বৈশ্বিক তাপপ্রবাহে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কারখানার বয়লার চেম্বারের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অনেক দেশে বর্তমানে একই সাথে তাপপ্রবাহ চলছে। বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন থেকে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে। সামনের কিছুদিন তা আরো বাড়বে যদি মুষলধারে বর্ষণ না হয়। ঠাণ্ডার মহাদেশ ইউরোপে তাপ প্রবাহের কারণে ইতোমধ্যে প্রাণহানী ঘটেছে। বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয় ইতোমধ্যে স্পেন ও পর্তুগালে ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, সে দেশে গত তিন দিনে ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে গত ১০-১২ দিন যাবৎ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছে। পর্তুগালের তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তাপমাত্রা কম-বেশি এমনই। আমাদের পাশের দেশ ভারত ও পাকিস্তানের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা নাসা গতকাল শনিবার রাত ৩টার দিকে পৃথিবীর তাপ প্রবাহের একটি স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করে বলেছে, পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই চলছে তাপপ্রবাহ।

মানচিত্রের রঙিন ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো দেশে তাপ কিছুটা কম হলেও বেশির ভাগ দেশেই চরম তাপমাত্রা বিরাজ করছে। নাসার স্যাটেলাইটে পৃথিবীর যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে যে অংশটি বেশি কালো দেখা যাচ্ছে সেখানে তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি। গত ১৫ জুলাই স্পেনের সেভিল শহরের তাপমাত্রা উঠেছে ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অপর দিকে ইরানের আহভাজ শহরের তাপমাত্রা উঠে ৪৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঠাণ্ডা অঞ্চল নামে খ্যাত চীনের সাংহাই শহরের তাপমাত্রা উঠেছে ৩৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাংলাদেশে ঈদুল আজহার আগে থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ চলছে।

এই তাপপ্রবাহ উপমহাদেশীয় তাপ প্রবাহের অংশ। দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান, ভারতের উত্তরাঞ্চলের পুরোটাই এবং বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে ওই তাপপ্রবাহ অঞ্চল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান অথবা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে বর্তমান তাপ প্রবাহের কারণ উল্লেখ করে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইর এফিলিয়েট রিসার্চ ফ্যাকাল্টির অধ্যাপক ড. রাশেদ চৌধুরী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় যে অসহনীয় তাপমাত্রা চলছে, তা ‘হিট ব্লুব’ নামক একটি প্রক্রিয়ার কারণে। হিট ব্লুব সম্বন্ধে রাশেদ চৌধুরী বলেন, ‘হিট বুøব’ (ঐবধঃ ইষড়ন) হচ্ছে গরম পানির সমাহার। গরম পানির অঞ্চল। এই প্রক্রিয়াটি ২০১৩ সাল থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই হিট ব্লুব আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রভাবেই সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া দাবানল সৃষ্টি হয়।

২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ বর্গকিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে গরম পানির একটি অঞ্চল তৈরি হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই অঞ্চলটি স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম ছিল। এই হিট ব্লুব থেকে উদ্ভূত উত্তাপ অস্ট্রেলিয়ার বাতাসকে আরো বেশি উত্তপ্ত করে তুলে। অস্ট্রেলিয়া দাবানলের জন্য এই হিট ব্লুবই মূলত দায়ী। অন্য কারণগুলো সমস্যাটাকে আরো জটিল করে তুলে। ড. রাশেদ চৌধরী বলেন, সাধারণত হিট ব্লুব সৃষ্টি হয় বাতাসের দুর্বলতার কারণে। বায়ু প্রবাহের কারণে সমুদ্রের ওপরের গরম পানি নিচে চলে যায়। আর নিচের ঠাণ্ডা পানি উপরে চলে আসে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

যখন বাতাসের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে দুর্বল হয়ে যায় তখন এ প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়। অর্থাৎ সমুদ্রের ওপরের গরম পানি নিচে যেতে পারে না এবং নিচের ঠাণ্ডা পানি উপরে আসতে পারে না। ফলে সমুদ্রের উপরিতলের একই জায়গায় গরম পানি জমতে থাকে। এই জমে যাওয়া গরম পানি থেকে ‘হিট ব্লুব’ সৃষ্টি হয়। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে কোথাও কোথাও ‘ট্রেড উইন্ড’ দুর্বলতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ড. রাশেদ চৌধুরী বলেন, হিট বুøবের কারণে শুধু ভূমিতে নয়, সমুদ্রের অভ্যন্তরেও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। সেটা নির্ভর করে এই ব্লুব কত দিন স্থায়ী হবে।

দীর্ঘস্থায়ী হলে সমুদ্রের জলজ প্রাণী, মাছ বা মাছের খাদ্য বিশেষভাবে ক্ষতির শিকার হতে পারে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে ইকো সিস্টেমে। এই হিট ব্লুব প্রায়ই সমুদ্রের উত্তপ্ত অঞ্চলে দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে লক্ষ যাচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগর অন্যান্য মহাসাগরের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি আগের চেয়ে বেশি হারে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আগামীতে দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলটি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এই হিট ব্লুবের প্রভাব বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল বিশেষ করে বাংলাদেশেও লক্ষ করা যাবে। সুতরাং এ কথা মাথায় রেখেই বনাঞ্চলে স্থানীয় ব্যবস্থাপনা উন্নত করা উচিত এবং নতুন অবকাঠামো বা শিল্প-কারখানা গড়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। রাজধানী ঢাকা শহরে তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশিই থাকে অপরিকল্পিত দালান কোটা গড়ে উঠায়। এটা ছাড়াও মানুষের সৃষ্ট মিথেন গ্যাস উদগীরণের কারণে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে তাপমাত্রা বেশি থাকে।

ড. রাশেদ চৌধুরী বলেন, শুধু ঢাকা বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও তাপমাত্রা বেশি হওয়ার পেছনে মিথেনের অবদান রয়েছে। মিথেন একটি গ্রিনহাউজ গ্যাস। এটা কার্বনডাই অক্সাইডের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি তাপ ধারণ করে রাখতে পারে।