শিক্ষক হয়রানী ও মহামান্য হাইকোর্টের রায় প্রসঙ্গে

প্রকাশিত: ৭:০২ অপরাহ্ণ, রবি, ১২ সেপ্টেম্বর ২১

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্যাহ ।।
গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে মহামান্য হাইকোর্ট বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার কোন শিক্ষককে ৬ মাসের বেশি বরখাস্ত রাখা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজু রহমানের বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। মহামান্য হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে কোন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হলে ছয় মাসের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে অন্যথায় ছয় মাস পর সাময়িক বরখাস্ত আর কার্যকর থাকবে না।

একই সাথে আদালত শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে একটি নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে বেসরকারি শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত রাখার কোন সুনির্দিষ্ট মেয়াদ ছিল না। নিঃসন্দেহে এটি একটি যুগান্তকারী রায় যার মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হয়রানী কমবে বলে আশা করা যায়।

এর আগে মহামান্য হাইকোর্ট ২০১৭ সালে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষককে দুই মাসের বেশি সাময়িক বরখাস্ত না রাখার রায় প্রদান করেছিলেন। সাময়িক বরখাস্তের দুই মাসের মধ্যে বিভাগীয় কার্যধারা সম্পন্ন করার আদেশ প্রদান করেছিলেন। কোন কারণে দুই মাসের মধ্যে তা করা না গেলে দুই মাস পর থেকে সমুদয় বেতন-ভাতা প্রদানের রায় দিয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৭২.৩১.০০৭.১৫.৬৯৪, তারিখ ০৬ আগস্ট ২০১৭ মহামান্য হাইকোর্টের রিটপিটিশন নং-৩৬৫৭/২০১৫ এর রায় বাস্তবায়ন সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছিল।

একই ভাবে পরবর্তীতে ২০১৯ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৫ সালের চাকুরীবিধি সংশোধন করে অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকুরীর শর্তাবলী রেগুলেশন(সংশোধিত) ২০১৯ এর ১৭(গ) বিধিতে তা যুক্ত করেছে। ২০২১ সালে জারিকৃত সর্বশেষ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় সাময়িক বরখাস্ত সম্পর্কে প্রথমবারের ১৯ ধারা সংযুক্ত হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, ‘কোন ফৌজদারী/নৈতিক স্থলন/দুর্নীতির মামলায় কোন শিক্ষক-কর্মচারী অভিযুক্ত হয়ে আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক/কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবেন।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট কোন আদেশ কিংবা নির্দেশনা প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একটি পরিপত্র না বিধি প্রনয়ন করে তাদের দায়িত্ব পালন/খালাস করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। সারা দেশে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা মিলে হাজারো শিক্ষক বছরের পর বছর এভাবে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। প্রকৃতপক্ষে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক এবং চাকুরী বিধি মোতাবেক বিষয়টি নিষ্পত্তিও হচ্ছে না কিংবা তারা বিধি মোতাবেক বেতন ভাতাও পাচ্ছেন না।

এমনকি সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় অনেকে মৃত্যুবরণ করছেন। আমার পরিচিত চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একজন শিক্ষক ছিলেন তাকে অন্যায়ভাবে ২০১৮ সালে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ১৭/১২/২০২০ তারিখের পত্র দ্বারা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর তার সাময়িক বরখাস্ত আইনানুগ হয়নি উল্লেখ করে তার সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করে বেতন ভাতা প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ তাতেও গড়িমসি করে। অবশেষে মানুষটি উদ্বেগ আর চরম অনিশ্চয়তা ২৯ জানুয়ারি স্ট্রোক করে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেন।

তার মৃত্যু আমাকে যতনা কষ্ট দিয়েছে তার ছেয়ে বেশি ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যারা তাকে অনিশ্চতায় মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে সেটা বাস্তবতার আড়ালে চাপা পড়া বিষয়।

নিজে জীবিত থাকতে লড়াই করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেছেন এটাই হয়তো তার সার্থকতা কিন্তু পরিবার পরিজন রেখে গেছেন চরম অনিশ্চয়তায়। তিনি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক ছিলেন তার খবর আর কে রাখে? রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, কর্তৃপক্ষ সবাই নিজ নিজ দায়িত্বে ব্যস্ত! ওই একই কলেজে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় অন্য এক জন শিক্ষক অবসর নিয়েছেন এবং অন্য একজন শিক্ষক নিম্ন আদালত হয়ে এখন উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর আইনি লড়াই করছেন বলে শুনেছি।

এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা। দেশের অন্য অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এই চিত্র রয়েছে। সারা দেশের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও কিছু দিন পূর্বে একটি জেলার স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদে দেখেছিলাম উক্ত জেলায় ২ শতাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন বছরের পর বছর। সব জেলার গড় করলে এই সংখ্যা কয়েক হাজারে দাঁড়াবে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না তার পরিবার, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী তথা সার্বিকভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উপরও এর প্রভাব পড়ছে।
মহামান্য হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন হয় না।

বছরের পর বছর শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রেখে হয়রানী করা হয়। গুটি কয়েক ঘটনা বাদ দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছোট খাট অজুহাত দাড় করিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়ে থাকে। একই সাথে কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে তা হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সভাপতি বা প্রতিষ্ঠান প্রদানের সাথে মতানৈক্য বা তাদের কোন অন্যায়-অনিয়মের সমর্থন না দেয়া কিংবা প্রতিবাদ করার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে।

