লাক বোর্ড ছাড়াও পরিষ্কার করা হয়েছে ক্লাস রুম। হাতধোয়ার বেসিন স্থাপন, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্যবিধি, শারীরিক দূরত্বের বিধি, হাতধোয়ার সঠিক নিয়ম, মাস্ক পরার নিয়ম, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচারও টাঙানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা নির্দেশনা এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেস্কো, ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করে ‘কভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর নির্দেশনা’ জারি করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজগুলোকে মানতে হচ্ছে এসব নির্দেশনাও। ডেমরায় সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে আমরা যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। কোনোভাবেই গাদাগাদি বা ঠাসাঠাসি করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার সুযোগ নেই। প্রতি বেঞ্চে একজন করে শিক্ষার্থী বসানোর পরিকল্পনা করছি আমরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘নো মাস্ক নো স্কুল’ ব্যানার টানানো হয়েছে স্কুলে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস নিতে রুটিন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে মাউশি। এই নির্দেশনা মেনে ইতিমধ্যে রুটিন দিয়েছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি মানা নিয়ে সংশয়ে আছেন কিছু অভিভাবক। মাউশির এই নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২২ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্লাস হবে।

প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে এক দিন ক্লাস হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট শ্রেণিতে দুটি করে ক্লাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রুটিন প্রণয়ন করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর সংযুক্ত রয়েছে সেগুলোতে সব স্তরের জন্য নির্ধারিত ক্লাসগুলো সমন্বয় করে রুটিন প্রণয়ন করতে হবে। মাউশির এই নির্দেশনা মেনে স্কুল-কলেজগুলোতে আজ থেকে শুরু হবে ক্লাস।

রুটিন এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যেন ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করবে এবং প্রতিষ্ঠান থেকে বের হবে। করোনা চলাকালীন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ্যাসেম্বলিও বন্ধ থাকবে। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও চলবে স্বাভাবিক কার্যক্রম। তবে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার নির্দেশনা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ কানিজ মাহমুদা আকতার বলেন, সরকারের নির্দেশনা মেনে কলেজ খোলার সব প্রস্তুতি নিয়েছি। ইতিমধ্যে হাতধোয়ার বেসিন স্থাপন হয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে স্থানে স্থানে নির্দেশনা টানানো হয়েছে। অধ্যক্ষ আরও বলেন, করোনার মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জে আমাদের জয়ী হতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের হোস্টেল খুলে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে মাউশি অধিদফতর। হোস্টেল চালুর ক্ষেত্রে কভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধির পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে হোস্টেল খুলে দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মানতে হবে ১৪ নির্দেশনা।

এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে- সব সমাবেশ স্থান-ক্যাফেটেরিয়া, ডাইনিং, টিভি, স্পোর্টস রুম ও অন্যান্য রুম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। রান্নাঘর থেকে রুমগুলোতে সরাসরি খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। একাধিক শিক্ষার্থীর একই বিছানা ব্যবহার করা যাবে না। একসঙ্গে নামাজ, প্রার্থনা, সমাবেশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। আবাসিক শিক্ষার্থীরা হোস্টেলে ওঠার আগে কভিড আরটিপিসিআর পরীক্ষা করে ফলাফল নেগেটিত হলে হোস্টেলে আসবে। হোস্টেলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। হোস্টেল, বাথরুম, টয়লেট, বেসিন, ড্রেন ইত্যাদি প্রতিদিন জীবাণুমুক্ত করে রাখতে হবে।

সবাই ব্যক্তিগত সাবান, তোয়ালে ইত্যাদি ব্যবহার করবে এবং ব্যক্তিগত লকার অন্যান্য জিনিসপত্র পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখবে। হোস্টেলে খাবার পানি ও খাদ্যসামগ্রী নিরাপদ রাখতে হবে। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ডেঙ্গু সংক্রমণ ও এডিস মশা বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাইড লাইন অনুসরণ করতে হবে।

আবাসিক শিক্ষার্থী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী ব্যতীত অন্য কেউ হোস্টেলে অবস্থান বা যাতায়াত করতে পারবেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার পর কোনো সমস্যার উদ্ভব হলে তা প্রতিদিন জানাতে ও সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। অধিদফতরের অধীন সব শিক্ষা কর্মকর্তাকে তার থানা/উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিদিন মনিটরিং করে বিকালে মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইং-এর মেইলে পাঠাতে বলা হয়েছে।

দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় সারা দেশে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে বইছে খুশির আমেজ। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা জানান, খুলনা জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্যাম্পাস পরিষ্কারসহ ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে শ্রেণিকক্ষ। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জরাজীর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নানা সংস্কারের মধ্যে দিয়ে দ্রুততম সময়ে শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের উপযোগী করা হচ্ছে। মহানগরীর আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (সপ্রাবি) আগে থেকেই বেহাল অবস্থায় ছিল।

দীর্ঘদিন পরিচর্যা, সংস্কারের অভাবে সেগুলো আরও খারাপ হওয়ায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বরিশালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস নিতে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে হাতধোয়ার বেসিন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে শ্রেণি কক্ষ-টয়লেট-বাথরুম। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস কার্যক্রম অব্যাহত রেখে করোনাকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চান বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মল্লিকা চক্রবর্তী।

বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আসাদুজ্জামান খান বলেন, করোনা সুরক্ষায় ক্যাম্পাসে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় নেওয়া হয়েছে যথাযথ পদক্ষেপ। রংপুর বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধোয়ামোছা করে খোলার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। রংপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে কাজ করছি। এ ছাড়া স্বাস্থ্য বিধি মেনে যাতে ক্লাস পরিচালিত হয় সেই বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি।

রাজশাহীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার খবরে সবচেয়ে বেশি আনন্দ উচ্ছ্বাস জানিয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। নওহাটা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ধোয়ামোছার কাজ চলছে। বেঞ্চগুলোও ইতিমধ্যে পরিষ্কার করা হয়েছে। পরিপাটি কলেজের আঙিনা যেন শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার প্রহর গুনছে।

এ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নাফিসা তাসনীম জানান, বিদ্যালয়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে এসেছিলাম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে ক্লাস করে একঘেঁয়েমি এসে গেছে। স্কুল খোলার কথা শোনার পর অনেক ভালো লাগছে।

টাঙ্গাইল পৌর এলাকার বেড়াবুচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরজুমান্দ আরা হক বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষে হাতধোয়ার ব্যবস্থা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। ক্লাসে দূরত্ব বজায় রেখেই দুই শিফটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার খবরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

গতকাল শনিবারেই বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ভিড় জমায়। ঠাকুরগাঁও সদরের ঝাপড়তলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোকসেদুর রহমান বলেন, স্কুল খোলার জন্য আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। অনেক শিক্ষার্থী উৎসাহিত হয়ে খোলার আগেই স্কুল দেখতে এসেছে।

প্রসঙ্গত, কভিড-১৯ অতিমারীর কারণে গত বছর ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গতকাল পর্যন্ত এই ছুটি নির্ধারিত ছিল। কভিড ১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আজ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.