শিক্ষকদের দিয়েই শিক্ষার রূপান্তর শুরু

ডক্টর মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন।।

শিক্ষা ও জ্ঞানের তলানীতে পৌছে যাওয়া ২০২২ সাল। এই পরিস্থিতিতে আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিবসে বিশ্বের সকল সন্মানিত শিক্ষকদের প্রতি সন্মান শ্রদ্ধা। ১৯৯৪ সাল থেকে জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর এ দিবসটি উদযাপিত হয়। ২০২২ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো- `The civilizations run on education. The transformation of education begins with teachers.

অর্থাৎ ‘ শিক্ষকদের দিয়েই শিক্ষার রূপান্তর শুরু’।শিক্ষাথীর জীবনের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধনই শিক্ষার উদ্দেশ্য। নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে যেসব বিষয় সরাসরি সম্পর্কিত: সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, সন্ত্রাস দমন, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা। আচরণে (কর্মে) অভীষ্ট ইতিবাচক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধনের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তথ্য প্রদান বা জ্ঞান দান করাকে শিক্ষা বলে।

খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর এক প্রশ্নের জবাবে হজরত উবায় ইবনে কাআব (রা.) বলেন, ‘ইলম হলো তিনটি বিষয় আয়াতে মুহকামাহ (কোরআন), প্রতিষ্ঠিত সুন্নত (হাদিস) ও ন্যায় বিধান- (তিরমিজি)। হজরত ইব্রাহিম (আ.) দোয়া করলেন, ‘হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের মধ্যে পাঠান এমন রাসুল, যিনি তাদের সমীপে আপনার আয়াত উপস্থাপন করবেন, কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী স্নেহশীল ও কৌশলী।’ (সুরা-২ বাকারা)

যুগে যুগে সন্মান্তি শিক্ষকরা এই কাজটিই করছেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২২ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ১৯৬৬ সাল থেকে প্যারিসে শিক্ষকের মর্যাদা সংক্রান্ত আন্তঃসরকার সম্মেলনে ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব এবং মর্যাদা সম্পর্কে একটি যৌথ সুপারিশমালা প্রণয়ন করে।

উক্ত সুপারিশমালায় শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানজনক অবস্থানে নেওয়াসহ শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও পদোন্নতি, দায়িত্ব ও অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা বিধানের প্রক্রিয়া, পেশাগত স্বাধীনতা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন, শিক্ষা সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, কার্যকর শিক্ষাদান ও শিখনের পরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছিল।

আন্তর্জাতিক এ সংগঠনটি পর্যায়ক্রমে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলো কর্তৃক প্রণীত দলিলটি যথাযথ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করার অর্থবহ উদ্যোগ গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনের গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কোর তৎকালীন মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম মেয়রের ঘোষণার মাধ্যমে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের শুভ সূচনা হয়।

প্রতি তিন বছর পরপর অনুষ্ঠিত আইএলও ইউনেস্কো যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটির সভায় উচ্চ শিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষকদের জন্য একটি সুপারিশমালা গৃহীত হয়। বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পালন করা হয়। বিশ্বের ১৬৭ টি দেশের এ দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এ দিবসটি পালনে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল ও তার সহযোগী ৪০১টি সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা রেখে আসছে।

এ সংগঠনটি বিশ্বের ৩ কোটি ২০ লাখ সদস্যের প্রতিনিধিত্ব করে।এবারের শিক্ষক দিবস অন্য বারের তুলনায় ব্যতিক্রম। করোনার মত বৈশ্বিক মহামারিতে যখন আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিশেষত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন হুমকির একেবারে কিনারায় ঠিক সেই মূহুতে শিক্ষক দিবস এবং এর ব্যতিক্রমী প্রতিপাদ্য বিষয় আমাকে আবেগ তাড়িত করেছে। কিন্তু শিক্ষাকে রূপান্তর এতই কি সোজা? যে শিক্ষকদের কথা বলা হচ্ছে আদৌ গত ২বছরে সরকার তাদের পাশে কতটা ছিল সেটিও বিবেচনায় আসবে। আনতে হবে।