একই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাকুরী বিধি মোতাবেক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বছরের পর বছর এই অমানবিক অবস্থায় রেখে শিক্ষকদের চরম হয়রানী করে। কলুষিত ও লেজুড়ভিত্তিক এই সমাজ ব্যবস্থায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যারা সৎ ও প্রতিবাদী শিক্ষক তারাই হয়রানীর শিকার হন। দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের রেষানলে পড়তে হয়।

একই ভাবে রাজনৈতিক কারণেও এই ধরনের হয়রানীতে পড়তে হয় বলে জানা যায়। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে কোন শিক্ষককে কারণে-অকারণে হয়রানী করার মোক্ষম অস্ত্র হলো ‘সাময়িক বরখাস্ত’ করা। একবার করা গেলে তা বছরের পর বছর কখনো দশক হয়ে যুগের ঘরে গিয়ে ঠেকে। ওই অবস্থায় অনেকে অবসর গ্রহণ করে। অনেকে দুষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে জীবন অবসান করে। আবার অনেকে চাইলেও আইনি অধিকার কিংবা সহায়তা নিতে পারে না কেননা এই অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়ে।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পরিষদ অনেক শক্তিশালী। হেড মাস্টার ও অধ্যক্ষরাও আরও ফাওয়ারফুল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা তাদের পরিচিত ও তাদের অনুকুলে পরিচালনা পরিষদের সদস্য নির্বাচন করে থাকেন যারা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বান্ধন না হয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান বান্ধব বা অবকাঠামো উন্নয়ন বান্ধন হয়ে উঠেন যা শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নকে বিঘ্নিত করে থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা অন্যায়-অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। কেউ তার এ কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে কোন অজুহাত দাড় করিয়ে সোজা সাময়িক বরখাস্ত করে ফেলে রাখে বছরের পর বছর।

এমনকি এমনটিও দেখা যাচ্ছে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত হয়েছে আর অধ্যক্ষ তার বিরুদ্ধে কে অভিযোগ করেছে সন্দেহমূলক অজুহাত দাড় করিয়ে শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন। কেননা আইন আদালত যা-ই হয় তার শাস্তির কোন ব্যবস্থা নেই। জবাবদিহি করতে হবে না কারো কাছে। ক্ষতি হলে প্রতিষ্ঠানের হবে ওই শিক্ষকের হবে। এতে করে অন্য শিক্ষকরাও তার বশীভূত হয়ে যায়। কেউ সাহস দেখাতে যায় না। ফলে প্রতিষ্ঠান প্রধান চরম দুর্নীতিপরায়ন হয়ে উঠে।

মহামান্য হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন তা বাস্তবভিত্তিকই শুধু নয় ঐতিহাসিক রায়। এর মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষক উপকৃত হবে তাতে সন্দেহ নেই। মহামান্য হাইকোর্ট লিখিত রায়ে সব ধরনের স্কুল(মাধ্যমিক, নিম্ন মাধ্যমিক), সব ধরনের কলেজ(উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, ডিগ্রি কলেজ), সব ধরনের মাদ্রাসা(দাখিল মাদ্রাসা, আলিম মাদ্রাসা, কামিল মাদ্রাসা) উল্লেখ করবেন বলেও আমরা আশাবাদী। না হলে এখানে আইনি ফাঁক-ফোকর বের করে শিক্ষকদের হয়রানী অব্যাহত থাকবে।

শিক্ষা মন্ত্রনালয় বিষয়টি মাঠ পর্যায়ের অবস্থা বিবেচনা করে সঠিক ও বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা প্রনয়ন করবে এটাই কাম্য। কোন শিক্ষক-কর্মচারী যদি সত্যিই অপরাধ করে থাকেন চাকুরী বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাই কাম্য।

কিন্তু বছরের পর বছর এভাবে হয়রানী কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই হয়রানী প্রক্রিয়ার সাথে যারা যুক্ত তাদের জন্যও নীতিমালায় বিধান থাকা জরুরী। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান ও পরিচালনা পরিষদের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান থাকতে হবে। আদালত তার লিখিত রায়ে এ বিষয়েও দিক নির্দেশনা দিবেন বলে আমরা আশাবাদী।

মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের আলোকে ৬ মাসের বেশি সময় ধরে সাময়িক বরখাস্ত থাকা শিক্ষকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চাকুরী নিয়মিতকরন করা জরুরী। নতুন করে যেন আবার কোন হয়রানীর শিকার না হয় সে বিষয়েও নীতিমালা প্রনয়ন করা জরুরী।

যখন তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হয়ারানি বন্ধ করা না গেলে যেমন কাঙ্খিত শিক্ষা আশা করা বেমানান তেমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, অনিয়ম আর ক্ষমতার লাগামহীন অপব্যবহার রেখে দুর্নীতিমুক্ত জাতি গঠনের আকাঙ্ক্ষা অবাস্তব। তাই কাঙ্খিত শিক্ষার পরিবেশ ও জাতি গঠনে সঠিক নীতি ও বাস্তবায়ন আবশ্যক।

লেখক- বেসরকারি কলেজের শিক্ষক।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.