লকডাউন বনাম সাংবিধানিক অধিকার

প্রকাশিত: ১:৫৪ অপরাহ্ণ, সোম, ২৬ জুলাই ২১

লকডাউন অর্থ তালাবদ্ধ, জরুরি অবস্থায় নেয়া, বাইরে থেকে তালা দেওয়া, অবরুদ্ধতা ইত্যাদি।

ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে লকডাউন এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে কোন জরুরী পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে কোন জায়গা থেকে বের হতে না দেয়া কিংবা ওই জায়গায় প্রবেশে বাধা দিলেই হল লকডাউন।
অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে বলা হয়েছে জরুরী সুরক্ষার প্রয়োজনে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করাই হলো লকডাউন। মহামারী করোনার সংক্রমণ রোধ করার জন্য সরকার জনগণের ঢলা ফেরার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে তাদের ঘরের মধ্যে বন্দি করে রেখেছে যাকে আমরা লকডাউন বলি।
বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণের কিছু মৌলিক অধিকার দেওয়া আছে ।যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ,শিক্ষা ,চিকিৎসা ইত্যাদি। এর বাইরে আছে ব্যক্তি স্বাধীনতা। সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত এ অধিকার বলে ব্যক্তিগত যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় হাঁটাচলা কিংবা ঘুরে বেড়ানোর অধিকার রাখে ।কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না।
লকডাউন হলো সংবিধান প্রদত্ত অধিকার ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করার একটি নির্বাহী আদেশ। লকডাউন এর কারণে মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না। এমত অবস্থায় লকডাউনের আদেশ এবং সাংবিধানিক অধিকার ব্যক্তি স্বাধীনতা সাংঘর্ষিক হয়ে পড়েছে।
কোন দেশের সংবিধান হলো সে দেশের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের সংবিধানে আরেকটি কথা আছে তা হল —এই সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন অন্য কোন আইন যদি এই আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে তা আপনা আপনি বাতিল বলে গণ্য। তাই দেখা যাচ্ছে সংবিধানের দৃষ্টিতে লকডাউনের আইন বাতিল যোগ্য আদেশ।

পাঠক আপনারা তো বলবেন জরুরী পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্যকে সংক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখার জন্যই তো লকডাউন। তাহলে আমি বলব জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে সংবিধান মুলতবি রাখতে হবে,জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে।অথবা সংসদে সংবিধান পরিবর্তন করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। যেমন ২০২০ সালে এইচ এস সি পরীক্ষায় অটো পাস দেওয়া নিয়ে সরকার আইনি জটিলতায় পড়ে। অবশেষে সংসদে আইন পাস করে অটো পাশের ঘোষণ দিতে হয়।
জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা যেমন সরকারের দায়িত্ব তেমনি অন্ন ,বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এর সব অধিকার রক্ষা করাও তেমনি সরকারের দায়িত্ব।
লকডাউন দেয়ার আগে এসব মৌলিক অধিকারগুলো দিয়ে দেওয়া আবশ্যক। জনগণের এ সকল মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন না করে লকডাউন দিয়ে ঘরে বন্দী রাখলে তা হবে জুলুম।
সত্য কথা বলতে কি লকডাউন এক কষ্টদায়ক অবস্থা । বিশেষ করে দিন মজুরদের জন্য। পহেলা জুলাই২০২১ থেকে চোদ্দোই জুলাই পর্যন্ত আমরা সারাদেশে একযোগে লকডাউন পালন করেছি। এর আগে জেলাভিত্তিক ১০ দিন লকডাউন পালন করেছি ।মোট ২৪দিন লকডাউন পালন করে আশানুরূপ ফল পাইনি। লকডাউন শুরুর সময় প্রতিদিন মারা যেত ৫০/৬০ জন। একটানা ২৪ দিন লকডাউন পালন করার পর এখন মারা যাচ্ছে দু শয়ের উপরে। তাই লকডাউন এর বিকল্প ভাবতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি কঠোর করতে হবে ,সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যেন বাঘের কবল থেকে বাঁচার জন্য ঘরে বসে আগুনে পুড়ে না মরি। কিংবা একটি অধিকার পেতে গিয়ে অন্য পাঁচটি অধিকার থেকে বঞ্চিত না হই।
ব্রিটিশ ভিত্তিক আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম। অক্সফামের হিসেব মতে বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১১ জনের মৃত্যু হচ্ছে ক্ষুধায়। আর কোভিট ১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে ৭ জন।
শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার। প্রায় দুই বছর হতে চলল আমরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছি ।আমাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন গাইড লাইন নেই। শিক্ষার সাথে লাখ লাখ মানুষের জীবিকার সম্পর্ক আছে আমরা সে কথাটা ভুলেই গেছি।