একথা একদম অস্বীকার করছি না যে, আমাদের শিক্ষকদের কোন উন্নতি হয়নি, হয়েছে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম ও স্বল্প। প্রবীন ও দক্ষ শিক্ষকদের অধিকাংশই বিদায় নিয়েছেন আর মেধাবী তরুণ শিক্ষকরা এই পেশাকে স্বল্প সময়ের জন্য নিলেও তারা মূলত. সময়ের ব্যবধানে সরে পড়ছেন। প্রবীন শিক্ষকদের যে অভাব তা পূরণ করবে কে? এই প্রশ্নের যখন শুরু তখন একথা বলছি যে, এই অংশ ফাঁকা থাক।

কারণ মেধাবী মানুষদের শিক্ষকতায় আনতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদী একটি পরিকল্পনা, সেই পরিকল্পনা তো চোখে পড়ছে না। ‘শিক্ষকদের দিয়েই শিক্ষার রূপান্তর শুরু-এটি একটি আধুনিক, সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ বক্তব্য। কিন্তু এই বক্তব্যকে যর্থাথভাবে কাজে লাগানোর জন্য সরকারের পরিকল্পনা কোথায়? আমি শিক্ষা বিষয়ে লেখালেখি ও পড়াশোনা করি যেখানে-এই বিষয়ে যা পাই তা একবার চোখ বুলানোর চেষ্টা করি।

কিন্তু কোথাও এর কোন কাটা কড়ি দেখতে পেলাম না। হ্যাঁ একথা অস্বীকার করছি না যে, সরকার কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু হাজারো সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষকদের নিয়ে কোথাও এমন কিছু দেখছি না যা আমাকে অন্তত স্বপ্ন দেখাবে, আমি আশাবাদী হব। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে যে সকল পরিকল্পনা থাকা চাই তারও কোন বাস্তব পরিকল্পনা চোখে পড়ল না।

একটি দেশের শিক্ষার বিকাশে যেখানে শিক্ষকই প্রধান চালিকা শক্তি সেখানে করোনার সময় শিক্ষকদের অবস্থা আমরা কে না জানি? জানি তারা পেশা পরিবর্তন করেছে। জানি তারা একবেলা খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছে। জানি তারা ভ্যান চালিয়ে, তরকারি বিক্রি করে সংসারের খরচ জোগান দিতে কতটা ব্যর্থ হয়েছে। অথচ কি সুন্দর একটি প্রতিপাদ্য দিয়ে মন ভরানোর এই বিলাসী স্বপ্ন কাদের জন্য? এখানেই ‘শিক্ষকদের দিয়েই শিক্ষার রূপান্তর শুরু??? এক ধরনের উচ্চবিলাসী হটকারীতাও মনে হয়।

দেশের শিক্ষার অধিকাংশ অর্থাৎ ৯০ শতাংশ সেবা দিয়ে আসছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষকরা। তাদের খবর কোথায়, কে, কখন নেন আমার জানা নাই। যেখানে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক মূল বেতনের প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পান সেখানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বাড়িভাড়া মাত্র ১০০টাকা। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ৩টি উৎসব বোনাস পান মূল বেতনের সমান, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পান মূল স্কেলের ২৫ শতাংশ।

এছাড়াও বেসরকারি বিদ্যালয়ে আছে প্রয়োজনের তুলনায় কম শিক্ষক, যারফলে একজন শিক্ষক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চেয়ে অন্তত দ্বিগুন ক্লাস করছেন। এছাড়াও রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যেকার নানামূখী সমস্যা ও অন্তহীন গাফলা। তাহলে এবারের শিক্ষক দিবসের বক্তব্যটি একটি অবাস্তব, কল্পনাপ্রসূত, উচ্চবিলাসী বক্তব্য বলে প্রমাণিত হবে না? বর্তমান সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অন্তত. কয়েক দফা বলেছেন, ‘শিক্ষকরা হলেন শিক্ষার নেয়ামক। তাঁদের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে। শিক্ষকদেরও নিবেদিত প্রাণ হিসাবে কাজ করতে হবে।’

