বিগো ও লাইকিতে মাসে শতকোটি টাকা পাচার

প্রকাশিত: ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ, সোম, ১৪ জুন ২১

নিউজ ডেস্ক।।

লাইভ ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ ‘লাইকি’ ও ‘বিগো লাইভ’র মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশ থেকে প্রতি মাসে শতকোটি টাকা পাচার হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি জামিল আহমেদ। অর্থপাচারের অভিযোগে এক বিদেশী নাগরিকসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডির সাইবার পুলিশ। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেনÑ মোস্তফা সাইফ রেজা (২৬), মো: আরিফ হোসেন (২৭), এস এম নাজমুল হক (২৭), আসমা উল হুসনা সেজুতী (২৮) ও অজ্ঞাত এক বিদেশী নাগরিক।

বিভিন্ন অশ্লীলতায় ভর করে প্রতি মাসে শতকোটি টাকা পাচার করছে এই চক্রটি। এর সাথে আরো অনেকেই জড়িত রয়েছে, যাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে সিআইডি জানিয়েছে। পুলিশ জানায়, বিগো লাইভ ও লাইকিতে সাধারণত দেশের উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণী ও প্রবাসী বাংলাদেশীরা ভিডিও স্ট্রিমিং করে।

যেভাবে অর্থপাচার : সাইবার পুলিশ জানায়, গ্রেফতার বিদেশী নাগরিক বিগো লাইভ ও লাইকির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশী নাগরিক মোস্তফা সাইফ রেজা বিগোর বাংলাদেশী অ্যাডমিন। আরিফ হোসেন বাংলাদেশে বিভিন্ন মেয়েদের মাসিক বেতনে চাকরি দিয়ে বিগো লাইভের সাথে যুক্ত করতেন। এস এম নাজমুল হক ভার্চুয়াল মুদ্রা ডায়মন্ড বিক্রির অন্যতম প্রধান বাংলাদেশী এজেন্ট এবং আসমা উল হুসনা সেজুতী বিগো লাইভের প্রধান অ্যাডমিন। অ্যাডমিনরা মাসে এক লাখ টাকা করে বেতন পেতেন।

বিগো লাইভ অ্যাপে দুই ধরনের আইডি রয়েছে। একটি ব্রডকাস্টার আইডি ও অপরটি সাপোর্টার আইডি বা সেন্ডার আইডি। ব্রডকাস্টার আইডি ব্যবহার করে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা ভিডিও লাইভ স্ট্রিম করে। এই ভিডিও লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে কথিত বিনোদনের আড়ালে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়া হতো। এ ছাড়াও সাপোর্টার আইডি বা সেন্ডার আইডির মাধ্যমে যারা ভিডিও স্ট্রিমিং করত, বিনিময়ে তাদের ডিজিটাল কয়েনসদৃশ ডায়মন্ড গিফট করা হতো। পরবর্তীতে এই ডায়মন্ড টাকায় রূপান্তরের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করত। তাদের টার্গেট মূলত দেশের যুব সমাজ এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা। লাইভ স্ট্রিমিংয়ে তাদের সাথে আড্ডা দেয়ার প্রলোভনে অ্যাপে ঢোকেন সাধারণ ব্যবহারকারীরা। তার জন্য ডায়মন্ড নামে একটি ভার্চুয়াল মুদ্রা কিনতে হয় ব্যবহারকারীদের। সাধারণত বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে এই ডায়মন্ড কেনা যায়। সেই মুদ্রা উপহার হিসেবে দিয়ে আড্ডায় যুক্ত হতে পারেন ব্যবহারকারীরা। যে যত বেশি ডায়মন্ড উপহার পান, লাইভে তিনি তত বেশি অশ্লীলতা করেন।

সাইবার পুলিশের ডিআইজি জামিল আহমেদ বলেন, ‘ডায়মন্ড সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে পৌঁছে দেয়ার জন্য রয়েছে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন এজেন্সি। এরকম একাধিক এজেন্ট বাংলাদেশে রয়েছে। এসব এজেন্সির প্রত্যেকের একাধিক পেমেন্ট গেটওয়ে রয়েছে। সাধারণত ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব এজেন্সির বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। সাধারণ ব্যবহারকারীরা এজেন্সির পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ প্রদান করে ডায়মন্ড কেনেন।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশী লক্ষাধিক অ্যাপ ব্যবহারকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশী অনলাইন ব্যাংকিং, হুন্ডি, ভার্চুয়াল মুদ্রা ও ব্যাংকের মাধ্যমে ডায়মন্ড কিনছেন। বাংলাদেশী এজেন্সিগুলো ডায়মন্ড কিনে আনে বিদেশী অ্যাডমিনদের কাছ থেকে। এসব এজেন্সি বিভিন্ন অবৈধ মাধ্যম ব্যবহার করে বিদেশে অর্থপাচার করে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।’

