রোদ পোহাবেন কেন?

প্রকাশিত: ৯:৩২ অপরাহ্ণ, বুধ, ২৪ মার্চ ২১

দেহঘড়ি ডেস্ক :

ভিটামিন ‘ডি’ শরীরের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় একটি উপাদান। কিন্তু অনেকেরই শরীরে এর পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকে না। ভিটামিন ডি’র বড় উৎস সূর্যের আলো। মাছ, ডিমের কুসুম ও অন্যান্য কিছু খাবারে ভিটামিন ডি থাকলেও কেবলমাত্র খাবার থেকেই এই পুষ্টির দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করা বেশ কঠিন।

ভিটামিন ডি’র ঘাটতি বর্তমানে সারা বিশ্বের একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যা। বেশ কিছু সমস্যার সঙ্গে ভিটামিন ডি ঘাটতির যোগসূত্র পাওয়া গেছে। ভিটামিনটির অভাবে বিষণ্নতা ভর করতে পারে, ঘুমের সমস্যা হতে পারে, হাড় দুর্বল হতে পারে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে ও আরো কতিপয় সমস্যা হতে পারে।

কিন্তু দুশ্চিন্তা করবেন না, নিয়মিত কিছুসময় রোদ পোহালে এসবের ঝুঁকি কমে যাবে। এখানে নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে রোদ পোহালে যেসব উপকার হয় তার একটি তালিকা দেয়া হলো।

* মেজাজ ভালো রাখে: আমরা এটা শুনতে অভ্যস্ত যে সূর্যের উষ্ণ রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে, তবে একথা রোদ পোহানোতে ভারসাম্য বজায় না রাখলে প্রযোজ্য। ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে ক্ষতি তো নেই, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যালোক মস্তিষ্কে কিছু হরমোন নিঃসরণে উদ্দীপনা যোগায়। গবেষকরা মনে করেন যে, সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসলে মস্তিষ্ক সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসরণ করে। হরমোনটি মেজাজ ভালো রাখে, মনে প্রশান্তি আনে এবং মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা বাড়ায়।

* হাড়কে মজবুত করে: সূর্যরশ্মির আল্ট্রাভায়োলেট-বি রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আমাদের ত্বক ভিটামিন ডি তৈরি করে নেয়। এই ভিটামিন হাড়ের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি এর ঘাটতিতে শিশুদের রিকেটস ও বয়স্কদের অস্টিওপোরোসিস হতে পারে। রিকেটস রোগে হাড়ের বিকৃতি ঘটে ও অস্টিওপোরোসিস রোগে হাড়ের ক্ষয় হতে থাকে। এছাড়া পুষ্টিটির অভাবে অস্টিওম্যালাসিয়া বা সহজেই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। দেহের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ ভিটামিন ডি আসে সূর্যালোক থেকে। ২০ শতাংশের কম আমরা পেতে পারি খাদ্য উপাদান থেকে। তাই বলা যায়, ভিটামিন ডি পেতে হলে সূর্যালোকের ওপরই নির্ভরশীল হতে হবে।

* ক্যানসারের ঝুঁকি কমে: স্বাস্থ্য সচেতন লোকমাত্রই জানেন যে, অত্যধিক সূর্যালোকের সংস্পর্শে ত্বকে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু পরিমিত রোদ পোহালে ভয়ের কিছু নেই, বরং অন্যান্য ক্যানসারের ঝুঁকি কমতে পারে। গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, যেসব মানুষেরা সূর্যালোকের সংস্পর্শে তেমন একটা ছিলেন না তাদের মধ্যে কিছু ক্যানসারের হার বেশি ছিল। এসব ক্যানসারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কোলন ক্যানসার, হজকিন’স লিম্ফোমা, ওভারিয়ান ক্যানসার, প্যানক্রিয়েটিক ক্যানসার ও প্রোস্টেট ক্যানসার। তাই এসব ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পরিমিত রোদ পোহানোর কথা ভাবতে পারেন।

* ঘুমের মান বাড়ে: যারা ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য সূর্য আশীর্বাদ হতে পারে। শরীরে পর্যাপ্ত রোদ লাগলে সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি নিয়ন্ত্রণে থাকে। সার্কাডিয়ান রিদমের কার্যক্রম ঠিক থাকলে ঘুমের সমস্যা উপশম হয় অথবা ঘুমের মান বেড়ে যায়। তাই বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করলে রোদ পোহানোতে অভ্যস্ত হতে পারেন। যদি মনে করেন যে যথেষ্ট সূর্যস্নানের পরও ঘুমের সমস্যা হচ্ছে, তাহলে উপযুক্ত চিকিৎসা পেতে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন।

