মাধ্যমিকে সিনিয়র শিক্ষক পদ

প্রকাশিত: ৩:৪৬ পূর্বাহ্ণ, বৃহঃ, ২৯ এপ্রিল ২১

।। মাছুম বিল্লাহ।।

ষোলো কোটি মানুষের দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বহু বছর যাবৎ ছিল ৩১৭টি। এ নিয়ে কারুর যেন কোনো চিন্তা ছিল না অর্থাৎ মাধ্যমিক শিক্ষা বেসরকারি খাতেই চলতে থাকবে। তবে বেসরকারি শিক্ষক সংগঠনগুলো পুরো মাধ্যমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে বহুদিন।

বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছে, যার জন্য দেশে ৬৫ হাজার ৬৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুরোপুরি সরকারি। তবে, মাধ্যমিকে উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ করে যেসব উপজেলায় কোনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না, সেসব উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারি করায় এখন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৮৩টি অর্থাৎ এখনো পুরো মাধ্যমিক শিক্ষার ৩ শতাংশের কাছাকাছি সরকারি বিদ্যালয় বাকি ৯৭ শতাংশ বেসরকারিভাবেই চলছে।

তবে, মাধ্যমিকের একটি বিরাট অংশ এমপিও নামক রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। তার পরও, শিক্ষকতা চাকরিতে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে পদসোপান একেবারেই আকর্ষণীয় নয়, যার ফলে অনেক মেধাবী এই পেশায় আসতে চান না, এলেও থাকতে চান না এবং থাকেন না।

শিক্ষার এ দুটো স্তরেই বিশেষ দৃষ্টি প্রয়োজন, তা না হলে শিক্ষকতাকে একটি আকর্ষণীয় পেশায় পরিণত করা যাবে না। এ অবস্থার মধ্যে সরকারি মাধ্যমিকে একটি আনন্দের সংবাদ গত বছরের (২০২০) শেষের দিকে বইতে শুরু করেছে, শিগগিরই এর বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।

খুশির সংবাদটি হচ্ছে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় ‘জ্যেষ্ঠ শিক্ষক’ বা সিনিয়র টিচার পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে মোট পদের অর্ধেক শিক্ষক এ পদে পদোন্নতি পাবেন। এটি প্রথম শ্রেণির পদ। এই পদে কর্মরত শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের নবম গ্রেডে (২২ হাজার টাক মূল বেতন) পাবেন।

প্রথমবারের মতো এই পদ সৃষ্টি করে তাতে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। এই পদে সারা দেশের ৫ হাজার ৪০৬ জন শিক্ষক এবার পদোন্নতি পেতে যাচ্ছেন। বর্তমানে যে বিষয়টি প্রচলিত আছে তা হচ্ছে জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এন্ট্রি পদে চাকরিতে ঢুকে শিক্ষকরা ক্রমান্বয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পান। এর মাঝখানে কোনো পদ ছিল না, পদোন্নতির সুযোগ খুবই সীমিত। মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ শিক্ষক পদোন্নতির সুযোগ পান।

বাকি ৯৫-৯৬ শতাংশ শিক্ষক যে পদে (সহকারী শিক্ষক) চাকরি শুরু করেন, সেই পদেই ৩০-৩৫ বছর চাকরি করে অবসরে যান। এটি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তাই সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের বহুদিনের দাবি, এন্ট্রি পদ নবম গ্রেড ধরে যৌক্তিক পদসোপান তৈরির মাধ্যমে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি কারা। এটি করা হলে ৩০-৩৫ বছরে একই পদে থাকার বঞ্চনার অবসান হবে।

৬৮৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ১০ হাজার ৮১২টি। এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের কোনো পদ নেই। এর বাইরে ৬৮৩টি প্রধান শিক্ষক ও ৬৮৩টি সহকারী প্রদান শিক্ষকের পদ রয়েছে। যদিও এসব পদের বিপুলসংখ্যক বর্তমানে শূন্য রয়েছে।

২০১২ সাল থেকে টানা সাত বছর শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ ছিল। এতে শূন্যতা তৈরি হয়। ২০১২ সাল থেকে কারিকুলাম ও সিলেবাস পরিবর্তনের কারণে গত আট বছরে চারটি নতুন বিষয় বিদ্যালয়গুলোয় চালু রয়েছে। এগুলো হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি), শারীরিক শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা, চারু ও কারুকলা। এসব বিষয়েরও কোনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় নেই। এক বিষয়ের শিক্ষক পড়াচ্ছেন অন্য বিষয়।

