বিসিএসজট কাটাতে কোন পথে পিএসসি

শরিফুল হাসান, কলামিস্ট।।
চার বছরে পৃথিবীর বহু দেশে এক সরকার ক্ষমতা শেষ করে আরেক মেয়াদ আসে। চার বছরে পৃথিবীর বহু দেশ তো বটেই, এমনকি বাংলাদেশেও যেকোনো বিষয়ে স্নাতক শেষ করা যায়। কিন্তু চার বছরেও একটা বিসিএসের নিয়োগ-প্রক্রিয়া শেষ হয় না বাংলাদেশে!

এই যেমন চার বছরেও ৪০ তম বিসিএসের নিয়োগ-প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। আরেক বিসিএস ৪১-এর প্রক্রিয়াও তিন বছর ধরে ঝুলে আছে। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ৪১ তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। এই বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শেষ হতেই প্রায় তিন বছর লেগে যাচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়। কিন্তু নয় মাসেও ফল প্রকাশ করতে পারেনি পিএসসি।

পিএসসি বলছে, তিন শতাধিক পরীক্ষকের অবহেলার জন্য ফল প্রকাশে দেরি হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই দায় কেন পরীক্ষার্থীরা নেবেন? এই যে তিন বছরেও লিখিত পরীক্ষার ফল হলো না, তাহলে কবে মৌখিক হবে আর কবে চূড়ান্ত ফল?

দুই বিসিএস থেকে ৮৮৩ জনকে নন ক্যাডারে সুপারিশদুই বিসিএস থেকে ৮৮৩ জনকে নন ক্যাডারে সুপারিশ
৪৩ তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে জুলাই মাসে। ৪৪ তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা এখনো শুরু হয়নি। এর মধ্যেই আবার ৪৫ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার কথা। সব মিলিয়ে বিসিএসজটে পড়েছে পিএসসি। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো প্রার্থী। এর মধ্যে আবার বিসিএসের নন-ক্যাডারে নিয়োগ-প্রক্রিয়া নিয়েও জটিলতা শুরু হয়েছে। ফলে সেখানেও দুশ্চিন্তায় আছেন প্রার্থীরা।

২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল ৪০ তম বিসিএসের বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি) চাহিদাপত্র পাঠিয়েছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। আবেদন করেন ৪ লাখ ১২ হাজার ৫৩২ জন প্রার্থী। প্রায় চার বছর পর এ বছরের ৩০ মার্চ বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১ হাজার ৯৬৩ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে পিএসসি। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তাঁদের গেজেট হয়নি। ফলে কবে তাঁরা চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন, জানেন না।

অন্যদিকে ৪০ তম বিসিএসে উত্তীর্ণ কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে ক্যাডার পদে সুপারিশ পাননি এমন আট হাজারেরও বেশি প্রার্থী পড়েছেন নতুন দুশ্চিন্তায়। এত দিন একটি বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর নন-ক্যাডারের আবেদন নেওয়া হতো এবং পরের বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যত চাহিদা আসত, সেখান থেকে নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু পিএসসি এখন ৪০ বিসিএসের নন-ক্যাডার নিয়োগ শুরুর আগেই অন্যান্য বিসিএসের নন-ক্যাডারের পদ সংরক্ষণ করতে চাইছে—এমন আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন প্রার্থীরা।

সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা দুটো বাড়ার পাশাপাশি নিয়োগে স্বচ্ছতা থাকে বলে চাকরিপ্রার্থীদের বিসিএস নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। একেকটা বিসিএস পরীক্ষায় এখন চার লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু একটা বিসিএসে সাধারণভাবে গড়ে দুই হাজার ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে বিসিএসে উত্তীর্ণ হলেও বিপুলসংখ্যক প্রার্থী চাকরি থেকে বঞ্চিত হতেন। এই প্রার্থীদের প্রথম শ্রেণির অন্যান্য পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্যই ২০১০ সালে নন-ক্যাডার নিয়োগে বিশেষ বিধিমালা করার উদ্যোগ নেন সেই সময়ের চেয়ারম্যান প্রয়াত সা’দত হুসাইন।

থাকতে হবে পরিকল্পিত প্রস্তুতিথাকতে হবে পরিকল্পিত প্রস্তুতি
রিপোর্টার হিসেবে আমি তখন পিএসসির নানা বিষয়ে সংবাদ করি। নন-ক্যাডারের এই নিয়োগ বিধিমালা করার কারণ হিসেবে সা’দত হুসাইন আমাকে বলেছিলেন, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্য থেকেই যদি প্রথম শ্রেণির বিভিন্ন পদে সুপারিশ করা যায়, তাহলে নিয়োগে দুর্নীতি ও সময় কমবে। এ ছাড়া একেকটি বিসিএসে আট থেকে দশ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হলেও বেশির ভাগ চাকরি পেতেন না। নন-ক্যাডারে নিয়োগ দিতে পারলে চাকরি পাওয়ার সংখ্যা বাড়বে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরও মেধাবী কর্মকর্তা পাবে।