* ত্বক সেরে ওঠে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূর্যালোকের সংস্পর্শে কিছু চর্মরোগ প্রশমিত হতে পারে। গবেষণা বলছে যে সোরিয়াসিস, একজিমা, ব্রণ ও জন্ডিস জনিত ত্বকের দুরবস্থা কমাতে সূর্যালোক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যারা চর্মরোগের সমস্যায় লাইট থেরাপি নিতে পারেন না তাদের জন্য রোদ পোহানোই সেরা প্রাকৃতিক চিকিৎসা হতে পারে। আপনার শরীরে কোনো চর্মরোগ থাকলে তা সূর্যস্নানে উপশমিত হবে কিনা জানতে ডার্মাটোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

* রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে: কিছু গবেষণা বলছে, শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকলে ইমিউন সিস্টেম সুস্থ থাকে। শরীরে প্রাকৃতিকভাবে রোগ দমনের যে ব্যবস্থা রয়েছে তাকে ইমিউন সিস্টেম বলা হয়। ইমিউন সিস্টেম যত শক্তিশালী হবে জীবাণুর সংক্রমণ তত দুর্বল হবে। যেসব মানুষের ইমিউন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের মধ্যে কোভিড-১৯ জনিত মৃত্যুহার বেশি লক্ষ্য করা গেছে। গবেষণায় এটাও দেখা গেছে, কোভিড-১৯ এর জটিল পরিণতি নিয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের সিংহভাগ অংশের শরীরে যথেষ্ট ভিটামিন ডি ছিল না- এসব রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি ছিল। তাই চিকিৎসকেরা শ্বাসতন্ত্রীয় সংক্রমণের জটিলতা এড়াতে ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে জোর দিয়েছেন।

* অন্যান্য সমস্যায় সূর্যালোকের প্রভাব: বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা পাওয়া গেছে, শরীরকে সূর্যালোকের সংস্পর্শে এনে আরো কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার মাত্রা কমানো যেতে পারে। এরকম কিছু রোগ হলো- রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা বাতরোগ, সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথিম্যাটোসাস বা ভুলবশত ইমিউন সিস্টেম কর্তৃক শরীরকে আক্রমণ, অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ ও থাইরয়েডের প্রদাহ। তবে এসব সমস্যার ওপর সূর্যালোকের প্রভাব কতটুকু তা নিশ্চিত হতে আরো গবেষণার অপেক্ষা করতে হবে।

রোদ পোহানোতে সতর্কতা
একটা কথা সবসময় মনে রাখতে হবে- শরীরে সূর্যালোকের সংস্পর্শ জনিত উপকার পেতে পরিমিত রোদ পোহাতে হবে, অন্যথায় ত্বকের সৌন্দর্যহানি ও স্কিন ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে। কতক্ষণ রোদ পোহানো উচিত তা নিয়ে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে, কতক্ষণ রোদ পোহাবেন তা নির্ধারণ করতে ত্বকের রঙ কেমন তা বিবেচনায় রাখতে হবে। আপনার ত্বক খুব ফর্সা হলে ১০-১৫ মিনিট সূর্যালোকে সময় কাটানোই যথেষ্ট হতে পারে। এভাবে ত্বকের রঙ যত গাঢ় হবে সময় তত বাড়বে। শেষপর্যন্ত খুব কালো ত্বকের মানুষদের প্রায় একঘণ্টা রোদ পোহানোর প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরের কাছাকাছি সময়, মানে সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত রোদে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত হতে পারে। ত্বক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, ১৫ মিনিটের বেশি রোদ পোহাতে চাইলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করাই ভালো। রোদ পোহানোর ফলে পানিশূন্যতা এড়াতে প্রচুর পানি পান করুন। এছাড়া টমেটো খেতে পারেন। গবেষণা ধারণা দিয়েছে, টমেটোর লাইকোপিন সূর্যালোকের সংস্পর্শ জনিত ত্বকের দুরবস্থা প্রতিরোধ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে- প্রতিদিন রোদে সময় যাপন করতে হবে এমনকোনো কথা নেই, সপ্তাহে ২/৩ বার রোদ পোহানোই যথেষ্ট হতে পারে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.