মন্ত্রণালয়ের কাণ্ডে নাভিশ্বাস শিক্ষক শিক্ষার্থীর

মুসতাক আহমদ ।।

প্রাথমিক শিক্ষা খাতে চলছে তুঘলকি কাণ্ড। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কিছুদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আর তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো সিদ্ধান্ত তাদের ব্যবসায়ীদের ফাঁদেও ফেলে দিচ্ছে। মন্ত্রণালয়টির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তির কারণে এমনটি ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তুঘলকি সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটেছে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’র মাধ্যমে উপবৃত্তি বিতরণের নির্দেশনায়। এ সংক্রান্ত দুটি নির্দেশিকায় যে কোনো মোবাইল ফাইন্যান্সিং সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা পৌঁছানোর কথা বলা আছে। তা সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একই প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দিতে নীতিমালাই বদলে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া গত ডিসেম্বর হঠাৎ করে বৃত্তি পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের ওপর। এই পরীক্ষার কারণে এবার বছর শুরু না হতেই নোট-গাইড আর কোচিং ব্যবসার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। চলতি বছর নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে প্রথম শ্রেণিতে। কিন্তু এ বই প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত শিক্ষাক্রমের রূপরেখা অনুসরণে লেখা হয়নি। শুধু তাই নয়, গত বছর এ বইয়ের পাইলটিং (পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা ছাড়াই এবার শিক্ষার্থীদের হাতে ‘পরীক্ষামূলক সংস্করণের’ নামে সবার হাতে বই তুলে দেওয়া হয়েছে।

এই বই শিক্ষকরা কীভাবে পড়াবেন সেই প্রশিক্ষণ তারা পাননি। এমনকি শিক্ষক গাইডও দেওয়া হয়নি। এভাবে অনলাইন বদলি, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বেআইনিভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান, কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুল নিয়ন্ত্রণে উদাসীনতাসহ নানান অভিযোগ আছে।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে গত সপ্তাহে একাধিকবার চেষ্টা করেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তার দপ্তরে গিয়ে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলেও তিনি সাড়া দেননি। এক পর্যায়ে সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বলেন, এখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই।

তবে মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ নগদকে উপবৃত্তি বণ্টনের কাজ দেওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, নগদের মাধ্যমে উপবৃত্তি বিতরণ সংক্রান্ত নির্দেশিকা সংশোধনের ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) চিঠি তিনি পাননি। তবে এমন কিছু থাকলে অর্থ বিভাগের পরামর্শ নিয়েই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আর বৃত্তি পরীক্ষা সম্পর্কে তিনি   বলেন, যুগ যুগ ধরেই প্রাথমিক মেধাবৃত্তি দেওয়ার রেওয়াজ চলে এসেছে। পিইসি পরীক্ষার ভিত্তিতেও এই বৃত্তি দেওয়া হতো। যেহেতু এখন পিইসি নেই, তাই বৃত্তি পরীক্ষাটি নেওয়া হচ্ছে।

শুধু নগদে উপবৃত্তি : গত ৫ ডিসেম্বর ডিপিইর পাঠানো প্রস্তাবে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি শুধু মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবা (এমএফএস) নগদ-এর মাধ্যমে বিতরণের বিষয়ে এ সংক্রান্ত দুটি নির্দেশিকা সংশোধনের কথা বলা আছে। এ নির্দেশিকা দুটিতে বর্তমানে দেশে বিদ্যমান সব এমএফএস’র মাধ্যমে উপবৃত্তি বণ্টন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ অভিভাবকরা দেশে বিদ্যমান নগদ, বিকাশ, রকেট, উপায়, শিওরক্যাশ, টি-ক্যাশসহ যে কোনো একটির মাধ্যমে নিজের পছন্দমতো উপবৃত্তির টাকা নিতে পারবেন। কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তির ইচ্ছায় নগদের মাধ্যমে উপবৃত্তি বণ্টনের লক্ষ্যে উভয় নির্দেশিকা সংশোধন করতে হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, এ লক্ষ্যে গত ২ জানুয়ারি ডিপিই থেকে নির্দেশিকার ওপর ১৬টি সংশোধনী প্রস্তাব করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

সূত্র জানায়, উপবৃত্তি বণ্টনে হাজারও অনিয়ম আর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি নির্দেশিকা তৈরি করা হয়। এর একটি ২০২১ সালে প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি বাস্তবায়ন নির্দেশিকা এবং এ নির্দেশিকা বাস্তবায়নের অপারেশনাল ম্যানুয়াল। এতেই অভিভাবকের পছন্দমতো যে কোনো এমএফএস’র মাধ্যমে উপবৃত্তি গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া হয়। অর্থ বিভাগেরও এই নির্দেশিকায় সম্মতি আছে।

