লকডাউন এবং জীবনজীবিকা

প্রকাশিত: ১২:৩৯ অপরাহ্ণ, শনি, ৩১ জুলাই ২১

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম।।

দেশে করোনা সংক্রমন ও মৃত্যু লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আজ হয়তো কিছু কমে পরদিন আবার বেড়ে যায়। করোনার বিস্তার শুরু হওয়ার পর গেলো দিনগুলোতে প্রতিনিয়ত সংক্রমন ও মৃত্যুতে রেকর্ড হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং মানুষের শরীরে তা প্রয়োগ করেও থামানো যাচ্ছেনা করোনা সংক্রমন ও মৃত্যু। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যে কারণে সর্বাত্মক লকডাউন দিতে হয়েছে দেশজুড়ে। কিছুদিন আগে সংক্রমন এবং মৃত্যু একেবারে নিয়ন্ত্রনে এসে গেলেও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আবারো করোনা অাগের চেয়েও ব্যাপক আকার ধারণ করে।
করোনার বিস্তার ঠেকাতে দেশে সর্বাত্মক লকডাউন দেওয়া হলেও পবিত্র ঈদুল আযহার জন্য তা শিথিল করা হয়। ঈদের পর আবারো শুরু হয়েছে ১৪ দিনের কঠোর লকডাউন। এর আগের লকডাউনে শিল্পকারখানা চালু থাকলেও এবার সেগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে। যদিও মালিক পক্ষ চাচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলা রাখতে। সরকারের পক্ষ থেকে এ দাবি নাকচ করা হয়েছে।
জীবন বাঁচাতে যেমন লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তেমনিভাবে জীবিকার তাগিদে মানুষকে বাড়ির বাইরে বেরোতে হয়। বিশেষ করে যারা দিনে আনে দিনে খায় তাদের অবস্থা চরমে পৌঁছে। কাজ হারিয়ে পথে বসতে হয়। পরিবারের সদস্যদের দুবেলা দুমুঠো অাহার জোগাতে যেখানে হিমশিম খেতে হয় সেখানে লকডাউন যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দেয়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য করোনা ভয়াবহ পরিণতি বয়ে এনেছে। যতটুকু অগ্রসর হওয়া গেছে বিভিন্ন সেক্টর তার চেয়ে কয়েকগুণ পিছিয়ে গেছে এই করোনা অতিমারির কারণে। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থা তো একেবারে নাজুক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। ক্লাশ বন্ধের পাশাপাশি সব ধরণের পরীক্ষাও অনিশ্চিত গন্তব্যে ধাবিত হচ্ছে। গতবছর সব ধরণের ক্লাশে দিতে হয়েছে অটোপাশ। এবারও সে পথেই হাঁটতে হবে কিনা করোনা পরিস্থিতিই বলে দেবে।
যাক্ বলছিলাম লকডাউন পরিস্থিতি নিয়ে। আগামী লকডাউনের দিনগুলোতে অসহায় ও গরীব মানুষের জীবনজীবিকার কথা চিন্তা করতে হবে রাষ্ট্রকে। প্রয়োজনে পর্যাপ্ত সাহায্য প্রদান এবং তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এমনিতে কত অর্থ কতভাবে ব্যয় হয়, অপচয় হয়। এই অর্থ দিয়ে সমাজের দরিদ্র মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা যায় সহজেই। তাছাড়া, বিত্তবান মানুষও দিনমজুর, শ্রমিকসহ অসহায় সব মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। দাঁড়াতে পারেন কী, দাঁড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি।
লকডাউনের পাশাপাশি মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে সচেতন করতে হবে। সারাবছর তো আর লকডাউন দেওয়া সম্ভব নয়। জনসমাগম হয় এ ধরণের সব অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে কঠোরভাবে। স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করা, বাড়িঘর, দোকানপাট, শপিংমলসহ সব স্থানে হ্যান্ডস্যানিটাইজারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে। জনসাধারণকে নিজেদের সচেতনতার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
আপাতদৃষ্টিতে লকডাউনকে কঠিন মনে হলেও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বর্তমান পরিস্থিতিতে এর কোন বিকল্প নেই। তবে উল্লেখিত কৌশল অবলম্বন এবং গণহারে টিকা প্রদান কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে লকডাউনের কর্মসূচি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে সচেষ্ট হতে হবে। বিশ্ব যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাতে এটা নিশ্চিত যে, এক প্রকার করোনাকে মোকাবেলা করেই মানুষকে বাঁচতে হবে। চলতে হবে পাশাপাশি! কারণ, ভ্যাকসিন মানুষকে আতংক থেকে কিছুটা আশার দিকে নিয়েে গেলেও শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারছেনা। যে কারণে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি মানতে বলছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশেষজ্ঞগণ।
তাই করোনা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে লকডাউন দিতে হলেও এসময় অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে হবে সব শ্রেণি, পেশার মানুষকে। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই কর্তব্যটুকু পালন করতে সচেষ্ট হবো- এমন প্রত্যাশা থাকলো।

★ লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.