যুদ্ধদিনের প্রধানমন্ত্রীর ৯৭তম জন্মদিন

প্রকাশিত: ১০:০১ পূর্বাহ্ণ, শুক্র, ২৩ জুলাই ২১

টাইম ম্যাগাজিন তাকে লিখেছিলো The Premier of Battle day অর্থাৎ যুদ্ধদিনের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বরের টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ কাহিনী রচিত হয়েছিলো তাকে নিয়ে ।

তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। এই মহান নেতার ৯৭তম জন্মদিন আজ। তার জন্ম ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুরের কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে। বাবার নাম মৌলভি ইয়াসিন খান আর মায়ের নাম মেহেরুন্নেসা খানম। তাজউদ্দীন আহমদ চার ভাই, ছয় বোনের মাঝে চতুর্থ ছিলেন।

তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ১৯৪৪ সালে অবিভক্ত বাঙলায় দ্বাদশ স্থান লাভ করেন তিনি । এ সময়ই জড়িয়ে পড়েন মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে। নির্বাচনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। একই বছর কোলকাতায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ভালো পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো উচ্চ মাধ্যমিকেও, ঢাকা বোর্ডে অর্জন করেন চতুর্থ স্থান এবং ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময়েই জড়িয়ে যান সক্রিয় রাজনীতিতে। পূর্ব বাঙলা ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। অন্যদিকে তিনিই ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের উদ্যোক্তাদের একজন।

ভাষা আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সংগ্রামী সৈনিক। ১৯৪৮-এর ১১ এবং ১৩ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ধর্মঘট-কর্মসূচি ও বৈঠক করেন। ২৪ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারাসহ বৈঠকও করেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৩ সালে ‘আওয়ামী লীগ’ এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময়ই আওয়ামী লীগে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন তাজউদ্দীন আহমদ। ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। শেখ মুজিবুর রহমান ও তার মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ঢাকা উত্তর-পূর্ব আসনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হন তাজউদ্দীন। প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রবীণ নেতা ফকির আব্দুল মান্নানকে ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৯ বছর।

স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম প্রধান সারথি। ফলে ১৯৬২ সালে গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৪ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক হন আওয়ামী লীগের। ১৯৬৬ সালে হন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৬ সালের ৮ মে পুনরায় গ্রেপ্তার হন। মুক্ত হন ১৯৬৯-এর ১২ ফেব্রুয়ারি। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব গঠিত পাঁচ জনের হাই কমান্ডের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াল রাত। বাঙালি জাতির ওপর নেমে আসে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয়, বীভৎস তাণ্ডব। নিরীহ বাঙালিদের নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে ওরা। গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তাজউদ্দীন এসময় স্বাধীন দেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। ভারত সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। জরুরি হয়ে পড়ে একটি সরকার গঠন। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আর নিজে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করেন ও ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বদ্যিনাথ তলার আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করেন।

শত বাধা বিপত্তির মাঝে তিনি প্রবাসী সরকার চালিয়ে যেতে থাকেন। গঠন করেন প্রশাসনিক কাঠামো, এমনকি আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। তাই যুদ্ধের সাংগঠনিক পরিকল্পনাও করতে হচ্ছিল তাকে। এভাবে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সঠিকভাবেই এগিয়ে নেন সবকিছু। ভারত স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারতীয় মিত্র বাহিনী যৌথভাবে বাঙালি মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেয়। প্রচণ্ড আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আসে চূড়ান্ত বিজয়।

১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি তাজউদ্দীন টিভি ভাষণে বলেন-‘৩০ লক্ষাধিক মানুষের আত্মাহুতির মাঝ দিয়ে আমরা হানাদার পশুশক্তির হাত থেকে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত বাঙলাদেশকে স্বাধীন করে ঢাকার বুকে সোনালি রক্তিম বলয় খচিত পতাকা উত্তোলন করেছি’। এসময় মুক্তি দাবি করেন জাতির জনকের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এলে তাজউদ্দীন আহমদ হন নয়া সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী। ১৯৭৩-এ ঢাকা-২২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এতোদিন যিনি সংগ্রাম করেছেন দেশ স্বাধীনের জন্য এখন তিনি সংগ্রামে নামেন দেশ গঠনের।

১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলের সমাপনী অধিবেশনের বক্তৃতায় দল, সরকার এবং নেতা ও কর্মীদের মাঝে দূরত্ব দূর করে, সংগঠন এবং সরকারের মাঝে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান তাজউদ্দীন।

এ সময় কিছু সুবিধাভোগী, দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিকদের কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। তাদের সুন্দর সম্পর্কে ফাটল ধরে। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগও করেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়৷ এ ভয়াবহ রূঢ়, নৃশংস ঘটনায় সবাই স্তম্ভিত। ঘটনার বীভৎসতায় তাজউদ্দীন আক্ষেপ করে বলেন,‘বঙ্গবন্ধু জেনেও গেলেন না তার শত্রু কে আর বন্ধু কে? তিনি বন্ধুকে চিনতে পারলেন না’।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর তাজউদ্দীন আহমদকে ১৫ আগস্ট প্রথম গৃহবন্দী ও পরে ২২ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। ৩ কন্যা, ১ পুত্রসহ স্ত্রীকে ছেড়ে কারাগারে যেতে হয় তাকে। কারা অন্তরীণ হন তিনিসহ আরও তিন জাতীয় নেতা। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর আলী, এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অস্ত্রের দমকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয় ৪ নেতার জীবন ও শরীর। নিহত হন বাঙালি জাতির স্বাধীনতার কান্ডারীরা। নিহত হন তাজউদ্দীন আহমদ।

তাজউদ্দীন আহমদকে জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.