শিক্ষক লাঞ্ছনার নেপথ্যে কী

ড. কাজল রশীদ শাহীন।।

উৎপল কুমার সরকার হত্যার এক সপ্তাহ পর খুলেছে হাজী ইউনুছ আলী কলেজ। ছাত্র কর্তৃক একজন শিক্ষককে হত্যার ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায় এ কথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য হলো অনেক কিছু ভোলেও না। শিক্ষক উৎপল কুমার হত্যার বেদনাবিধুর অধ্যায়ের কথা কি এ জাতি কখনো ভুলতে পারবে? যদি ভুলে যায়, তা হলে শিক্ষার প্রতি আমাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা যে ক্রমেই তলানিতে গিয়ে ঠেকছে, সেটিই প্রমাণিত হবে।

কোনো জাতির শিক্ষার হালফিল অবস্থা যদি এমন হয়, তা হলে সেটি নিয়ে বিশেষ চিন্তার কারণ আছে বৈকি। হাজী ইউনুছ আলী কলেজ কী তার এই শিক্ষকের জন্য বিশেষ কিছু করবে- যা তাকে স্মরণীয় করে রাখবে। একজন শিক্ষক কোনো প্রকার অন্যায়ের কাছে নত না হয়ে নিজে যেটি সত্য মনে করেছেন, সেটিই করেছেন। এমন শিক্ষক তো সবার জন্য অহঙ্কার বিশেষ, দেশ ও জাতির জন্য গর্ব এবং গৌরবের সম্পদ। অথচ সেই শিক্ষককেই কিনা মরতে হলো ছাত্রের হাতে স্ট্যাম্পের আঘাতে। এ ঘটনা যে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপরই আঘাত, তা স্বীকার করা না হলেও বাস্তবতা তেমনটিই বলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা যেন মামুলি একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিমাসেই দেশের কোথাও না কোথাও অনেকটা রুটিন ওয়ার্কের মতো করে সংঘটিত হচ্ছে সবচেয়ে করুণ ও লজ্জার এই ঘটনা। সাভারের এই ঘটনার সামান্য কিছুদিন আগে নড়াইলে সংঘটিত হয়েছে শিক্ষক লাঞ্ছনার আরও একটি ঘটনা। নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজে গত ১৮ জুন সংঘটিত শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনাটা পুরো শিক্ষকসমাজের জন্য বেদনার ও জাতির জন্য লজ্জার। স্বপন কুমার বিশ^াস ওই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

তার অপরাধ গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে পরিষ্কার করে বোঝারও উপায় নেই। বলা হচ্ছে, কলেজটির এক হিন্দু ছাত্রের ফেসবুক পোস্ট কেন্দ্র করে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। এর একপর্যায়ে ওই ছাত্র ও শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে কলেজ ভবন থেকে বের করে আনার ঘটনার কিছু ছবি এবং ভিডিও ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওতে পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সংঘটিত ঘটনার ৯ দিন পর স্থানীয় পুলিশ বাদী হয়ে নাশকতা ও শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তা করার অভিযোগে মামলা করে।

আমাদের মনে আছে নিশ্চয়, শিক্ষক লাঞ্ছনার এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছিল রাজধানীর পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জে। পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল ধর্মীয় অবমাননার। অথচ ধর্ম নিয়ে কোনো কটূক্তির কোনো প্রমাণ ওই সময় পাওয়া যায়নি। তিনি এক ছাত্রকে প্রহার করেছিলেন। যাকে কেন্দ্র করে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে থাকা, তার বিরোধী গ্রুপের সদস্যরা ধর্ম নিয়ে কটূক্তির গুজব ছড়ায়। মসজিদের মাইকে ধর্ম অবমাননার কথা জানিয়ে স্কুলে লোক জড়ো করা হয়। শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে প্রহার করে কান ধরে ওঠবোস করানো হয়।

এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ওখানে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাটি ঘটে ২০১৬ সালের ১৩ মে। একজন শিক্ষককে এভাবে লাঞ্ছনা ও নিগ্রহের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর দেশজুড়ে চলে প্রতিবাদ। পরে পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল ও শ্যামল কান্তি ভক্তের বরখাস্তের আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে তাকে চাকরিতে বহালের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ ঘটনা বেশ কয়েক বছর আগের হলেও আমাদের স্মৃতিতে তা দগদগে ঘার মতো এখনো জীবন্ত।

