ভালো দিয়ে বদলে দাও মন্দ

 মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী।।

এক কথায় বা একবাক্যে যদি রসুল (সা.)-কে সংজ্ঞায়িত করতে হয় তাহলে কীভাবে করব? পৃথিবীর কোনো মানুষের বানানো কথায় এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চলুন মহান আল্লাহ যেভাবে একবাক্যে তাঁর হাবিবের পরিচয় দিয়েছেন তা জেনে নিই। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আমি আপনাকে জগদ্বাসীর জন্য রহমত করে পাঠিয়েছি।’ আরবি ‘রহমত’ একটি ব্যাপক শব্দ। বলা যায় কূল-কিনারাহীন এক মহাসমুদ্রের নাম হলো রহমত। একটি মজার বিষয় দেখুন। সুরা ফাতিহার প্রথম আয়াতে আল্লাহ নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন রব্বিল আলামিন বলে। আর এদিকে নবীজিকে পরিচয় দিয়েছেন রহমাতাল্লিল আলামিন বলে। অর্থাৎ যেসব জগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ, সেসব জগতের রহমত রসুল (সা.)। এখানে একটি সূক্ষ্ম ব্যাপার লুকিয়ে আছে। দর্শনের ভাষায় প্রতিটি কাজের জন্য কারণ প্রয়োজন। কারণ ছাড়া কাজ হয় না। আল্লাহ যে জগৎগুলোর প্রতিপালক অর্থাৎ আল্লাহ যে মহাবিশ্ব পরম মমতায় লালনপালন করছেন এরও একটা কারণ আছে। সে কারণ কী? সে কারণ হলো রসুল (সা.)। মানুষ যেমন প্রেমময় সন্তানের মায়ায় কঠোর থেকে কঠোরতর দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে যায়, একইভাবে আল্লাহ রসুলের অসিলায় বা কারণে জগদ্বাসীকে লালনপালন করে যাচ্ছেন। অবশ্য জগদ্বাসীকে লালনপালন করা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন কোনো কাজ নয়।

রসুল (সা.) কেমন দয়াশীল ছিলেন হাজারো উদাহরণের মধ্যে একটি উদাহরণ আমরা সবাই জানি। তায়েফের ময়দানে যখন রসুল (সা.)-কে অমানবিক নির্যাতন করা হলো, যখন আসমানের ফেরেশতারা পর্যন্ত ধৈর্যহীন হয়ে বলল, হে আখেরি পয়গম্বর! আপনি আমাদের আদেশ করুন তায়েফবাসীকে পাহাড় চাপা দিয়ে ধ্বংস করে দিই। জবাবে রসুল (সা.) বলেছেন, আমি তো ধ্বংসের জন্য আসিনি। আমি হলাম রহমাতাল্লিল আলামিন। হে আল্লাহ! তায়েফবাসীকে আপনি ক্ষমা করুন। তায়েফবাসীকে আপনি হেদায়াত করুন। এখন তারা আমাকে চেনেনি, একদিন তাদের বংশধর ঠিকই আমার দাওয়াত মেনে নেবে।

মক্কায় রসুল (সা.)-কে কত কটূক্তি করা হয়েছে, পাগল-জাদুকর, জিনে ধরা, কবিসহ আরও কত ব্যঙ্গবিদ্রƒপ করা হয়েছে; এসবের জবাবও আল্লাহ নিজে কোরআনের আয়াত নাজিল করে দিয়েছেন। কিন্তু একটি আয়াতও পাওয়া যায় না যেখানে ইসলামকে ছোট করে দেখার কারণে মুসলমানদের হিংস্র হতে বলা হয়েছে। আসলে দাওয়াতের সঙ্গে হিংস্রতা বা উগ্রতার কোনো সম্পর্ক নেই। একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন তো, দাওয়াত কাকে দেওয়া হয়? ভালো মানুষকে না খারাপ মানুষকে? অবশ্যই খারাপ মানুষকে ভালোর পথে দাওয়াত দেওয়া হয়। তার মানে একজন ‘দায়ি’ জেনে বুঝেই খারাপ মানুষের কাছে যাচ্ছেন। আর খারাপ মানুষ খারাপ করবে, কুকুর কামড় দেবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যিনি দায়ি তিনি তো মন্দের জবাবে মন্দ বলতে পারেন না। কুকুর কামড় দিয়েছে বলে কুকুরকে কামড় দেওয়া মানুষের শোভা পায় না। তাই তো দায়িকে আল্লাহ বলেছেন, ‘মন্দ ভালো দিয়ে বদলে দাও। তাহলে দেখবে মন্দও ভালো হয়ে গেছে।’ মন্দের জবাবে ভালো বলা চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ দায়ি যদিও ভালো মানুষ, তবু শয়তান তার পেছনে লেগে রয়েছে। তাই আল্লাহ পরের আয়াতে বলছেন, ‘যারা সবর করে আর যাদের ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ আছে তারাই কেবল মন্দের জবাবে ভালো বলতে পারে।’ পরের আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘যখন তুমি ভালোর দাওয়াত দিতে মাঠে নেমে পড়বে তখন তোমাকে অনেক খারাপের মুখোমুখি হতে হবে। একসময় শয়তান তোমাকে ওয়াসওয়াসা দিয়ে বলবে, খারাপের জবাবে হয়তো খারাপ বলাটা দোষণীয় নয়। যখনই শয়তান তোমাকে এভাবে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করবে, সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর আশ্রয় চাও।’

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাস্সির সোসাইটি