মুহূর্তেই স্কুল বিলীন পদ্মায়

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

সারা দেশের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। দেশের বিভিন্ন নদীর মতো পদ্মাতেও বাড়ছে পানি, বাড়ছে ভাঙন। এই ভাঙনের কবলে পড়ে গতকাল মঙ্গলবার মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের চরাঞ্চলের একমাত্র এমপিওভুক্ত আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের চারতলা ভবনটি মুহূর্তেই পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। পদ্মা ছাড়াও বিভিন্ন নদ-নদীর পানি এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে সর্বত্র ভাঙন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এসব এলাকায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফসলি ক্ষেত তলিয়ে গেছে পানিতে। সরকারি-বেসরকারি কিছু সাহায্য পৌঁছলেও সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই স্বল্প। অনেক এলাকাতেই খাবারের জন্য হাহাকার তৈরি হয়েছে।

সবমিলিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসি মানুষ। ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, করতোয়া, ধরলা, কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে থাকায়, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, নীলফামারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, মৌলভীবাজারসহ অনেক জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বেশির ভাগ স্থানেই পানি বাড়ছে। অনেক এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছে বসতবাড়ি ডুবে যাওয়া এসব মানুষ। কিন্তু সেখানেও খাবার অভাব, পয়োনিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকাসহ বৈরী পরিবেশের কারণে বিপাকে আছে আশ্রয় নেয়া লোকজন।

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, গতকাল মঙ্গলবার মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের চরাঞ্চলের একমাত্র এমপিওভুক্ত আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের চারতলা ভবনটি মুহূর্তেই পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। অপর দিকে শিবালয় উপজেলার চরাঞ্চলের আলোকদিয়া, চরশিবালয়, ত্রিশুন্ডি এলাকার ব্যাপক এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদী-তীরবর্তী দক্ষিণ শিবালয়সহ অন্যান্য এলাকায়ও ভাঙন শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনে পুরো জেলা কয়েক শ’ পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীলিপ জানান, হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়নের একমাত্র এমপিওভুক্ত বিদ্যালয় আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়। চার শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে বিদ্যালয়টিতে। স্কুলের কাছাকাছি হাতিঘাটা এলাকায় পদ্মার ভাঙনে গত এক সপ্তাহে পূর্ব পাড়ার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১০টি ঘরসহ অন্য পাঁচটি বাড়িও পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে।

একদিকে ব্যাপক নদীভাঙন অপর দিকে বন্যার আশঙ্কায় জেলাবাসী চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সিলেটে প্লাবিত নতুন নতুন এলাকা সিলেট ব্যুরো জানায়, দুই দিন ধরে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত রয়েছে। ফলে কমছে না কুশিয়া নদীর পানি। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি ভাঙন দেখা দিচ্ছে। লোকালয়ের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে সিলেট জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি ঘটছে।

গ্রামীণ সড়কের পাশাপাশি তলিয়ে গেছে সব ক’টি প্রধান সড়ক। এদিকে ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত সিলেট। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে সিলেট জেলা ও নগরের ৮০ ভাগ এলাকা। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের ৯০ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ডুবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটে জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। গত ১৫ জুন থেকে সিলেট বিভাগে ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে বন্যার সৃষ্টি হয়। তাতে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ঘটেছে ২৩ জনের।

এর মধ্যে সিলেটে ১৪ জন, সুনামগঞ্জে ৬ জন, মৌলভীবাজারে ৩ জন মারা গেছেন। সিলেটের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা: জন্মেময় দত্ত বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মা-ছেলেসহ সিলেটে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সুনামগঞ্জে লাখো মানুষ ঘর ছেড়ে বন্যা শিবিরে সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জে বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও, বাড়ছে বানভাসিদের দুর্ভোগ। এই ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে জেলার সব ক’টি উপজেলার নিভৃত বিচ্ছিন্ন পল্লী গ্রাম। জেলার জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, মধ্যনগর, বিশ্বম্ভরপুর, দিরাই, শাল্লাসহ সব ক’টি উপজেলার হাওর এলাকার বন্যাকবলিত লোকজন এখন ত্রাণের জন্য হাহাকার করছেন।

শহর ও শহরতলির আশপাশে সরকারি-বেসরকারি কিছু ত্রাণ বিতরণ করলেও হাওর এলাকার বিচ্ছিন্ন পল্লীর বানভাসিদের এখনো খোঁজ নেয়নি কেউ। এসব বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। পানিবন্দী জেলার লাখো মানুষের কয়েক দিন যাবৎ রান্না বন্ধ, পয়ঃনিষ্কাশন কঠিন অবস্থায়। সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ জেলায় চলছে মানবিক বিপর্যয়। জেলার সব উপজেলা মিলে প্রায় ৫০০ আশ্রয় কেন্দ্রে লাখের উপরে বানভাসি মানুষ অবস্থান করছে।