২০১০ সালে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা করার পর ২৮ তম বিসিএস থেকে ২৯৯ জন, ২৯ তম বিসিএস থেকে ১৯৩ জন, ৩০ তম বিসিএস থেকে ৩৬৩ জন, ৩১ তম বিসিএস থেকে ১২০ এবং ৩২ তম বিসিএস থেকে মাত্র ৬৬ জন নন-ক্যাডারের প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ পান।

নন-ক্যাডারে নিয়োগের সিদ্ধান্তটি ছিল ইতিবাচক। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো খুব বেশিসংখ্যক চাহিদা না দেওয়ার কারণে দেখা গেল, ২৮ থেকে ৩৩ তম বিসিএসে উত্তীর্ণ এমন প্রায় ১৯ হাজার প্রার্থী কোনো চাকরি পাননি। দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়া ও মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়েও পদ না থাকার কারণে চাকরি না পাওয়াটা প্রার্থীদের জন্য ছিল হতাশার। সমস্যার কিছুটা সমাধানে ২০১৪ সালে বিসিএসের মাধ্যমে দ্বিতীয় শ্রেণির পদেও নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় পিএসসির চেয়ারম্যান ছিলেন ইকরাম আহমেদ।

দীর্ঘ দুই দশকের সাংবাদিকতা এবং এই সময়ে পিএসসি নিয়ে কাজ করার সুবাদে বলতে পারি, গত কয়েক বছরে বিসিএসের অনিয়ম অনেকটা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা (বর্তমানে ৯ম থেকে ১২ গ্রেড) নিয়োগের জন্য নন-ক্যাডার নিয়োগ বিধিমালা তৈরি ও সংশোধন ইতিবাচক কাজ ছিল। প্রত্যাশা ছিল, এর ফলে মন্ত্রণালয়গুলো শূন্য পদে মেধাবী লোক নিয়োগে আগ্রহী হবে এবং পিএসসিতে যথেষ্ট চাহিদাপত্র পাঠাবে। কিন্তু চাহিদাপত্র বেশি না আসায় খুব বেশিসংখ্যক প্রার্থী চাকরি পাননি।

২০১৬ সালে পিএসসির চেয়ারম্যান হন মোহাম্মদ সাদিক। তাঁকে বলেছিলাম পিএসসির ভেতরে-বাইরে অনেকেই চান না বিসিএস উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে নন-ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হোক। এতে নিয়োগ-বাণিজ্যসহ অনেক কিছু কমে গেছে। বেশিসংখ্যক প্রার্থী নিয়োগ দিতে পারলে রাষ্ট্রই উপকৃত হবে। প্রার্থীবান্ধব এই চেয়ারম্যান সব সময় চাইতেন বেশি বেশি ছেলেমেয়ে চাকরি পাক। মূলত তাঁর উদ্যোগেই ৩৪ তম বিসিএস থেকে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নন-ক্যাডারে চাকরি পেতে থাকেন।

৩৪ বিসিএসে নন-ক্যাডার থেকে ২ হাজার ২৫৭ জন নিয়োগ পান, যেটি অতীতে হয়নি। এরপর ৩৫ বিসিএস থেকে ২ হাজার, ৩৬ বিসিএস থেকে ১ হাজার ২৮৭ জন, ৩৭ বিসিএস থেকে ১ হাজার ৭৪৩ জন এবং ৩৮ তম বিসিএস থেকে ২ হাজার ৭৫১ জন নন-ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন, যা এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে পিএসসিতে ৪০ তম বিসিএসের নন-ক্যাডারে নিয়োগের জন্য প্রার্থীরা অপেক্ষা করছেন।

দীর্ঘ চার বছরের প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের মার্চে ৪০ তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ৮ হাজার ১৬৬ প্রার্থী নন-ক্যাডারের জন্য অপেক্ষায় আছেন। গত ২ থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত তাঁরা নন-ক্যাডারের জন্য আবেদন করেছেন।

