শিক্ষকের উন্নয়নেও দৃষ্টি প্রয়োজন

প্রকাশিত: ১০:১০ পূর্বাহ্ণ, শনি, ৯ অক্টোবর ২১

মোস্তাফিজুর রহমান।।

‘শিক্ষক’ শব্দটি রক্তে অর্জিত বাংলা তিন বর্ণের অন্বয় হলেও বাংলায় তার মর্যাদাটা কিন্তু ভাষার মতো উচ্চৈঃস্বরে ধ্বনিত হয়নি; পায়নি সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদাও। বিশ্বের শিক্ষক সমাজ মানুষ গড়ার এ নিঃস্বার্থ কারিগরদের সমাজ ও জাতিগুলোর উঁচু স্থানে তুলে আনতে গিয়ে তাদের ত্যাগ ও অবদান স্মরণ করে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কোর সদস্যভুক্ত প্রতিটি দেশ যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিনটি পালন করে আসছে ১৯৯৫ সাল থেকে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘টিচার এট দ্য হার্ট অব দ্য এডুকেশন রিকভারি’।

স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম যে সরকার প্রাথমিক শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা দিতে শুরু করল তা জাতির কাছে অবিদিত কিছু নহে। এরপরও করুণ পরিণতির কথা বলতে গিয়ে আশরাফ সিদ্দিকীর ‘তালেব মাস্টার’ কবিতাটি বারবার হৃদয়পটে নাড়া দেয়। ধর্মান্ধ, ক্ষীণদৃষ্টি পাকিস্তানিরা কখনোই চায়নি বাংলার শিক্ষক সমাজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে জাতিকে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাক। একটি ঘটনা বলা যেতে পারে। আমেরিকা যখন চাঁদে অভিযান করল তখন বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক নবদিগন্তের ব্যাপ্তি ঘটলে রাশিয়াসহ উন্নত দেশগুলো তাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করতে শুরু করল। তারা শিক্ষকদের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা বিশ্নেষণ করে তার সমাধানে সচেষ্ট হলো। তাদের চেষ্টার সফলতা তারা কতটুকু পেয়েছে তা সচেতন মানুষের কাছে বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষক সমাজকে আলোর মুখ দেখাতে একাধিকবার গঠিত হয়েছে শিক্ষা কমিশন, প্রণীত হয়েছে শিক্ষানীতি। সেগুলো অনেকটাই আলোর মুখ দেখেনি। তবে সেগুলো বাস্তবায়নে অতীতের বিশেষ করে বর্তমান সরকার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সুরম্য অট্টালিকা হচ্ছে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে বিগত কয়েক বছর থেকে। এটা অভিনন্দনযোগ্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, যারা এ জাতির আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে সামনে এগোবে তাদের অবস্থা কী? যখন পত্রিকার পাতায় দেখি বিনা বেতনেই জীবন পার।

আধাবেলা শিক্ষক আধাবেলা রাজমিস্ত্রি তখন দুঃখে, ক্ষোভে হৃদয়ে দাবানল ওঠে। তার জ্বলন্ত শিখা কি রাষ্ট্রকে দহন করে না? তাহলে কী বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের ‘তোতা কাহিনী’র তোতার খাঁচার উন্নতি হলেও তোতার হয়েছে জীবনাবসান। শিক্ষক সমাজ আজ তোতা না হলেও কোনো অংশে বেশি বৈ কম না। বর্তমান সরকার তার বিগত সময়ে বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদি প্রায় দ্বিগুণ করলেও জীবনযাপনের জন্য তা কতটুকু প্রতুল তা আমরাই বুঝি। পেটে ক্ষুধা রেখে সরকার সেবা চায়। আমার এ কথা অনেকটা আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরের মতো হলেও যার ব্যথা সে বোঝে।

আমরা বেসরকারি শিক্ষক, আমাদের বক্তব্যের ভিত্তি এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই। শিক্ষকদের এমতাবস্থায়ও একজন আদর্শ শিক্ষক হয়তো তার একটি শ্রেণি পাঠদানেও ফাঁকি দেন না। রাষ্ট্রের উচিত তাদের প্রতি গুরুত্বারোপ বাড়িয়ে তোলা। রবীন্দ্রনাথ তার একটি কবিতায় বলেছেন, ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ যাদের তুমি করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাদের সবার সমান।’ আমরা এতটা বলতে চাই না। তবে শিক্ষকদের, বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের আরও যত্নবান হওয়া দরকার। আমরা শিক্ষক সমাজ থেমে থাকব না, ভগ্ন প্রদীপের শেষ তেলটুকু ফুরিয়ে দেশের অগ্রগতি ও উন্নতির জন্য। এগিয়ে যাক সোনার বাংলা।

লেখক- সহকারী শিক্ষক (বাংলা), নাখালপাড়া হোসেন আলী উচ্চ বিদ্যালয়।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.