শিক্ষামন্ত্রীর ৩টি বক্তব্যই ঠিক। তিনি শিক্ষার নেয়ামক হিসাবে শিক্ষকদের উপস্থাপন করেছেন, যা সঠিক। অপরদিকে এই নেয়ামক শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে তাদের যথার্থ সুযোগ সুবিধা দরকার এটাও ঠিক। সুযোগ সুবিধা পেলে তাদেরকে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে এটা আরো ঠিক। সুতরাং এর বাস্তব প্রতিফলনটাই এখন খুব জরুরী। ‘শিক্ষকরাই জাতির মেরুদন্ড’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে আমি শিক্ষাকে এভাবে বর্ণনা করেছিলাম,
‘শিক্ষা হল সমাজবদ্ধ মানবতার বীজ বপনের বুদ্ধিদীপ্ত হাতিয়ার।’

একটি ভাল বীজ কেবল মাত্র একটি ভাল ফসল উৎপাদন করতে পারে। আর বীজকে গাছ এবং ফসলে পরিণত করতে পারে একজন শিক্ষক। শিক্ষকরা পারে অনাবাদি জমিতে আবাদ সৃষ্টি করতে, অফসলী গাছে ফসল ফলাতে। সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন কেবল শিক্ষাতেই সম্ভব। শিক্ষাকে বাদ দিয়ে সমাজে সার্বিক উন্নয়নের যে চিন্তা যেখানেই হয়েছে সেখানেই সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। অবক্ষয়ে ঝরে পড়া সমাজ, অ-সুন্দরে লিপ্ত পৃথিবীকে শিল্পীর মন ও মানস দিয়ে একমাত্র শিক্ষকরাই যুগে যুগে উন্নত করেছে।

তাই শিক্ষকদের মধ্যে থাকা দরকার আধুনিকতা, নান্দনিকতা, নতুন চিন্তা শক্তি ও মঙ্গলের কথা। আজকাল এখানেই যত সমস্যা। শিক্ষকদের কাছে আজ জ্ঞান বিতরণের চেয়ে অর্থ উপার্জরের দিকে বেশি মনোনিবেশ করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও দেশের উন্নতির আগে নিজের উন্নতির কথাই বেশি ভাবতে হচ্ছে। কারণ তারাও অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতই জীবন যাপন করতে অভ্যস্থ। তাদের অন্য গ্রহের মানুষ মনে করার যে প্রবণতা তাও সরকার ও সমাজকে ভাবতে হবে।

জাতির মেরুদন্ড নিয়ে নানা আলোচনা দীর্ঘদিন শুনে আসছি। আজ আমি বলছি শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড এই কথাটি যথার্থ নয়। প্রকৃত অর্থে ‘শিক্ষকরাই’ জাতির মেরুদন্ড এই কথাটি যথার্থ, সময়োপযোগি ও ন্যায় সঙ্গত। তবে প্রশ্ন কোন শিক্ষক ? অবশ্যই আদর্শ শিক্ষক। একজন আদর্শ শিক্ষক কেমন হবেন-তাঁর কি কি গুণাবলী থাকবে- তিনি দেখতে কেমন হবেন নানা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তিনি ছাত্রদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করবেন-তার মন মানস দিয়ে।

শিক্ষার্থীর প্রতিভা জাগ্রত করার এই মহান কাজটি শুধু তিনিই করতে পারেন যিনি শিল্পী। শিল্পীর মন ও মানস না থাকলে কখনও এই কাজটি করা সম্ভব নয়। অথচ শিক্ষককে বলা হয় ‘কারিগর’। একজন কারিগর আর একজন শিল্পীর তফাৎ বুঝার সময় এসে গেছে। শিক্ষক কারিগর এই কথা সনাতন। শিক্ষকরা শিল্পী এই কথাই যথার্থ-যুপোযোগী। আর শিল্পীকে যথার্থভাবে ভরণ পোষণ করতে হবে, বাঁচতে হবে, সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে তাকে চলতে হবে তাহলে কেবল বক্তব্যটি সঠিক হবে।

