ভিসির পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল ক্যাম্পাস

 নিউজ ডেস্ক।।

সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আন্দোলন এখন সব শিক্ষার্থীর আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। একটি হলের ছাত্রীরা প্রভোস্টদের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও এখন সব শিক্ষার্থীর একটাই দাবি, উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে আবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তাঁকে অপসারণে আচার্যকে চিঠি দিতে গণস্বাক্ষর গ্রহণ শুরু করেছেন।

গতকাল সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও ক্যাম্পাস ছাড়েননি শিক্ষার্থীরা। তাঁরা উপাচার্য ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে ক্যাম্পাসে বিরতিহীন বিক্ষোভ করেছেন। হল না ছাড়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ক্যাম্পাস ছিল উত্তাল।

kalerkanthoতবে গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের দোকানপাট ও লাইট বন্ধ করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, রাত ৮টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের দোকানপাট ও লাইট বন্ধ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। আর সন্ধ্যা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে নয়া বাজার এলাকায় পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা টহল দিয়ে আবাসিক হলে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করছেন বলে একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন।

গত রবিবার ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের শটগানের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গতকাল উপাচার্যকে প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার পাশাপাশি তাঁকে হটাতে তাঁরা রাষ্ট্রপতি বরাবর আবেদন জানাতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক জহীর উদ্দিন আহমদ ও প্রক্টর ড. আলমগীর কবীরের পদত্যাগ দাবি করেছেন।

গতকাল বিকেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। ভবনের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান করা পুলিশ সদস্যদের ফুল দিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ জানাতে থাকেন শিক্ষার্থীরা।

রবিবার পুলিশের হামলায় আহত হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইপি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ চঞ্চল। মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে গতকাল তিনিও আন্দোলনে শামিল হন। উপাচার্য ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যের কাছে গিয়ে ফুল হাতে অনুরোধ করতে থাকেন, ‘গতকাল আমাদের মেরেছেন, আমার মাথা ফাটিয়েছেন। আমরা এসব মনে রাখিনি। আজকে ফুল নিয়ে এসেছি। ফুল নিয়ে আপনারা দয়া করে আমাদের ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান।’

কালের কণ্ঠকে চঞ্চল রবিবারে হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘সন্ধ্যার পর আন্দোলনরত আমাদের সহপাঠী মেয়েদের চারপাশে দাঁড়িয়ে আমরা তাদের রক্ষার চেষ্টা করছিলাম। এ সময় পুলিশ সামনে এসে দাঁড়ায়। শিক্ষকরাও আসেন। এরপর পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমাদের মারধর করেছে, গুলি ছুড়েছে। আমার মাথায় এসে একটা লেগেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর থেকেই ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছাড়তে অস্বীকার জানিয়ে গতকাল সকাল ৮টা থেকে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় ক্যাম্পাসের গোল চত্বরে অবস্থান নিয়ে তাঁরা উপাচার্যবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন।

সকাল ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা গোলচত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে মুক্তমঞ্চে গিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। এরপর শিক্ষার্থীদের একাংশ মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় তালা দেন। পরে আবারও গোলচত্বরে এসে জড়ো হন সবাই। এ সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষে শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মিলা বলেন, ‘বাইরে থেকে পুুলিশ এসে আমার সহপাঠীকে মেরেছে, আগের দিন ছাত্রলীগ মেয়েদের গায়ে হাত তুলেছে, পুলিশও মেয়েদের গায়ে হাত তুলেছে। এটা আমরা কোনোভাবে মেনে নেব না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক বর্তমান উপাচার্যের অধীনে নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা চাইবে না কোনো ছেলে এসে আমার গায়ে হাত দিক। কিন্তু এই ভিসি থাকার পরও আমাদের সঙ্গে এ রকম ঘটনা ঘটেছে। তিনি কিভাবে আমাদের অভিভাবক হন?’

বেলা আড়াইটার দিকে শিক্ষার্থীরা আবারও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এ সময় তাঁরা মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন-১ (উপাচার্য ভবন) ও ২, একাডেমিক ভবন ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’, ‘ই’ এবং ইউনিভার্সিটি সেন্টার ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর আবারও গোলচত্বরে জড়ো হয়ে কোনো অবস্থায়ই হল না ছাড়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের হলে হলে অবস্থান করার আহ্বান জানান। পরে উপাচার্যকে অপসারণের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি শুরু করেন। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি এবং তাঁকে এই ক্যাম্পাস থেকে চলে যেতে হবে। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বরাবর গণস্বাক্ষরসহ চিঠি দিব। উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে এবং কোনো শিক্ষার্থী হল বা ক্যাম্পাস ছেড়ে যাবে না।’

এরপর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে গোলচত্বর থেকে মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাঁরা পুলিশকে ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে পুলিশের উদ্দেশে খোলা চিঠি পাঠ করা হয়।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন, ‘আমরা এখানে দায়িত্ব পালন করতে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। কর্তৃপক্ষের অনুরোধে আমরা এসেছি। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আছে, আমরাও শান্তিপূর্ণভাবে আছি। প্রশাসনের অনুমতি পেলে আমরা চলে যাব।’

এসব বিষয়ে জানতে শাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও প্রক্টর ড. আলমগীর কবীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয়

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে গত রবিবার পুলিশের সংঘর্ষে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গতকাল বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত রবিবার ক্যাম্পাসের ভেতরে সংঘটিত দুঃখজনক ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে। চিকিৎসাজনিত যাবতীয় ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহন করবে।

পুলিশের হামলার নিন্দা শাবি শিক্ষক সমিতির

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার নিন্দা জানিয়েছে শাবি শিক্ষক সমিতি। গতকাল এক বিবৃতিতে তারা এই নিন্দা জানায়।

সমিতির সভাপতি ড. তুলসী কুমার দাস ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ মহিবুল আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

বিবৃতিতে তাঁরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের যাঁরা আহত হয়েছেন তাঁদের সুচিকিৎসা দিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।