রাজধানী ঢাকার পাশের আরেক জেলা মুন্সীগঞ্জে সংঘটিত হয়েছে শিক্ষক লাঞ্ছনার আরও একটি অধ্যায়। বিনোদপুর রামকুমার উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র ম-লকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল গত ২২ মার্চ। অভিযোগ আনা হয়েছিল ধর্ম অবমাননার। ২০ মার্চ তিনি বিজ্ঞান শিক্ষার ক্লাসে বিজ্ঞান ও ধর্মের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তা গোপনে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় কতিপয় ছাত্র। গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দুই দফায় তার জামিনের আবেদন নাকচ করলেও পরে তাকে জামিন দেন- যখন পুরো ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

লক্ষণীয় যে, প্রতিটি ঘটনায় কেন হিন্দু শিক্ষকদের টার্গেট করা হচ্ছে। সাভার, নড়াইল, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ- সব জায়গায় মনে হচ্ছে একই অঙ্ক। তাই প্রশ্নপত্র যে একটি বিশেষ জায়গা থেকে তৈরি হচ্ছে, তা বুঝতে মোটেই বেগ পাওয়ার কথা নয়। এই প্রশ্নপত্র তৈরিকারকদের একটিই স্বার্থ, তাদের পদচ্যুত করা এবং সেখানে নিজে বা নিজেদের লোকজনকে প্রতিষ্ঠিত করা। সংখ্যালঘুর ওপর এই চিত্র দেখার জন্য ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়নি। এই বাস্তবতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও নয়।

সব মানুষের সমান অধিকার ও ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল ১৯৭১ সালে, স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে এসে ওই স্বপ্ন কতটা পূরণ হলো- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে হতাশার পাল্লায় যেন ভারী হচ্ছে। এ দেশে জনসংখ্যার হার ক্রমবর্ধিষ্ণু হলেও হিন্দু জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যার হার আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এর মানে, এই দেশকে তারা নিরাপদ মনে করতে পারছে না। হিন্দুদের বসতবাড়ি ও জমিজায়গা দখল যে হয়েছে, তা তো দিবালোকের মতো সত্য। এখন শুরু হয়েছে তাদের কর্মসংস্থান থেকে সরানোর ষড়যন্ত্র। এর অংশ হিসেবে টার্গেট করা হচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের। এসব লাঞ্ছনা সেসব টার্গেটেরই অংশবিশেষ।

শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিটি ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর প্রশাসন ও সরকারের ভূমিকা ইতিবাচক। নানা ধরনের তৎপরতাও লক্ষণীয়। কিন্তু সবকিছু কেনো ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরই হচ্ছে। প্রতিকারমূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে কোনো ব্যবস্থা কেন গৃহীত হচ্ছে না। এত লোমহর্ষক ও বেদনাবিধুর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরও কি প্রতিকারমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের সময় হয়নি? ধর্ম অবমাননার নামে যারা মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন বা হাজির করে প্রকৃতার্থেই ধর্ম অবমাননা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা আইন প্রণয়নের সময় এখনো আসেনি?

এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনের প্রতি নির্দেশনাই বা কেমন এবং কতটা গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একের পর শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটছে আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদ ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকছে- এরই বা রহস্য কী? নাকি এসব ঘটনার পেছনে তাদের ইন্ধন রয়েছে। এত ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। অথচ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মেম্বার-চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর-মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান-এমপিদের দৃশ্যত কোনো ভূমিকাই দেখা যাচ্ছে না। শুধু নারায়ণগঞ্জের এমপির উপস্থিতি দেখা গেছে এবং পরিষ্কারভাবে বোঝাও গেছে ওনার উদ্দেশ্য ও শিক্ষকসমাজের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার বহর কতটা ও কেমন।