জাতির মেরুদন্ড শিক্ষা হলেও আজ যাদের দিয়ে মেরুদন্ড ঠিক করার কথা তারা অবহেলিত, বঞ্চিত। স্বাধীনতার ৫০বছর পার হলেও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার মুখ আমরা যেমন দেখিনি তেমনি আবার শিক্ষকদের প্রতিও রয়েছে হাজার বঞ্চনা। অথচ ‘পরিতুষ্ট শিক্ষকের উপর শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ নির্ভরশীল।’ মনে রাখতে হবে প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে যারা শ্রেণী কক্ষে পড়াতে যাবে তাদেরও বেঁচে থাকতে হবে।

তাই এই বিষয়টির এখানে শেষ হলে ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের জন্য তো বটে তবে জাতির জন্য আরো বেশি মঙ্গল। ‘জাতির মেরুদন্ড’ এবং ‘কারিগর’ নিয়ে যে বিভ্রান্তি রয়েছে তার দূর করার চেষ্টা করলাম। মনে রাখতে হবে শিক্ষকরাই পারেন সমাজকে বদলে দিতে কারণ এই কাজটি তাদেরই। আর পাশে থাকবে সরকার।

১৯৯৫ সাল আমি তখন অনার্স ক্লাসের ছাত্র। পত্রিকার পাতায় দেখলাম আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের মর্যাদানের জন্য বিশ্বব্যাপি আজকের দিনে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে গত ১৯৯৪ সাল থেকে। পত্রিকার এই লাইটি আমাকে শিক্ষক হতে উৎসাহিত করল, আমার কাছে মনে হল শিক্ষকদের সন্মান অনেক বেশি। আমি ভাবলাম বিশ্ব মা দিবস, শিশু দিবস, জাতিসংঘ দিবসসহ নানা দিবস পালিত হচ্ছে।

আমি যদি আমলা, ব্যাংকার বা সরকারি অন্য কোন চাকুরীজীবি বা ব্যবসায়ী হই তো আমার কর্মের কোন বিশ্ব দিবস থাকবে না, শ্রদ্ধাবোধ থাকবে না। কিন্তু শিক্ষক হলে অন্তত এই একটি দিনতো সম্মানের জন্য থাকবে, আমার কর্মের স্বীকৃতি নিয়ে অন্তত একদিন হলেও দিবস পালিত হবে এই বোধ থেকে সন্মান পাওয়ার জন্যই আমি শিক্ষকতাকে পেশা হিসবে নিয়েছি। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও উদ্যোক্তা হিসাবে বার বার স্বীকৃতিও পেয়েছি। আমার অনেক ছাত্র, অভিভাবক ও হিতাকাঙ্খি আছে শিক্ষক হিসাবে এখানেই সফলতা।

প্রতিবছর শিক্ষক দিবসে বত্তৃতা করি কয়েকটি অনুষ্ঠানে। যারা বক্তৃতা করেন তাদের অনেকেই শিক্ষকদের নিয়ে কত কথা, কত হাসি আর কত আনন্দের স্মৃতি উপস্থাপন করেন। তাদের মধ্যে অনেকের বয়স ৫০/৬০/৭০ বা তারও বেশি কম। চিন্তা করুন তো এত বছর আগের শিক্ষকদের সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া স্মৃতি কিভাবে একেকজন মনে রেখেছেন। আমি অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসে বসে ভাবি। শিক্ষকতা পেশায় এসে বুঝি আমি ভুল করিনি।

আমার অবর্তমানে আমার একজন শিক্ষার্থী হলেও আমার সর্ম্পকে বলবে এটা ভেবে খুবই ভাল লাগে। আমার যখন বলার সময় হলো, ‘প্রিয় শিক্ষকের আদর, ভালবাসা আর স্মৃতির কথা বলে শেষ করলাম।’ অথচ স্যার আজ বেঁচে নেই। এখানেই শিক্ষকদের বড় সার্থকতা, বড় পাওনা। আমি মনেকরি শিক্ষকই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শিক্ষকরাই পারেন পৃথিবীকে বদলাতে, পারেন সমাজকে উচ্চতর স্থানে নিয়ে যেতে। পারেন শিক্ষাকেও পুনরুদ্ধারের কেন্দ্র বিন্দুতে যেতে।

সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম-আগেও, এখনও; বেসরকারি বেশি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্ম সাধারণত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের উৎসাহ ও উদ্যোগে; ইদানিং অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে ব্যক্তি বিশেষের উচ্চাকাঙ্খার প্রতীক হিসাবে। স্বাধীন দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দেশের মধ্যে অনাদৃত। দেশের মানুষ দেশের শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। এই শিক্ষার প্রতি ন্যূনতম আস্থা নাই মানুষের। বিত্তবান শ্রেণীর সন্তানরা দেশীয় আমজনতার জন্য চালু শিক্ষাব্যবস্থার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারে কাছে ও নাই।

বিত্তশ্রেণীর সন্তানরা দেশ ছাড়ছে ভাল শিক্ষার আশায়। আবার অভিভাবক কিছুটা সঙ্গতি থাকলে দেশের মধ্যে বিদেশী অনুকরণের বা খাস বিদেশী শিক্ষাব্যবস্থা বেচে নিচ্ছে। দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই দশা কারো অজানা নয়। তবে কেন পরিকল্পিতভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে? স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও কেন একটি সময়োপযোগি, নান্দনিক, গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হল না? এই যে অবস্থা এর জন্য অভিভাবককে ঢালাও ভাবে দায়ী করা যাবে না। সর্বস্তরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নৈরাজ্য মানুষকে যথার্থ এক অসহায় আবর্তে ফেলেছে-যার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া এককভাবে সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষক-শিক্ষা প্রসাশকরা কম দায়ী নয়।

কারণ কী তা ভাবতে হবে, জানতে হবে আমাদের সকলের। শিক্ষককে অভুক্ত রেখে শিক্ষাব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধন অতীতে হয়নি আগামীতেও হবে না। যেভাবে একজন শিক্ষককের পদোন্নতি, স্কেল উত্তরণ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। অথচ এই ব্যবস্থা সুচারুরূপে পরিচালিত হলে সর্বাধুনিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষকদের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব সর্ম্পকে সচেতন ও সর্তকতা উভয়ই বৃদ্ধি পেতো। বর্তমানে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার মান নিম্নমুখী হওয়ার কারণ শিক্ষা সর্ম্পকে অধিকাংশ শিক্ষকের নিস্পৃহতা এবং শিক্ষকতাকে মাত্রই অর্থোপার্জনের হাতিয়ার হিসাবে মনে করা।

শিক্ষক সমাজের বাইরের কেউ নন, সমাজ যেখানে টালমাটাল সেখানে শিক্ষক দেবদূত হবেন, এ প্রত্যাশা আমি করি না। সমাজ বলতে আমি আমাদের বাঙ্গালী সমাজকে বুঝিয়েছি। এই সমাজ বরাবরই শিক্ষককে চাওয়া পাওয়ার বাইরের বস্তু জগতের মানুষরূপে কল্পনা করেছে। আড়ম্বরহীনতার নামে শিক্ষকের ওপর দারিদ্র চাপানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষককে অলৌকিক জগতের বাসিন্দা মনে করার কোন ন্যায় সঙ্গত কারণ আমি খুঁজে পাই না। শিক্ষা চিন্তাবিদরা তাই বলেছেন,

`The ccivilizations run on education.সমাজ পরিবর্তনের মৌল উপাদানও শিক্ষা। শিক্ষাকে যিঁনি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেন তিনি হলেন শিক্ষক। শিক্ষকরা একদিকে প্রচারক, আরেক দিকে তাঁরা নবী, রসূলদের উত্তরসুরীও বটে। কারণ শিক্ষকরা নবী রসূলদের কাজটিই করেন। শিক্ষকরা প্রতিটি দেশের সম্পদ। তিনি সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনের সম্ভাবনাময় সংগঠক।

আধুনিক মননশীল শিক্ষকের অভাবের কারণে আজকাল শিক্ষাকে সমাজ উপযোগি করার যে স্বপ্ন তা হয়ে উঠছে না। এই কাজটি অতি সহজে করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষককে আধুনিক দীক্ষায় দিক্ষিত করা। শিক্ষক পারেন শিক্ষার বিকাশ ও শিক্ষার্থীর মনন তৈরীতে সহায়তা করতে। অনেক সময় তাও হচ্ছে না। কারণ বাবা মা সন্তান লাভের পরই যে চিন্তা তাকে নিয়ে সেটা হল, সন্তান হয় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা মোটাদাগের অফিসার হবে। যারফলে সন্তানের মধ্যে এমন এক ধরনের মানসিকতা বিকাশ লাভ করছে, সে শিক্ষকতাকে আর পেশা হিসাবে ভাবতেও পারছেন না। যারফলে মেধাবীরা শিক্ষকতাকে আর কাজ হিসাবে বেচে নিচ্ছেন না।

