রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা

ঢাকাঃ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক জোটের টানা কর্মসূচিতে শিক্ষাঙ্গনে বাড়ছে অস্থিরতা। ইতোমধ্যে বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। লাগাতার হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচিতে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শেষ প্রান্তিকের মূল্যায়নও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৫ নভেম্বরের পরিবর্তে এ দুটি শ্রেণির নতুন শিক্ষাক্রমের বার্ষিক মূল্যায়ন আগামী ৯ নভেম্বর ধার্য করা হয়। কিন্তু গ্রামের তুলনায় শহরের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন স্কুলপ্রধানরাও। অবশ্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে জানানো হয়েছে যেসব শিক্ষার্থী হরতাল কিংবা অবরোধে স্কুলে আসতে পারছে না তাদেরকে স্কুলে অনুপস্থিত দেখানো যাবে না। বরং ক্লাসে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস করাতে হবে।

শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, আগামী ১৫ নভেম্বর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু কর্মদিবসগুলোয় টানা রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকায় ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পরীক্ষা আয়োজন নিয়েও। একই অবস্থা উচ্চশিক্ষায়ও। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হরতাল-অবরোধের মধ্যে করোনাকালের মতো অনলাইনে ক্লাস শুরু করেছে। তবে পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাদেরও। এরই মধ্যে গত ৬ নভেম্বর আবারও সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা ৪৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক অবরোধ ঘোষণা করেছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। ৭ ও ৮ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সড়ক, রেল ও নৌপথে এ কর্মসূচি পালন করেছে দলগুলোর নেতাকর্মীরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক মতবিরোধ, সমাবেশের অধিকার, এজেন্ডা বাস্তবায়নের কর্মসূচিতে শিক্ষার মতো বিষয়গুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়- তা দেখার দায়িত্বও রাজনৈতিক দলগুলোর। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন এক ধরনের গৃহযুদ্ধের মধ্যে ছিল, কিন্তু সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কখনো বন্ধ হয়নি। নেপালে যখন উগ্রবাদীদের তৎপরতা ছিল, তখন তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ‘সেইফ জোন’ ঘোষণা করেছিল। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা হতে পারে- এমন শঙ্কা তৈরি হলেই শিক্ষার্থী-অভিভাবক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কারণ যাতায়াত যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক সবাই চিন্তিত থাকবেন। এ বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের প্রয়োজন।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি দেবে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষতি করতে দেবে না- এই অঙ্গীকারটা আমরা দেখি না। পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতির মধ্যে পড়ে যায় শিক্ষার্থীরা। করোনা ভাইরাসের কারণে শিক্ষার্থীরা যে হোঁচট খেয়েছে, সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর পর যখন ক্ষতি পোষানোর জন্য তাদের দৌড়ানো প্রয়োজন- তখন শিক্ষার্থীরা আবার হোঁচট খাচ্ছে। এটা কাম্য নয়।

অবরোধ চলাকালে রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখায় গিয়ে দেখা গেছে, হাতেগোনা কয়েক শিক্ষার্থী ক্লাস করছে। অবরোধে নিরাপত্তাহীনতায় বাকিরা বিদ্যালয়ে আসেনি। এ প্রতিষ্ঠানের মতিঝিল প্রধান ক্যাম্পাসে গিয়েও অনুরূপ চিত্র দেখা যায়। পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্র জানায়, তাদের ক্লাসে ৬০ জনের মতো শিক্ষার্থী। হরতাল-অবরোধে গড়ে উপস্থিত থাকছে ১৪ জনের মতো। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই, রাজনৈতিক অস্থিরতায় শিক্ষার্থীরা আরও বিপাকে পড়তে পারে-এমন শঙ্কায় শিক্ষকেরা। মন্ত্রণালয় বলছে, পরীক্ষার ক্ষতি করে রাজনৈতিক কর্মসূচি কাম্য নয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা এগিয়ে আনা হয় নভেম্বরে। ভর্তি কার্যক্রমও চলতি মাসেই হবে। কিন্তু এরই মধ্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। অবরোধে বিভিন্ন স্থানে চলছে আগুন-ভাঙচুর। এমন বাস্তবতায় বাবা-মায়েরা সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায়। সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে সবসময় ভয়ের মধ্যে আছেন তারা। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা জানান, অবরোধের কারণে তারা আতঙ্কিত থাকছে। এ জন্য অনেকেই স্কুলে আসতে পারছে না।

