শর্ত মানলেই আইএমএফের ঋণ

নিউজ ডেস্ক।।

ব্যালেন্স অব পেমেন্ট, বাজেট সহায়তা ও অবকাঠামো খাতের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের কাছ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ঋণ চেয়েছে সরকার। তবে, এ ঋণ পেতে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, করপোরেট সুশাসন আরো বলিষ্ঠ করতে হবে।

একই সাথে বর্তমান অবকাঠামোর ওপর তদারকি কঠোর করাসহ বেশ কিছু শর্ত পরিপালন করতে হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এসব শর্ত পরিপালন করতে হবে। ঋণের শর্তগুলো চূড়ান্ত করতে চলতি মাসের শেষের দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসবে। দু’পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, গত জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে ঋণ চায় বাংলাদেশ। এ নিয়ে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলোতে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। এসব বৈঠকে ঋণ পাওয়ার শর্তগুলোর বিষয়ে আলোচনা হয় বলে ওই সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের আধিক্য বেশি। গ্রাহক ঋণ নিয়ে তার বড় একটি অংশ ফেরত দেয় না। বিশেষ করে গত দুই বছরের করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেই ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বার বার শিথিলতা প্রদর্শন করা হয়। বাংলাদেশের ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়, ঋণ পরিশোধ না করলেও গ্রাহককে খেলাপি করা যাবে না। এখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমে এলেও ঋণ পরিশোধে বড় বড় গ্রাহকরা এক ধরনের অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এ কারণে দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের চেয়ে অদৃশ্য খেলাপি ঋণ অনেক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে উচ্চ মাত্রার ‘নন-পারফর্মিং ঋণ’ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এ সমস্যা অনেকটাই প্রকট। আইএমএফ এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের কথা উল্লেখ করেছে। করপোরেট সুশাসন আরো বলিষ্ঠ করা, বর্তমান অবকাঠামোর ওপর তদারকি আরো কঠোর ও এর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণদাতাদের অধিকার প্রয়োগের জন্য আরো বলিষ্ঠ সহযোগিতা ও ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের জন্য প্রণোদনা নিশ্চিত করার জন্য আইনি ব্যবস্থার যথোপযুক্ত সংস্কার করার কথা বলা হয়েছে আইএমএফের পক্ষ থেকে।

জানা গেছে, দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে কর হার অনেক কম। আর এ কারণেই আইএমএফ বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে। ভ্যাট অবকাঠামোর সরলীকরণ, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও বড় করদাতাদের কাছ থেকে ঠিকমতো কর আদায় করতে না পারার ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থাপনার মতো লক্ষ্য নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে আইএফএফের পক্ষ থেকে।

জানা গেছে, আইএমএফ বেশ কিছু দিন যাবত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন করে আসছে। রিজার্ভ থেকে রফতানিমুখী শিল্প উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ দেয়া হয়। এ জন্য রিজার্ভ থেকে তহবিল নিয়ে রফতানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফ নামক একটি তহবিল রয়েছে। আইএমএফের যুক্তি হলো, যেহেতু রিজার্ভ থেকে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়া হয়েছে, সে জন্য বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থেকে এ অংশটুকু বাদ দিতে হবে। তাতে রিজার্ভের পরিমাণ সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আবারো আইএমএফ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনা করার পদ্ধতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে কর জিডিপির অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন এবং বিশ্বের সবচেয়ে কম অনুপাতের মধ্যে অন্যতম। এ কারণে রাজস্ব খাত সংস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাট অবকাঠামোর সরলীকরণ, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও বড় করদাতাদের কাছ থেকে ঠিকমতো কর আদায় করতে না পারার ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থাপনার মতো লক্ষ্য নির্ধারণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের ঋণ পাওয়ার শর্তগুলো চূড়ান্ত করতে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসবে। দুই পক্ষের বৈঠকে এসব শর্তগুলো চূড়ান্ত করা হবে। আর এসব শর্ত বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ তিন বছর সময় পাবে। বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হলে আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের কাছে একটি ঋণ পরিকল্পনা পাঠানো হবে। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস সময় লাগে। নির্বাহী বোর্ডের অনুমোদনের পর ঋণ বিতরণ করা হয়।