তথ্যপ্রযুক্তির মতো মৌলিক বিষয়ও পড়ানো হচ্ছে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে। সহকারী শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের মধ্যে নতুন করে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা হলো, এটিকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তবে এ পদে পদোন্নতি পেতে শিক্ষকদের তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, সহকারী শিক্ষক পদে আট বছরের সন্তোষজনক চাকরিকাল হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যোগদান থেকে প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জন করতে হবে এবং তৃতীয়ত, শিক্ষাজীবনে একাধিক তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না। ২০১২ সালের ১৫ মে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদা ঘোষণা করা হয়। আর এবার প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদায় ‘জ্যেষ্ঠ শিক্ষক’ পদও চালু হলো। এটি মূলত ক্যাডার সার্ভিস করা প্রয়োজন যদি শিক্ষাকে প্রকৃত অর্থেই আমরা গুরুত্ব দিতে চাই।

২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা ও নির্দেশনা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকের পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদায় কার্যকর হয়। তবে, শিক্ষকরা এখনো দশম গ্রেডেই আছেন। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে এত বিলম্বে কেন হলো? যেকোনো স্তরের শিক্ষকই হোক না কেন, তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন তো করতে হবে, তা না হলে আমরা কীভাবে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ব?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পার হয়েই তো ভবিষ্যৎ নাগরিকদের সামনে আগাতে হবে। ইতিমধ্যে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী ইনস্ট্রাক্টর, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন বিভাগের দশম গ্রেডের পদকে নবম গ্রেড তথা প্রথম শ্রেণির পদে উন্নীতকরণের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন।

অন্যদিকে নার্স, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, খাদ্য পরিদর্শক, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ব্লক সুপারভাইজার (উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা) পদগুলো নিম্ন গ্রেড (১৩,১২,১১) থেকে দশম গ্রেডে তথা দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড পদে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক ও অডিটর পদ দশম গ্রেডে উন্নীতকরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন। সাংবিধানিক অধিকার প্রশ্নে সমগ্রেডের এবং পরস্পর বদলিযোগ্য পদের একটি আপডেট হলে বাকি পদগুলো আপডেট হওয়ার দাবিদার।

তিনটি বিসিএসের (৩৪,৩৫,৩৬) মাধ্যমে বহু মেধাবী তরুণ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পিএসসির মাধ্যমে আরও দুই হাজার শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। এই মেধাবী শিক্ষকদের মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নের পথ আরও ত্বরান্বিত হবে।

এই গ্রেড পরিবর্তনে সিনিয়র শিক্ষকরা বেতনের দিক দিয়ে লাভবান হবেন না কারণ তাদের মধ্যে অনেকেই টাইম স্কেল পেয়ে কেউ কেউ নবম গ্রেডের সমমানের আবার কেউ কেউ সপ্তম গ্রেডের সমমানের বেতন ইতিমধ্যে পাচ্ছেন। তার অর্থ হচ্ছে তাদের সম্মান বেড়ে যাচ্ছে কিন্তু সরকারের অতিরিক্ত কোনো অর্থ খরচ হচ্ছে না। এই সম্মানটুকু শিক্ষকদের প্রয়োজন।

নতুন এই পদ উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সমমানের বদলিযোগ্য পদ। এতে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় তারা যেতে পারবেন, যা শিক্ষকতায় প্রয়োজন একঘেয়েমি দূর করার জন্য। সরকারি মাধ্যমিকের প্রধান শিক্ষক পদটি ষষ্ঠ গ্রেডের কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ সিলেকশন গ্রেড পেয়ে চতুর্থ গ্রেডে চলে গেছেন। জানা মতে, সিলেটে একটি সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পাঁচটি জেলার শিক্ষা অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন।

তিনি যখন আবার প্রধান শিক্ষক পদে পদায়ন হয়েছেন, শিক্ষকদের মতামত হচ্ছে তাদের জীবনে যত প্রধান শিক্ষক তারা দেখেছেন তাদের মধ্যে তিনি সেরা। সেরা হতে বাধ্য কারণ তিনি সরাসরি শিক্ষক হিসেবে এবং শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তার পুরোটুকুই শিক্ষার উন্নয়নে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছেন। শিক্ষকতায় এ ধরনের মুভমেন্ট থাকা প্রয়োজন, শিক্ষকতা পেশায় তাতে নতুনত্ব আসবে।

শিক্ষকতা আমাদের দেশে একটি একক বৃহত্তম নিয়োগ বাজার। আর মাধ্যমিক শিক্ষার যেহেতু ৯৭ শতাংশই বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত হয়, তার মানে হচ্ছে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাধ্যমিক শিক্ষার দায়িত্ব বেসরকারি পর্যায়ে। এটিও খুব একটা সুখকর বিষয় নয়। তাই সিনিয়র শিক্ষক পদ সৃজন বেসরকারি শিক্ষকদের বেলায় করাটা বাঞ্ছনীয়। আট বছর চাকরি করার পর সরকারি শিক্ষকরা সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে সুবিধা পেতে যাচ্ছেন।

বেসরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি রাখা প্রয়োজন। তাদের হয়তো বাকি একটি পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে এবং বাকি তিনটি শর্ত ঠিক রেখে। এটি করা না হলে শিক্ষায় বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। যেটি আমাদের ঠাঁই দেওয়া উচিত নয়।

লেখক- শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক গবেষক

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.