এ দিকে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুই দিন যাবত বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের হেলিকপ্টারে বন্যাকবলিত মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছে। হেলিকপ্টার থেকেই বিভিন্ন ত্রাণ ফেলা হচ্ছে। এসব প্যাকেট ধরতে শত শত ক্ষুধার্ত মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, আরো ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় বন্যার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। নেই বিদ্যুৎ। অনেক এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত।

গত ৪-৫ দিন ধরে নেই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম মোবাইল নেটওয়ার্ক। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ। গাইবান্ধায় ১২৬টি স্কুলে পাঠদান বন্ধ গাইবান্ধা সংবাদদাতা জানান, গাইবান্ধার সব ক’টি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে ১২ সেমি এবং ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর পয়েন্টে বিপদসীমার ৪০ সেমি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এ ছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানিও বেড়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ২৩টি ইউনিয়নে ৯৬টি গ্রাম বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে ৪৭ হাজার ৫৬৩ জন মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৫ হাজার ৫৮৪ জন। এ পর্যন্ত বন্যাকবলিত ৪ উপজেলার ১ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

এছাড়া বন্যাকবলিত ৪ উপজেলার ১১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নীলফামারীতে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত নীলফামারী সংবাদদাতা জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি মঙ্গলবারও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ দিকে নীলফামারী জেলার ২টি উপজেলার প্রায় ৪ হাজার পরিবার এখনও পানিবন্দী রয়েছে। নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ও বিকেল ৩টায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে ২৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তিস্তার পানি।

এ দিকে পানির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। যমুনায় ভাঙন, অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দী ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে যমুনা নদীতে পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উপজেলার গোবিন্দাসী, গাবসারা, নিকরাইল ও অর্জুনা ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভাঙনকবলিত মানুষ।

উপজেলার গাবসারাসহ নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সেই সাথে চরাঞ্চলের অসংখ্য পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে গোবিন্দাসীর যমুনা বেড়িবাঁধ (কালা সড়কে) পলি কাগজের ছাউনি তৈরি করে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার রাস্তাগুলো ভেঙে পানির তীব্র স্রোতে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান। ভেসে যাচ্ছে পুুকুরের মাছ।

তলিয়ে যাচ্ছে পাট, আউশ ধানসহ বিভিন্ন ফসল। নাসিরনগরে পানিবন্দী ৫০ হাজার মানুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নাসিরনগর সংবাদদাতা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বন্যাদুর্র্গত এলাকাগুলোতে গোখাদ্য, বিশুদ্ধ পানি আর শুকনো খাবারের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন বন্যার্তরা। উপজেলার ফান্দাউক, ভলাকুট ও সদর ইউনিয়নের তিনটি কমিনিউটি ক্লিনিক তলিয়ে গেছে।

১২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭০টির চার পাশে ও ভেতরে পানি ঢুুকে পড়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। উপজেলায় ১০ হাজার ৭৫ হেক্টর জমিতে বোনা আমন ২৯০৫ হেক্টর আউশ চাষ করা হয়েছিল। সব জমিই বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কুড়িগ্রামে দুর্ভোগ বেড়েছে বানভাসি মানুষের কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপদসীমার উপর কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যার পানি স্থায়ী হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে বানভাসিদের। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের প্লাবিত হয়ে পড়া ঘরবাড়ি ও নৌকায় অবস্থান করা মানুষজন। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনো খাবারের সঙ্কটে পড়েছেন তারা। বন্যাকবলিত এলাকায় তীব্র হয়ে উঠছে গবাদিপশুর খাদ্যসঙ্কটও।

এ দিকে সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন অনেকই। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপদসীমার উপর কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বন্যার পানি ধীর গতিতে কমতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি। চরভদ্রাসনে পদ্মাতীর রক্ষাবাঁধে ধস ফরিদপুর সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে তীব্র স্রোতের কারণে চর হরিরামপুর ইউনিয়নের সবুল্লা শিকদারের ডাঙ্গীর লোহারটেক কোলের সংযোগ বাঁধের প্রায় ১০ মিটার অংশ ধসে গেছে।

এতে সবুল্লা শিকদারের ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সেখানকার প্রায় সাড়ে ৩০০ পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, ভাঙনরোধে কাজ চলছে। সবুল্লা শিকদারের ডাঙ্গী গ্রামে ৩০০ মিটার স্থায়ী বাঁধের কাজটি পুরোপুরি সম্পন্ন করা যায়নি। এ বছর পূর্ব-সতর্কতামূলক প্রকল্প এলাকা ঢালু করে তার উপর জিও ব্যাগের ডাম্পিং করা হয়েছে।

ওই স্থানে ভাঙনের খবর তিনি পেয়েছেন। ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন গ্রাম ইসলামপুর (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হচ্ছে উপজেলার গোয়ালের চর ইউনিয়নের মুহাম্মদপুর গ্রাম। হুমকির মুখে পড়েছে স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ, ঘরবাড়ি, ফসলি জমিসহ ইসলামপুর-বকশিগঞ্জ আন্তঃউপজেলা সংযোগ সড়ক। গত তিন দিনে উপজেলার গোয়ালের চর ইউনিয়নের মুহাম্মদপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি নদে বিলীন হয়েছে।