এ বিষয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী বলেন, ‘করোনার প্রভাব কাটিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক রুটিনে ফিরেছি। এর মধ্যে এই অস্থিরতায় আবার পিছিয়ে যাবে। রাজনৈতিক দলের প্রতি সহনশীল আচরণের আহ্বান রইল। এ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, পরীক্ষার সময় আমাদের শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া একেবারেই ঠিক নয়। আমরা তো জনগণের জন্য রাজনীতি করছি। এমন কোনো কর্মসূচি দেওয়া উচিত নয়, যাতে শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়ে।

এদিকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। সহিংসতার কারণে সে পরীক্ষা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছে শিক্ষার্থীরা। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে থাকা মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন জানায়, মঙ্গলবার মিরপুরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সংঘর্ষের কারণে পড়তে যেতে পারেনি। রাজনৈতিক কর্মীরা সংঘর্ষে জড়ালে আরও খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ার শঙ্কা জানিয়ে এই শিক্ষার্থী বলল, ‘কোচিংয়ে পড়তে যেতে হয়। এমন চললে তো আমাদেরও অনেক ক্ষতি হবে। শুনলাম আমাদের পাশের সিরামিকস রোডে বাসে আগুন দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিষয়েও নেতাদের ভাবা উচিত।’

কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক তারিকুল আজম খান জানান, তাদের শিক্ষার্থী প্রায় ১০ হাজার। এর মধ্যে প্রভাতি শাখায় সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার শিক্ষার্থী। বাকিরা দিবা শাখায়। হরতাল অবরোধে প্রভাতি শাখায় সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ শিক্ষার্থী আসছে। এমন ক্লাস গুরুত্বহীন। ছাত্রীদের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থী উপস্থিতি আরও কম। প্রতিষ্ঠানটির ধানমন্ডি, আজিমপুর ও বসুন্ধরা তিনটি শাখার মধ্যে বসুন্ধরায় উপস্থিতি মোটামুটি। সেগুনবাগিচা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে এম ওবাইদুল্লাহ বলেন, অবরোধে অর্ধেকের কম শিক্ষার্থী ক্লাসে আসছে, বাকিরা আসছে না। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক রোকনুজ্জামান শেখ বলেন, অবরোধের মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীরা এলেও অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না।

দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে রাজনৈতিক সহিংসতায় দীর্ঘ সময় দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম চালাতে পারেনি। কোভিড মহামারির কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এবার জানুয়ারির শুরুতে দেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। তাতে শিক্ষা কার্যক্রমে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য এ বছর গ্রীষ্মকালীন ছুটি বাতিল করে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষাবর্ষ শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু নির্বাচন কেন্দ্র করে নভেম্বরের আগেই রাস্তায় রাজনৈতিক বিরোধ ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন।

সূত্রাপুরের বাসিন্দা সোনিয়া বেগমের মেয়ে হামিদা আহাম্মেদ শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী এখন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন চলছে জানিয়ে এই অভিভাবক বলেন, ‘করোনায় এমনিতেই পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছে ওরা, এমন ঘন ঘন রাজনৈতিক পট পাল্টালে ছেলেমেয়েদের স্কুল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। এমন থমথমে পরিস্থিতিতে ওদের স্কুলে পাঠানো কঠিন।’

১১ থেকে ২৫ নভেম্বর বার্ষিক পরীক্ষা চলবে জানিয়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক রোকনুজ্জামান শেখও বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গেলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। হরতাল-অবরোধের মধ্যে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের সরাসরি ক্লাস বন্ধ রেখেছে। শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। গুলশানের মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অবরোধের মধ্যে অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জুমে ক্লাস চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১০/১১/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়