নেপথ্যে যারা : পুলিশ জানায়, গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে আরো অনেকের নাম এসেছে এবং তাদের বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের অ্যাকাউন্টে গত এক বছরে প্রায় শতকোটি টাকারও বেশি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। আটক নাজমুলের কাছ থেকে ২টি মোবাইল ফোন, ২টি ল্যাপটপ, ১টি প্রাইভেট কার, বিভিন্ন ব্যাংকের ৭টি ক্রেডিট কার্ড, বিভিন্ন ব্যাংকের ৬টি চেক বই, নগদ ৫০ হাজার ৪৬০ টাকা উদ্ধার করা হয়। আরিফ হোসেনের কাছ থেকে ২টি মোবাইল ফোন, ১টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। মোস্তফা সাইফ রেজা ও আসমা উল হুসনা সেজুতীর কাছ থেকে ৪টি মোবাইল ফোন ও ২টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়।

ডায়মন্ড কিভাবে কেনা হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি জামিল আহমেদ বলেন, ‘বিগো লাইভ থেকে মেসেজ দিয়ে অথবা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে ডায়মন্ড কেনা সম্ভব।’ গ্রেফতারকৃত এস এম নাজমুল হক মূলত বিদেশী এজেন্সির মাধ্যমে ডায়মন্ড কেনাবেচা করতেন।’
সিআইডি এসব অ্যাপ বন্ধের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেবে কি নাÑএ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘লাইকি ও বিগো লাইভ অ্যাপ বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আমরা নিয়ন্ত্রণকারীদের এসব বিষয়ে নজরে আনব। এ ছাড়াও আমরা এসব অ্যাপ সার্বক্ষণিক নজরদারি করছি। যারা অশ্লীল ভিডিও দিচ্ছেন, তাদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এসব অ্যাপের অফিস আমাদের দেশে খোলার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলব।’ এক প্রশ্নের জবাবে সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে আপাতত ব্যাংকগুলোর নাম বলছি না। তবে কোন কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা লেনদেন হয়েছে, তা আমরা তদন্ত করছি।’

বিগোর বিবৃতি : এ দিকে বিগো টেকনোলজি (বিগো) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণ করে। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো ব্যক্তির দ্বারা অপরাধের ক্ষেত্রেও জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে; এ ক্ষেত্রে সে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কোনো এজেন্সি পার্টনার কি না তা নির্বিশেষে এ নীতি অনুসরণ করা হয়। যেকোনো অপরাধমূলক আচরণ মোকাবেলায় আমাদের এ খাতের শীর্ষ প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি কঠোর নীতিমালা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা কোনো পক্ষপাত করি না, কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা সমর্থন করি নাÑ যার বা যাদের অপরাধমূলক কোনো কাজে বিগোর নাম ব্যবহারের অসদিচ্ছা রয়েছে। আমরা এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করছি এবং যেভাবে সম্ভব বা প্রয়োজন এ ক্ষেত্রে আমরা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে কাজ করব। আমাদের ব্যবহারকারীদের জন্য একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরিতে আমরা আগের মতোই প্রতিশ্র“তিবদ্ধ এবং ভবিষ্যতেও আমরা একইভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের জন্য যোগাযোগের যে সুযোগ তৈরি করেছে, এ জন্য আমরা সম্মানিত বোধ করছি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে বিগোর কার্যক্রম রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য এ অঞ্চলে আমাদের ব্যবহারকারীদের জন্য ইতিবাচক সব সুযোগ তৈরি করা এবং আমরা যে দেশেই কার্যক্রম পরিচালনা করি না কেন, সেখানকার আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সব আইন ও বিধি যথাযথভাবে মেনে চলি। আঞ্চলিক ও জাতীয় আইন এবং মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে আমরা আইনপ্রয়োগকারী সব সংস্থা ও সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব এবং একই সাথে নতুন প্রজন্মের ব্যবহারকারীদের জন্য ইতিবাচক সব সুযোগ তৈরিতে নিবিড়ভাবে কাজ করব।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.