হুমকির মুখে পড়েছে মুহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন, দ্বিতল মসজিদ, অসংখ্য ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামপুর-বকশিগঞ্জ উপজেলার আন্তঃউপজেলা সংযোগ সড়ক। বিয়ানীবাজারে বন্ধের মুখে সড়ক যোগাযোগ বিয়ানীবাজার (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ১০ ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বানের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়েছে পড়েছেন উপজেলার ১৪২টি গ্রামের লাখো মানুষ।

কুশিয়ারা নদীর পানি ডাইক ভেঙে ও উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে উপজেলার বেশির ভাগ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের বৈরাগীর আব্দুল্লাহপুর, কাকরদিয়া, সওদাখাল ও গাছতলাসহ আটটি অংশ বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বিপদসীমার উপরে টাঙ্গাইলের সব নদীর পানি টাঙ্গাইলের সব নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা, ঝিনাই ও ধলেশ্বরীর পানি বেড়েছে ১৫-১৬ সেন্টিমিটার। এর ফলে বেড়েছে নদীভাঙনও। প্রতিদিনই নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে খাবারসহ বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট। জানা যায়, পানি বৃদ্ধির ফলে টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী ও ভূঞাপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। যমুনা নদীর পানি পাড় উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে।

ঘরবাড়ি ও আশপাশে পানি প্রবেশ করায় গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার ১৮টি ইউনিয়নের ১১৫টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। এসব গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। জুড়ীতে পানিবন্দী লক্ষাধিক মানুষ জুড়ী (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, টানা কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বন্যার ফলে উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী। বর্তমানে উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থান তলিয়ে গেছে। বন্যায় শত শত খামারের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। গরুর খামারিরা গরু-বাছুর নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন।

বন্যায় উপজেলার প্রায় সব সড়কে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চারজনের মৃত্যু ইউএনবি জানিয়েছে, গতকাল বন্যাকবলিত অঞ্চলে চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় বন্যা দুর্গতদের জন্য হেলিকপ্টারে করে বিমানবাহিনীর দেয়া ত্রাণসামগ্রী নিতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে আহত ছয়জনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সিলেটের রাগীব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে গুরুতর আহত বিপ্লব মিয়ার (৪৫) মৃত্যু হয়।

তিনি তাহিরপুর উপজেলা সদরের উজান তাহিরপুর গ্রামের শহীদ আলীর ছেলে। এ দিকে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিলেটের জৈন্তাপুরে স্রোতে ভেসে যাওয়ার চার দিন পর মা-ছেলের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারা হলেঅÑ উপজেলার ছাতারখাই হাওরের পাশের আমিরাবাদ গ্রামের মা নাজমুন নেছা (৫০) ও তার ছেলে আব্দুর রহমান (১৪)। চার দিন আগে শুক্রবার নাজমুন নেছা তার ছেলে আব্দুর রহমানকে নিয়ে নিজ বাড়ি মহাখলায় ফিরছিলেন। সড়কের উপর দিয়ে যাওয়া প্রবল স্রোতে তারা দু’জনই ভেসে যায়। মঙ্গলবার সকালে লাশ পানিতে ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন।

নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বন্যার পানিতে ডিঙ্গি নৌকাডুবির ঘটনায় সাত বছরের মেয়ে তানজিনাকে বাঁচাতে গিয়ে জুলেখা নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার জুড়াইল হাওরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জুলেখা বেগম (৩২) একই এলাকার হারেছ মিয়ার স্ত্রী। পদ্মায় ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা জানিয়েছেন, পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণিপাকের কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি নৌরুটের জন্য ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আজ বুধবার ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল বন্ধ থাকবে বলে বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানিয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়াঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) ফয়সাল হোসেন জানান, দিনভর নৌরুটে মোট পাঁচটি ফেরি চলছিল। তবে নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় তীব্র স্রোত ও পানির ঘূর্ণি দেখা দেয়। এ জন্য নৌযান ও যাত্রী নিরাপত্তায় দুর্ঘটনা এড়াতে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। বুধবার ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ফেরি বন্ধ থাকবে। এ বিষয়ে মাইকিং করে ঘাটে উপস্থিত সবাইকে জানানো হয়েছে।

তিনি আরো জানান, যানবাহন পারাপারে বিকল্প নৌরুট ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মাইকিংয়ের পর ব্যক্তিগত যানবাহন, জরুরি ও অ্যাম্বুলেন্স ঘাট ত্যাগ করেছে। তবে কিছু সংখ্যক পণ্যবাহী গাড়ি সকালে পাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এ নিয়ে তৃতীয় দিনের মতো নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করা হলো।