মাঠপ্রশাসনে আরও ক্ষমতা চান ডিসিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

জেলা ও উপজেলায় সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। কমিটিতে পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) সহসভাপতি। তার পরও ডিসি-ইউএনওকে সভাপতি করে জেলা ও উপজেলায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন গোপালগঞ্জের ডিসি কাজী মাহবুবুল আলম। প্রস্তাবের পক্ষে তাঁর যুক্তি : বিদ্যমান কমিটির পাশাপাশি ডিসি এবং ইউএনওর নেতৃত্বে স্বাস্থ্য কমিটি গঠিত হলে সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিয়মিত সমন্বয় ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হবে।

গোপালগঞ্জের ডিসির মতো মাঠ প্রশাসনে নিজেদের ক্ষমতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে এ ধরনের অনেক প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ডিসিরা। যেমন সরকারি রাজস্ব প্রশাসনের উন্নয়ন বরাদ্দে ডিসিদের আয়ন-ব্যয়নের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন পটুয়াখালীর ডিসি মো. শরিফুল ইসলাম। প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিভিন্ন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ করছে গণপূর্ত ও এলজিইডি বিভাগ। এসব কাজের প্রকল্প গ্রহণ, প্রাক্কলন প্রস্তুত, অনুমোদন, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়ন কোনোটির সঙ্গেই ডিসি বা তার প্রতিনিধি রাখা হয় না। তাদের খেয়ালখুশিমতো প্রকল্প প্রস্তুত করে নিজেদের মতো করে বাস্তবায়ন করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে কাক্সিক্ষত মনিটরিংও নেই।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হন তারা। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কাজ শেষ না করলেও শতভাগ বিল পায়। আবারও প্রকল্প রিভাইজ করে সরকারের অর্থ অপচয় করা হয়। এ ছাড়া খাসজমি বন্দোবস্তের কবুলিয়ত দলিল বাতিলের ক্ষমতা চেয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন জয়পুরহাটের ডিসি সালেহীন তানভীর গাজী। ডিসির এল এ কন্টিনজেন্সি খাতের ব্যয়ের আর্থিক ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন ময়মনসিংহের ডিসি মোস্তাফিজুর রহমান। স্থানীয় সার্ভে অ্যান্ড সেটেলমেন্ট অফিসকে কাজের সুবিধার্থে ডিসি অফিসের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করার প্রস্তাব দিয়েছেন মাগুরার ডিসি মোহাম্মদ আবু নাছের বেগ।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে অধিগ্রহণ বা বরাদ্দ করা জমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে ডিসির অনুমতি নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন গাজীপুরের ডিসি আনিসুর রহমান। জেলায়-উপজেলায় এডিসি ও এসিল্যান্ডের সরকারি বাড়ি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন কিশোরগঞ্জের ডিসি আবুল কালাম আজাদ। অথচ বর্তমানে ডিসিদের সাধারণ কার্যাবলির মধ্যে ৬২টি বিষয় রয়েছে। প্রত্যেক বিষয়ে আবার রয়েছে একাধিক কমিটি-উপকমিটি। এসব কমিটির প্রধান ডিসি।

২৪ জানুয়ারি সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ের শাপলা হলে তিন দিনের এই সম্মেলন উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন। এ ছাড়া জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের বক্তব্যের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের উদ্ভাবন, সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের ভিডিও চিত্র প্রদর্শন, ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদেরও বক্তব্য থাকবে।

সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হলো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘মুক্ত আলোচনা’। এ পর্বে ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরে থাকেন সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপসহ বিভিন্ন বাধা-বিপত্তির কথা। এসব শুনে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেবেন ডিসিরা।

সন্ধ্যায় বিআইসিসিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হবে। উদ্বোধনের পর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কিত কার্য-অধিবেশনগুলো অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও কার্য-অধিবেশনে অংশ নেবেন ডিসিরা। কার্য-অধিবেশনগুলোয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী ও সচিবরা উপস্থিত থাকেন।

উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবসমূহ : এবারের সম্মেলনে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনেক প্রস্তাব রয়েছে ডিসিদের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে পোষ্য কোটা বাতিলের প্রস্তাব করেছেন কুড়িগ্রামের ডিসি মোহাম্মদ সাইদুল আরিফ। তিনি বলেছেন, এতে দুর্বল প্রার্থীর শিক্ষক হওয়া বন্ধ হবে। শিক্ষার মান বাড়বে এবং প্রতি পরিবারে চাকরির নীতি সফল হবে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় দ্রুত ল্যান্ডসার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন ময়মনসিংহের ডিসি মোস্তাফিজুর রহমান।

কারাবন্দিদের ভিডিওকলে আত্মীয়-স্বজনদের কথা বলার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন মৌলভীবাজারের ডিসি মীর নাহিদ আহসান। কিশোরগঞ্জের ডিসি আবুল কালাম আজাদ সারা দেশের সব খাস জমির তথ্য সংবলিত কেন্দ্রীয় একটি অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সারা দেশের ‘ক’ গেজেটভুক্ত অর্পিত সম্পত্তিরও কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার প্রস্তুত করতে সুপারিশ করেছেন।

সরকারি স্বার্থের মামলা পরিচালনার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নরসিংদীর ডিসি আবু নাঈম মোহাম্মদ মারুফ খান। পাশাপাশি খাস জমি সংরক্ষণের জন্য বাজেট বরাদ্দ চেয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন গোপালগঞ্জের ডিসি কাজী মাহবুবুল আলম। পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে বিভাগের পরিত্যক্ত বা অব্যবহৃত জমি খাসকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন মাগুরার ডিসি আবু নাছের বেগ।

পৌর ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিরাপত্তা প্রহরীর পদ সৃজনের প্রস্তাব করেছেন কুমিল্লার ডিসি মোহাম্মদ শামীম আলম। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে বিরত রাখতে আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন ঝিনাইদহের ডিসি মনিরা বেগম। তিনি বলেন, এতে শিক্ষকতা পেশায় থেকে রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণে শিক্ষকদের নিরুৎসাহিত করা সম্ভব হবে।

শিক্ষকতার পাশাপাশি ঠিকাদারি, সাংবাদিকতাসহ একাধিক পেশায় নিয়োজিত থাকার প্রবণতা রোধ হওয়া এবং শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে আন্তরিক হবেন। এতে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার মানোন্নয়নের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে। নিজ ব্যবস্থাপনায় সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন ভোলার ডিসি মো. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী। কিশোরগঞ্জের ডিসি আবুল কালাম আজাদ প্রস্তাব করেছেন, হাওর অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে গ্রীষ্মকালীন ছুটি যেন ২৫ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত কার্যকর করা হয়। বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩ থেকে ১৯ জুলাই এবং প্রাথমিকে ২৮ জুন থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত আছে। কিন্তু ওই সময়ে বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় হাওরাঞ্চলে সে সময়ে নৌকা বা হেঁটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া-আসায় অসুবিধা হওয়ায় সে সময় ছুটি পেলে উপকৃত হবে শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের জন্য ২৪ ঘণ্টার একটি সুনির্দিষ্টি শিক্ষা চ্যানেল চালুর প্রস্তাব করেছেন ঝালকাঠির ডিসি। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত ঊর্ধ্বতন অফিস থেকে জারি করা সব ধরনের পত্রের অনুলিপি ডিসি ও ইউএনওকে দিতে প্রস্তাব করেছেন মাদারীপুরের ডিসি রহিমা খাতুন। নওগাঁর ডিসি খালিদ মেহেদী একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করেছেন। কক্সবাজারে একটি মেরিন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন ডিসি শাহীন ইমরান।

বাস্তবায়ন হয়নি গত বছরের ৬৫ সিদ্ধান্ত : গত বছরের ডিসি সম্মেলনে নেওয়া ২৪২টি সিদ্ধান্তের মধ্যে ১৭৭টি বাস্তবায়ন হয়েছে। এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে ৬৫টি; যা মোট সিদ্ধান্তের ২৭ শতাংশ। সম্মেলনে তিন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ৭২টি।

যার মধ্যে ৫৮টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যা শতকরা ৮১ শতাংশ। মধ্যমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১০৫টি। এর মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে ৭৭টি। দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ৬৫টি। যার মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে ৪২টি সিদ্ধান্ত।