বাংলাদেশ হাজার হাজার নন এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা আছে যেখানে লক্ষ লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারী কাজ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে এ সকল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমরা তা ভ্রুক্ষেপ করছি না। অনেক শিক্ষিত বেকার আছে যারা প্রাইভেট পড়িয়ে তাদের সংসার পরিচালনা করে। কলেজ ভার্সিটির অনেক ছাত্র প্রাইভেট পড়িয়ে তাদের লেখাপড়ার খরচ চালায়, পরিবারের ছোটখাটো চাহিদা মেটায়। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার নন এমপিও শিক্ষক আছেন। প্রতিষ্ঠান থেকে তাদেরকে সামান্য বেতন দেওয়া হয়। প্রাইভেট পড়িয়ে, খাতা দেখে ,ডিউটি করে তারা আর কিছু টাকা পেয়ে থাকেন । এভাবে তাদের সংসার চলে।বড় বড় শহরে অনেক ছাত্রাবাস আছে যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান করে । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে এসকল ছাত্রাবাস গুলো বন্ধ হয়ে আছে। অনেক পরিবার সন্তানের লেখাপড়ার জন্য শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে তারা গ্রামে ফিরে গেছে। ম্যাচ মালিক ,বাড়ি মালিক কিংবা ম্যাচ ব্যবসায়ীরা সবাই আর্থিক সংকটে ভুগছে। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা ম্যাচের নিয়মিত ভাড়া দিয়ে আসছে কিন্তু করোনার কারণে ম্যাচে না থেকে বাড়িতে অবস্থান করছে। অভিভাবকের ওপর আর্থিক চাপ পড়ছে। লেখক প্রকাশক ও বই বিক্রেতারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে কেউ নতুন করে বই কিনছ না।
একজন বই বিক্রেতা আমাকে বললেন ,”বিশ বছর ধরে আমি বইয়ের ব্যবসা করে আসছি। প্রতিমাসে ১২০০০ টাকা দোকান ভাড়া দিতে হয়। এখন যা বেচাকেনা হয় তাতে দোকান ভাড়ার টাকা উঠে না। ব্যবসা বন্ধ করার কথা ভাবছি।”
একটি প্রাইভেট স্কুলের অধ্যক্ষ আমাকে বললেন — “প্রতিমাসে দেড় লক্ষ টাকা বাড়িভাড়া দিয়ে আমি আমার প্রতিষ্ঠান চালিয়ে আসছি। আর বেশি দিন এভাবে ভাড়া দিয়ে চালিয়ে দিতে পারব না। ”
করোনার কারণে যে সকল দেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ করে দিয়েছে সে দেশগুলো হলো বাংলাদেশ ,মিয়ানমার ,উত্তর কোরিয়া, মেক্সিকো সৌদি আরব ,আজারবাইজান ,ভেনুজুয়েলা, তুরস্ক ,পেরু, উরুগুয়ে ,সুরিনাম, মাদাগাস্কার, ইরাক, লাউস, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইন। এগুলোর কোন দেশ ই করোনার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটানা বন্ধ রাখে নি। পরিস্থিতি খারাপ হলে লকডাউন দিয়েছে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে ।আবার পরিস্থিতি উন্নতি হলে লকডাউন শিথিল করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছে, ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, করোনার শ্বাসকষ্ট না — শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আর লকডাউনের শ্বাসকষ্ট। আমি জানিনা আমার এ লেখা ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টিতে আসবে কিনা। আমি সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার কাছে বিনীত অনুরোধ করতে চাই বাংলাদেশের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের যেন সুষম বাস্তবায়ন করা হয়।
লেখক
মোহাম্মদ আলী শেখ
সহকারি অধ্যাপক
কাদিরদী ডিগ্রী কলেজ
বোয়ালমারী ফরিদপুর।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.