বাকি এমপি সাহেবরা কোথায়? এমপিদের নির্দেশনা ছাড়া সংসদীয় আসনগুলোয় পাখি পর্যন্ত উড়তে নাকি সাতবার ভাবে। সেখানে এসব ঘটনায় ওনারা কেন অনুপস্থিত কিংবা পর্দার আড়ালে রয়েছেন? ওনাদের নির্দেশনা ছাড়া কিছু সংঘটিত হয়, নাকি হতে পারে? হৃদয় ম-লের ঘটনার পর দেশের বিজ্ঞান শিক্ষা নিয়ে কোনো প্রকার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে কিনা- গণমাধ্যমের এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, ‘বিজ্ঞান শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার কোনো সংঘর্ষ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নেই, কখনো ছিল না, আগামীতেও থাকবে না। তাই সংঘর্ষের কোনো পরিস্থিতি কারণ দেখছি না। তবে একটি বিষয় থাকতে পারে- এটাকে পুঁজি করে, এ বিষয়টাকে সামনে এনে ও সাংঘর্ষিক একটা পরিস্থিতি তৈরি করে একটা মহল দীর্ঘদিন ধরে চাইছে একটা সাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং ধর্মে ধর্মে এক ধরনের সংঘাত তৈরি করার জন্য। যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করতে চায়, কট্টর একটা সমাজব্যবস্থা করতে চাই- তাদের পক্ষ থেকে এটা একটা অপচেষ্টা। সেটির বিষয়ে আমরা অবগত আছি।’

মন্ত্রী মহোদয় অবগত থাকলেই যে ব্যাপারটি সুরাহা বা ফায়সালা হয়ে যায়, ব্যাপারটি মোটেই তেমন নয়। যদি বাস্তবিকতই তেমনটি হতো, তা হলে হৃদয় ম-লের ঘটনার পর নড়াইলের ঘটনা সংঘটিত হতো না। সাভারের উৎপল বাবুকে জীবন দিয়ে প্রমাণ করে যেতে হতো না এই সমাজ-রাষ্ট্র শিক্ষকদের নিরাপত্তা দিতে, স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি দিতে পারছে না। লাঞ্ছিত হয়ে, জীবন দিয়ে শিক্ষকদের প্রমাণ করতে হচ্ছে এখানে শিক্ষক হওয়া অপরাধের শামিল। আর তারা যদি সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধি না হয়ে সংখ্যালঘুর প্রতিনিধি হন, তা হলে তো পদে পদে তার খেসারত দিতে হয়।

শিক্ষা নিয়ে দেশে একটি উদ্ভট অবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। এ কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও স্থাপনার বহর বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়েনি। উল্টো মানের অবনমন হয়েছে। ট্র্যাজেডি হলো, এই বাস্তবতা স্বীকারও করা হয় না; বরং দায় চাপানোর সংস্কৃতির বদৌলতে ক্ষমতার চৌহদ্দিতে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো অন্যের প্রতি দায় চাপিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন যে কোনো কিছু হলেই এর সঙ্গে ধর্মকে জুড়িয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠানো রীতিমতো ফ্যাশনে পরিণত হয়ে গেছে। এতে যে ধর্মের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং প্রকারান্তরে ধর্মকেই অবমাননা করা হয়, তা তারা বোঝেও না। কারণ তাদের উদ্দেশ্য ধর্মের নামে অধর্মের বিষবাষ্প ছড়ানো।

ধর্মকে কীভাবে হীনউদ্দেশে ব্যবহার করা হয়, এর জুৎসই উদাহরণ হলো নোয়াখালীতে সংঘটিত ঘটনাটি। বোরকা পরা নিয়েও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিংসা ছড়ানো হয়েছে, উত্তপ্ত করা হয়েছে সার্বিক পরিস্থিতি। ঘটনাটি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার একটি মাধ্যমিক স্কুলের। স্কুল কর্তৃপক্ষ এ বছরের ৭ মার্চ একটি নোটিশ দেয়- যাতে ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষের ভেতরে এসে বোরকায় মুখম-ল ঢেকে না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ পরে ওই নোটিশও প্রত্যাহার করে নেয়। ঘটনার দুই সপ্তাহ পর দেখা গেছে, স্বল্পসংখ্যক মানুষ এ নিয়ে বিক্ষোভ করেছে।

নোটিশটি নিয়ে বহিরাগতরা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় সেটি প্রত্যাহারও করে নেওয়া হয়। এর পরও স্কুলে বোরকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে- এমন দাবি তুলে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে স্কুলের শিক্ষার্থী ও কথিত ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একদল ব্যক্তি। প্রশ্ন হলো, এই তৌহিদী জনতা কারা- যারা নানারূপে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিল করে? শিক্ষক লাঞ্ছনার নেপথ্যে রয়েছে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের রাজনীতি এবং অন্যের জায়গাজমি ও পদ-পদবি দখলের দূরভিসন্ধি। তা মোকাবিলা করতে হবে সরকারকেই।

লেখক-

ড. কাজল রশীদ শাহীন : সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও গবেষক