লকডাউনে সন্তানকে গৃহবন্দি করবেন না; একে সুযোগ হিসেবে নিন!

প্রকাশিত: ৪:১৩ অপরাহ্ণ, সোম, ১২ এপ্রিল ২১

দীর্ঘ এক বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সরকার খোলার জন্য প্রস্তুতি নিলেও করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ তা আবার অনিশ্চিত করে দিয়েছে। এ নিয়ে অনেক অভিভাবক হতাশ হয়ে বাড়তি চাপ নিচ্ছেন হয়তো। তবে আপনারা কখনোই ভাববেন না যে, কোভিড-১৯ এর জন্য আপনার সন্তানেরা লেখাপড়ায় সারা জিবনের জন্য পিছিয়ে পরেছে। স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় হয়তো পড়াশোনা আপাতত বন্ধ আছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে সন্তানের উপরে পড়াশোনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবেন না। এতে মানসিক চাপে ওদের মন হয়তে ঘরে নাও টিকতে পারে। ফলে বাইরে যাওয়ার প্রবনতা বেড়ে যাবে। এ উচ্চ সংক্রমণের সময়ে তাদের ভাইরাস আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়বে। ভাবুন একবার, জীবনের তুলনায় এ লকডাউন সময়টি খুবই অল্প।

আমরা করোনা পরিস্থিতির সাথে আগে কখনও পরিচিত ছিলাম না। ফলে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে লকডাউন, কোয়ারান্টাইন ইত্যাদি শব্দের আমদানি করেছি আক্ষরিক অনুবাদের মাধ্যমে। আমার মতে, হোম লকডাউন মানে আপনি “গৃহবন্দী” নন। বরং আপনি করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ ; গৃহে আপনি মুক্ত, স্বাধীন। নেতিবাচক শব্দগুলো আমাদের পরিহার করা উচিৎ। এতে মানসিক চাপ কমবে।

জীবনের অনেকটা সময় আপনার সন্তানেরা লেখা পড়ার সময় পাবে। তাই এই সময় ঘরে বসে ওদের বইপত্রের চেয়ে বরং নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার পাঠগুলো শিক্ষা দিন। জীবন চলার পথে এগুলো খুবই জরুরী। ঘরে রাখতে ওদের সাথে ইনডোর গেইমের আয়োজন করুন। দাবা, লুডু, কেরামের মত আরও অনেক মজার খেলায় মেতে উঠুন আপনার প্রিয় সন্তানের সাথে। দেখবেন, অনেক দামী উপহারের চেয়ে এতে ওরা বেশি খুশি হবে।

কোভিড-১৯ নিয়ে আমরা যতটা সচেতন, তার চেয়ে বেশি ভয়ের প্রচারণা দেখি টিভি, পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কোন রোগী মারা গেলে বলে দেই সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলো, হাই প্রেসার ছিল! ৫ জনের এমন মৃত্যুর বার্তা দিয়ে ৫ লক্ষ ডায়বেটিস আক্রান্ত রোগিকে মৃত্যু ভয়ে অস্থির করে তুলি! ষাটোর্ধ সিনিয়র সিটিজেনদের সামনে আজরাইলের ছায়া দাড় করিয়ে রাখি! অথচ আমরা মৃত্যু মানুষের চেয়ে বহুগুন বেশি সুস্থ্য হওয়া মানুষের গল্প শুনাতে পারি।

মাইক্রোস্কোপে শুধু করোনা ভাইরাসের সাদা-কালো ইমেজ দেখা যায়। অথচ আমাদের সোস্যাল সাইটে কটকটে লাল রঙের রক্ষাচোষা করোনা ভাইরাসের গ্রাফিক্স ডিজাইন করে ছয়লাপ করে দিয়েছি! কোভিড-১৯ বিষয়ক পরামর্শ বা টক শোতে আমরা করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা শুনি, অথচ তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড স্ক্রিনে দেখি বিপক্ষ দলের সেনাপতিকে বিভিন্ন রঙে সাজিয়ে এনিমেশন শো! এ নেতিবাচক প্রচারণা আমাদের মনকে অস্থির করে তোলে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়।

একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, এক দেড় বছর স্কুল যেতে না পারা মনে আপনার সন্তানের ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে গিয়েছে এমন ভাবনা একেবারে অনর্থক। কারণ, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন শেষ করতে গড়ে ২৩/২৪ বছর সময় লাগে। তাই অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হবেন না।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও জীবনের অতিগুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে যা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি আমরা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের মধ্যে। তার সদ্য ব্যবহারে আমাদের যত্নশীল হওয়া উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বৃহত্তর জিবনের একটি অংশ মাত্র। তার জন্য অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওদের সারা জীবনের ঝুঁকি নিবেন না। করোনা মহামারির এ সঙ্কট নিশ্চয়ই কেটে যাবে। সন্তান যেমন আপনার, তার মঙ্গলে সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্বও আপনার।

সুস্থ থাকুন, সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ থাকুন আপনার সুখ নিবাসে।

আহসান টিটু
শিক্ষক ও সাংবাদিক
ফকিরহাট, বাগেরহাট

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.