সুপারিশের অপেক্ষায় থাকা এই প্রার্থীরা বলছেন, নন-ক্যাডার নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি বিসিএসে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হতো এবং পরের বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যত চাহিদা আসত, সেই অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু ৪০ তম বিসিএসের নন-ক্যাডার নিয়োগ দেওয়ার আগেই ৪১,৪৩ ও ৪৪ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তির তারিখ অনুযায়ী শূন্য পদ আলাদা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। এমনকি বিজ্ঞপ্তি না হলেও ৪৫ তম বিসিএসের নন-ক্যাডারের পদের চাহিদা চেয়েছে।

প্রার্থীরা বলছেন, এই চিঠির ফলে যেদিন যেই বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি হয়েছে, সেই তারিখ পর্যন্ত যত আবেদন আসবে শুধু ততসংখ্যক পদেই ওই বিসিএস থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। যেহেতু ৪০ তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর দেওয়া হয়েছে, কাজেই ওই তারিখের মধ্যে যেই পদের চাহিদা শুধু সেই পদই ৪০ তম বিসিএসের নন-ক্যাডারের জন্য থাকবে।

বিসিএস ক্যাডার হতে চলে গেল ২০ বছরবিসিএস ক্যাডার হতে চলে গেল ২০ বছর
এই প্রার্থীরা বলছেন, ২০১৮ সালের পর যেহেতু ৩৭ ও ৩৮ তম বিসিএস থেকে নন-ক্যাডারে সুপারিশ করা হয়ে গেছে, কাজেই তাঁদের জন্য খুব বেশি পদ থাকবে না। পিএসসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ৪০ তম এবং পরবর্তী ৪১,৪৩ ও ৪৪ তম বিসিএসের নন-ক্যাডার প্রার্থীদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসবে। এই চার বিসিএসের ৩০-৩৫ হাজার প্রার্থীকে তখন শূন্য হাতে ফিরতে হবে।

একটি বিষয় না বললেই নয়। বিসিএস থেকে নন-ক্যাডারের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার ফলে দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে। পিএসসির পরীক্ষা জটিলতাও কমেছে। কাজেই ৯ম থেকে ১২ তম গ্রেড পর্যন্ত যত বেশিসংখ্যক পদ বিসিএস থেকে নিয়োগ দেওয়া উচিত।

পাশাপাশি বিসিএসের নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা খুব জরুরি। একটা বিসিএসের নিয়োগে চার বছর লেগে যাওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এই যে পিএসসির হাতে ৪১,৪৩ ও ৪৪ তিনটি বিসিএস ঝুলছে, এই দীর্ঘসূত্রতা কমবে কীভাবে?

সরকারি চাকরির আবেদনে বয়স ছাড়সরকারি চাকরির আবেদনে বয়স ছাড়
পিএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন কিন্তু দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন, এক বছরের মধ্যে বিসিএস শেষ করতে চান তিনি। এ জন্য রোডম্যাপ করার কথাও বলেছিলেন। ৪৩ বিসিএস থেকেই তিনি এই পরিকল্পনা শুরুর কথা বলেছিলেন। বাস্তবে কিন্তু এর ছাপ দেখা যাচ্ছে না। করোনা মহামারি একটা কারণ, কিন্তু এখানে পিএসসির অদক্ষতাও আছে। ফলাফল দীর্ঘসূত্রতা।

সামাজিক নিরাপত্তা, ভালো বেতনকাঠামো ও এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে স্বচ্ছ নিয়োগ-প্রক্রিয়ার কারণে সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে লাখো তরুণের। ফলে দেখা যাচ্ছে একেকটি বিসিএসে এখন চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ তরুণ অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু পরীক্ষা, চূড়ান্ত ফল, পুলিশ যাচাই, যোগদান—সব মিলিয়ে নিয়োগে লেগে যাচ্ছে তিন থেকে চার বছর। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে লেখাপড়া শেষে পরীক্ষা ও চাকরি পেতেই তারুণ্যের গুরুত্বপূর্ণ সময় চলে যাচ্ছে জীবন থেকে।

আগামীর জীবনআগামীর জীবন
উন্নত দেশ এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশেই সরকারি নিয়োগে এত সময় লাগে না। প্রতিবেশী ভারতের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা নেয় ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন। প্রতিবছরের জুনে তারা প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেয় এবং আগস্টে ফল প্রকাশ করে। এরপর অক্টোবরে লিখিত পরীক্ষা ও জানুয়ারিতে ফল প্রকাশ হয়। উত্তীর্ণদের মার্চে মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে মে মাসে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয়। যাঁরা চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন, সেপ্টেম্বর থেকেই তাঁদের চাকরির মূল প্রশিক্ষণ শুরু হয়। অথচ বাংলাদেশে একেকটা বিসিএসের প্রক্রিয়া শেষ করতেই চার বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা কমানো জরুরি।

শরিফুল হাসান, কলামিস্ট