আধুনিক চিন্তাবিদরা বলেছেন একটি জাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থাটাই হচ্ছে শিক্ষক। শিক্ষকতা পেশায় কেবল ওদের আসা উচিত যারা সমাজে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চান। কারণ এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মুহাম্মদ (স.), ছিলেন সক্রেটিস, রবীন্দ্র নাথ ও স্বামী বিবেকানন্দসহ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষগন। তারা এই বিষয়টিকে শ্রেষ্ঠ হিসাবে দেখেছেন বলেই কেবল নিজেরাই দেশ-জাতি ও সীমানার উর্ধ্বে উঠে শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হয়েছেন। তাঁদের মত আজকাল এই পেশাকে ভালবেসে কেউ আসেন না, কেউ আসেন দেখে আর কেউ ঠেকে। যারা ভালবেসে এসেছেন তারা উন্নতি করছেনও বটে। কারণ এ পেশায় যা আছে অন্য পেশায় তা বিরল। এখনও আমাদের সমাজ শিক্ষকদের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে জানে।

এই পেশাকে কেবল পেশা হিসাবে বিবেচনা না করে শ্রেষ্ঠ সমাজ সেবা হিসাবে ও বিবেচনা করা উচিত। তাই যাদের মধ্যে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, পরোপকারে যাদের থাকবে মনোযোগ কেবল তাদেরই শিক্ষকতায় আসা উচিত। কারণ তাকে অনুসরন করবে শিক্ষার্থী, সমাজ ও দেশ। তিনি পরিবর্তন করবেন সমাজের প্রতিটি দিককে। তিনি ফুটিয়ে তুলবেন সমাজব্যবস্থাকে, তার কাছ থেকে জাতি গ্রহণ করবে আগামী দিনের দিক-নির্দেশনা। সুতরাং শিক্ষকরাই হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সূতিকারগার।

কিন্তু পরিতাপের সাথে লক্ষ্যনীয় যে আমাদের সমাজে শিক্ষকদের অবস্থার চিত্রটি ভিন্ন। সৌন্দর্যের বাসনাকে সুশৃঙ্খলিত এবং সজাগ করে জাতি গঠনে শিক্ষার্থীকে এগিয়ে বিশ্ব জয়ের বাসনায় যিনি নিতে পারবেন তিনিই হবেন শিক্ষক। মানবিক মূল্যবোধে উৎসাহিত হয়ে দেশ গঠনে, পরিপূর্ণ মানবিক বিকাশ সাধনে, একটি উন্নত শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে পারে শিক্ষক। আর দেশের প্রতিটি শিক্ষক এই মহান কাজটি করতে এগিয়ে আসুক এই দাবি আমি সকলের সাথে করতে চাই। তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষকদের কিছু বিষয় দেখা যা নিম্নরূপ হতে পারে-
ক. করোনা মহামারিতে শিক্ষকদের অবদান স্মরণ করা
খ. বেসরকারি শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণ
গ. শূণ্যপদ সমূহ পূরণের ব্যবস্থা করা
ঘ. বেতন বৈষম্য দূর করা
ঙ. মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনা
চ. শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করে তোলা
ছ. শিক্ষক সমাজকে দলীয় প্রভাব মুক্ত রাখা।
সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষার আধুনিকায়ন করতে হবে তবেই শিক্ষকদের দিয়েই শিক্ষার রূপান্তর শুরু-এই বক্তব্য সঠিক বলে প্রমাণিত হবে। আমরা আশা করে রইলাম সেই দিনের জন্য।

লেখক : শিক্ষাবিদ-নজরুল গবেষক
ফাউন্ডার প্রিন্সিপাল, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