কিন্তু গত ৫ ডিসেম্বর ডিপিই থেকে নির্দেশিকা সংশোধন সংক্রান্ত চিঠিতে তৎকালীন (গত বছরের ফেব্রুয়ারি) দায়িত্ব পালনকারী সচিব গোলাম মো. হাসিবুল আলমের লেখা নোটের কথা উল্লেখ করা হয়।

নোটে বলা হয়, ‘কোনো একটি অপারেটরকে কোনোরূপ প্রক্রিয়া ছাড়াই নির্বাচন করা হলে প্রশ্নের সৃষ্টি হতে পারে এবং তা অহেতুক বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘অন্যথায় মাননীয় প্রতিমন্ত্রী কোন অপারেটরের মাধ্যমে উপবৃত্তি বিতরণ করা হবে তা নির্ধারণ করতে পারেন এবং জারিকৃত নির্দেশিকাটি সে মতে সংশোধন করা যায়।’ এরপর ওই ফাইলে প্রতিমন্ত্রী মতামত দেন-‘উপবৃত্তির টাকা বিতরণের জন্য ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখের চুক্তি অনুযায়ী নগদ-এর সাথে পুনরায় চুক্তি করার জন্য অনুমোদন করা হইল। এবং জারিকৃত নির্দেশিকাটি সে মতে সংশোধন করা যায়।’

ডিপিই এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এখন ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য উপবৃত্তি বণ্টন করতে হবে। এ কারণে নির্দেশিকা দুটি সংশোধন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ওই কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইচ্ছাই তাদের কাছে আইন হয়ে যায়। তাই তারা আদিষ্ট হয়ে সংশোধনী নিয়ে কাজ করছেন। তবে সাবেক সচিবের দ্বিমত এবং দুটি নির্দেশিকা থাকার পরও ইতোপূর্বে প্রতিমন্ত্রী কেন আগের মতোই নির্দিষ্ট এমএফএসের মাধ্যমে উপবৃত্তির অর্থ বণ্টনের মতামত দিয়েছিলেন সেটি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।

এ ব্যাপারে কথা বলতে কয়েকদিন ধরে বারবার ফোন দিয়েও ডিপিই মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াতকে পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, উপমন্ত্রীর এককভাবে অনুমোদনের পরই গত বছরের জুনে নগদের মাধ্যমে ২০২০-২১ অর্থবছরের (২০২০ সালের জুলাই-ডিসেম্বর) উপবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ কেনার অবিতরণকৃত ৮৬৪ কোটি ২০ লাখ ৩ হাজার, ৫০০ টাকা বিতরণ করা হয়েছিল।

হঠাৎ চেপে বসল বৃত্তি পরীক্ষা : গত ১ ডিসেম্বর হঠাৎ করে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেয় এই মন্ত্রণালয়। তবে এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ পায় ছুটির দিন শুক্রবার। গত ৩০ ডিসেম্বর বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। বর্তমানে এই পরীক্ষার ফল দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আকস্মিক ঘোষণায় এমন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পক্ষে যুক্তি দিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব   বলেছিলেন, মেধা যাচাই এবং প্রাথমিকে বৃত্তি দেওয়ার রেওয়াজ পুরোনো। সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা না নেওয়ায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় এই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এই পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন দেশের ৩০ বিশিষ্ট নাগরিক। এক বিবৃতিতে তারা বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এতে তারা শিক্ষার্থীদের ওপর নানামুখী মানসিক ও শারীরিক চাপ এবং বৈষম্য সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে এ ধরনের পরীক্ষা বিশেষ করে পিইসি পরীক্ষার কারণে নোট-গাইড ও কোচিং ব্যবসা শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ঘাড়ে চেপে বসার অভিযোগ করে আসছিলেন।

গত কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অভিভাবকরা ফোনে  যা জানিয়েছেন তা সুশীল সমাজের উল্লিখিত আশঙ্কার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর এক অভিভাবক জানান, ২ জানুয়ারি ওই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ক্লাস শুরু হয়। প্রথম দিনই গণিত শিক্ষক ক্লাসের শিক্ষার্থীদের কোচিং করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ওইদিন তিনি নাম সংগ্রহ করেন।

ওই অভিভাবক আরও জানান, কয়েকদিন ধরে গাইড প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সৌজন্য কপিসহ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। এখানেই শেষ নয়, ইতোমধ্যে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি চিঠি দিয়ে তাদের সদস্যদের বলেছে, গত বছর যে প্রতিষ্ঠান যেখানে প্রাথমিকের বই পাঠ্য করেছে, এবারও তারা সেখানে তাদের বই বিক্রি করবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাকালে ২০২০-২০২১ সালে পিইসি পরীক্ষা বন্ধ ছিল। তখন শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা অত্যাচার থেকে মুক্ত ছিলেন। কিন্তু বৃত্তি পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়ায় নোট-গাইড আর কোচিং ব্যবসা ফিরে আসছে বলে মনে করেন তারা।সুত্র যুগান্তর