ভয়ঙ্কর আসক্তি শিক্ষার্থীদের

নিউজ ডেস্ক।।

দেশে এখন পর্যন্ত ২২ হাজার নিষিদ্ধ পর্নোসাইট বন্ধ করে দিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। নজরদারিতে রয়েছে আরো কয়েক হাজার সাইট। সেগুলোও পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেয়া হবে। সেইসাথে যেসব গেটওয়ে দিয়ে পর্নোসাইট দেখা যায় সেগুলো বন্ধের ব্যাপারে কাজ করা হচ্ছে। তবে এতকিছুর পরও ভয়ংকর আসক্তিতে শিক্ষার্থীরা।

এদিকে রেগুলার গেটওয়েতে পর্নোসাইট বন্ধ হলেও প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ও মিররওয়েতেও দেখা যায় পর্নোসাইট। আর এ পর্নোসাইটে সবচেয়ে বেশি আসক্ত স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। বেশিরভাগই মোবাইল ফোন দিয়ে দেখা হচ্ছে এসব সাইট। পর্নো দেখার ফলে একদিকে যেমন মানসিক বিকারগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি শিশুরাও অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে।

বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, প্রায় ২২ হাজার পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধ করেছি। বিষয়টি নজরদারিতে আছে। নতুন নতুন ফরম্যাটে এগুলো দেখা যাচ্ছে বলে শুনেছি। লিংকগুলো আমাদের কাছে পাঠানো হলে তা ব্লক করে দেওয়া হবে।

বিভিন্ন গবেষণা সূত্রে জানা যায়, রেগুলার গেটওয়ে যেমন গুগলক্রম, মজিলা ফায়ারফক্স বা ই-এগুলো দিয়ে সাধারণত পর্নোসাইটে প্রবেশ করা যায় না। এগুলো দিয়ে প্রায় ২২ হাজার পর্নোসাইট ব্লক করে দেয়া হয়েছে। তবে ভিপিএন কানেক্ট করলেই গুগলক্রম কিংবা ফায়ারফক্স গেটওয়ে দিয়ে অনায়াসেই পর্নোসাইটে প্রবেশ করা যায়। আর এ কারণে আত্মীয়, অনাত্মীয় বা বন্ধুদের কৌতুহলে সাড়া দিয়ে শিশুদের মধ্যে পর্নোগ্রাফি দেখার প্রবণতা বাড়ছে।

গবেষণা বলছে, শতকরা ৭৫ দশমিক ১ জন শিশু, যাদের মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন আছে, তারা পর্নোগ্রাফি দেখছে। শতকরা ২৬ জন মেয়েশিশু বলেছে যে, তারা আত্মীয়দের সঙ্গে পর্নোগ্রাফি দেখছে। শতকরা ১৪ দশমিক ৪ জন মেয়েশিশু দেখেছে অনাত্মীয়ের সঙ্গে।

মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, না-বুঝে কম বয়সে পর্নোগ্রাফি দেখলে সহিংসতাসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে শিশু। কেবল অভিভাবকদের সতর্কতা আর শিশু উপযোগী পরিবেশ তৈরির মধ্য দিয়েই এই ভয়াবহতা থেকে শিশুকে রক্ষা করা যেতে পারে।

গত বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর কলাবাগানের বন্ধুর বাসায় গিয়ে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নূর আমিনের মৃত্যু হয় বিকৃত যৌনচারে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে। মূলত পর্নোগ্রাফী সাইটে আসক্ত হওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে পরবর্তীকালে নানা মাধ্যম থেকে জানা যায়।

পর্নোগ্রাফিতে শিশুর প্রবেশাধিকারের মাত্রা কতটা, একটি জরিপে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। বেসরকারি সংস্থা ইনসিডিন বাংলাদেশ-এর করা জরিপে শিশুর প্রতি সহিংসতার নানা চিত্র তুলে ধরা হয়। গবেষণা বলছে, আক্রমণাত্মক ও হিংসাত্মক আচরণের পেছনে অনেক সুপ্ত কারণ থাকে। আর এ কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পর্নোগ্রাফি আসক্তি।

২০১৭ সালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকার স্কুল পড়ুয়াদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্নোগ্রাফি দেখে। জরিপটি অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে করা হয়। তাতে দেখা যায়, পর্নোগ্রাফি তারা ছবি, ভিডিও, অডিও ও টেক্সট আকারে ব্যবহার করে। জরিপে বেরিয়ে আসে শিক্ষার্থীরা প্রধানত মোবাইল ফোনে অনলাইনে পর্নোগ্রাফি দেখে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর জরিপে বেরিয়ে আসে আরও কিছু তথ্য। তাতে দেখা যায় দেশে এর প্রবণতা বাড়ছে। টেক্সট, ছবি ও ভিডিও-র পাশাপাশি সেক্স টেক্সটের অডিও তৈরি করেও ছাড়া হচ্ছে অনলাইনে।

মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, শিশুকে যেকোনো নির্যাতন থেকে দূরে রাখতে হলে সবার আগে তার নীরবতা ভাঙতে দিতে হবে। বেশিরভাগ সময় শিশু যখন তার পরিস্থিতি অভিভাবককে জানায় তখন তাকে চুপ থাকতে বলা হয়। সেটি না করে শিশুকে শুরু থেকেই কোনটি খারাপ তা শেখাতে হবে। কোন বিষয়গুলো তাকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে সেটাও তাকে জানাতে হবে। এই প্রাথমিক পাঠ অভিভাবকই দিতে পারেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে তার জন্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। খারাপ পরিস্থিতি পর্যন্ত যেন শিশুকে না যেতে হয় অভিভাবককে সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত কারোর সঙ্গে অনেকটা সময় একা যেন শিশু না থাকে সেদিকেও নজর দিতে হবে। শিশুকে মোবাইল দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

আইন কী বলে : পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২-তে বলা হয়েছে, পর্নোগ্রাফি হলো (১) যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোনো অশ্লীল সংলাপ, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি, নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নৃত্য যা চলচ্চিত্র, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য কোনো উপায়ে ধারণকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য এবং যার কোনো শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই। যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অশ্লীল বই, সাময়িকী, ভাস্কর্য, কল্পমূর্তি, মূর্তি, কার্টুন বা লিফলেটও এর অন্তর্ভুক্ত।

পর্নোগ্রাফি আইনে পর্নোগ্রাফি তৈরি, বিতরণ, বিক্রি এবং ব্যবহারে পৃথক শাস্তির বিধান রয়েছে। সর্বনিম্ন শাস্তি দুই বছর এবং সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড। এর সঙ্গে আর্থিক জরিমানার বিধানও আছে। পর্নোগ্রাফি উৎপাদনের সরঞ্জাম, প্রচার সরঞ্জাম বা মাধ্যম জব্দ করার বিধানও আছে।

বাংলাদেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের ৯ কোটিই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট অনুসন্ধানের তালিকার শীর্ষে পর্নো তারকাদের নিয়মিত দেখা যায়।

ইন্টারনেট সেবাপ্রদানকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক বলেন, তারা সরকারের নির্দেশ মেনে চলছেন। কিন্তু ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) বা মিরর ওয়েবসাইট ব্যবহার করে অনেকেই অনলাইনের পর্নোসাইটে ঢুকছেন।

তিনি বলেন, এটা একটা অব্যাহত প্রক্রিয়া। কাজেই এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ এসব ওয়েবসাইট নীতিমালার ক্ষেত্রে সচেতন। প্রতি সপ্তাহে তারা কয়েক হাজার মিরর সাইট দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।