এরই মধ্যে দলটির দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী একই দিন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ২০ দলীয় জোটের অন্য দলগুলো একইভাবে বিএনপির কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়েছে। এ ছাড়া সাত দলের সমন্বয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ, গণফোরামের একাংশসহ আরও বেশ কয়েকটি দল যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ব্যাপারে আজ সকাল ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলগুলোর অভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণার কথা রয়েছে। যদিও এর আগেই যুগপৎ আন্দোলন বিষয়ে সব পক্ষ একমত হয়েছে।

যুগপৎ আন্দোলনের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব দলকে নিয়ে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ কমিটিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ছাড়াও থাকবেন গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতারা। এর বাইরে অন্য দলের নেতারাও থাকবেন। এই লিয়াজোঁ কমিটিই দেবে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি; করবেন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন। এ ছাড়া মিডিয়া সেল, প্রচার সেল, আইনি সহায়তা সেলসহ বেশ কয়েকটি সেল থাকবে এই কমিটির অধীনে।

৩৩ দল কারা: যুগপৎ আন্দোলনে গণতন্ত্র মঞ্চের সাত দলের মধ্যে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, কমরেড সাইফুল হকের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলন, ড. রেজা কিবরিয়া ও সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের গণ অধিকার পরিষদ, শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন রয়েছে।

২০ দলীয় জোটের অন্য দলগুলো হলো- কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, শাহাদাত হোসেন সেলিমের নেতৃত্বাধীন বিএলডিপি, ড. ফরিদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাংলাদেশ জাতীয় দল, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, জাগপা, ন্যাশনাল পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী), সাম্যবাদী দল, ডেমোক্রেটিক লীগ, ইসলামিক পার্টি, এনডিপি, পিপলস লীগ, মাইনরিটি পার্টি, জাগপা (অপরাংশ) রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ২০ দলীয় জোট থেকে এক সময় বেরিয়ে যাওয়া ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন গণফোরাম।

জামায়াতেরও একই কর্মসূচি:

গত শনিবার বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণার দিনে জামায়াতেরও একই কর্মসূচি ঘোষণা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই দিন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ভার্চুয়ালি দলের ১০ দফা ঘোষণা করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বিএনপির ১০ দফার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তি, দলীয় কার্যালয় খুলে দেওয়া, নিবন্ধন ফিরিয়ে দেওয়া এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো কয়েকটি দাবি যোগ করা হয়েছে। সরকারের পদত্যাগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনসহ বাকি দাবিগুলোয় বিএনপির সঙ্গে পুরোপুরি মিল রাখা হয়েছে।

স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটির সঙ্গে জোট করায় দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে বিএনপি। এ পরিপ্রেক্ষিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী জামায়াতের সঙ্গে দৃশ্যমান কোনো সম্পর্ক রাখেনি দলটি। এমনকি ২০-দলীয় জোটের ব্যানারে কোনো কর্মসূচিও পালন করা হয়নি। সঙ্গে রাখা-না রাখা নিয়ে প্রায়ই তিক্ততার সৃষ্টি হলেও প্রকাশ্যে জোট ভাঙেনি কোনো পক্ষই। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কার্যক্রমে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রকাশ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলেও, জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে কেউ মুখ খোলেনি। তবে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে একই দিন অভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করায় বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক আবারও সামনে চলে আসে।

জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বিষয়টি সব সময় অস্বীকার করেছে বিএনপি। তবে দলটির শীর্ষ নেতারা বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে যারাই শরিক হবেন, তাদেরই সাধুবাদ জানানো হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সমকালকে জানান, জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের কোনো আলোচনা কিংবা বৈঠক হয়নি। জামায়াত স্বতন্ত্রভাবে তাদের নিজস্ব কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এটা জামায়াতের দলীয় সিদ্ধান্ত। এখানে কেন বিএনপিকে টেনে আনা হচ্ছে, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।

তবে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, জোটবদ্ধ নয়; যুগপৎ আন্দোলন হবে। ১৯৯০ সালে তিন জোটের সঙ্গে স্বৈরাচারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন করেছে জামায়াত। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করে জামায়াত। এবারও একই ধাঁচে আন্দোলন হবে। তিনি বলেন, একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নিজ নিজ ব্যানারে গণমিছিল করবে বিএনপি ও জামায়াত। কেউ কারও কর্মসূচিতে অংশ নেবে না। বিএনপির কর্মসূচিতে জামায়াতের কেউ প্রতিনিধিত্ব করবে না।

বিএনপির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জামায়াতের কর্মসূচি ঘোষণায় খুব বেশি সমস্যা মনে করছেন না গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা। তাঁরা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই। জামায়াতকে নিয়ে কর্মসূচি পালনের কথা তাঁরা কখনও বলেননি। তবে জামায়াত যদি তাদের ঘোষিত কর্মসূচির মতো কর্মসূচি নেয় তাহলে তো নিষেধ করা যাবে না। এটা তাদের দলীয় ব্যাপার। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক বিষয়ে তাঁরা বলেন, এটাও বিএনপির একান্ত বিষয়।

জামায়াত ইস্যুতে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না জানান, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে তাঁরা সাধুবাদ জানাবেন। জামায়াতও যদি দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে তাদের মতো করে রাজপথে থাকে, তাতে তিনি দোষের কিছু দেখছেন না।

যেভাবে শুরু:এ বছরের শুরুতে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের জন্য ‘জাতীয় ঐক্য’ ঘোষণা করে বিএনপি। তাদের এ প্রক্রিয়ায় সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দু’দফায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সংলাপ হয়। এর মধ্যে ২০ দলীয় জোটের আওতাধীন ২২ দল, সাতদলীয় জোটের শরিক দল, গণফোরামসহ বাম ও ইসলামী বেশ কয়েকটি দল রয়েছে। এসব দলের সঙ্গে বৈঠকে সরকারবিরোধী ‘যুগপৎ’ আন্দোলনের বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেন। একই সঙ্গে ক্ষমতা বদলের রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা এবং আন্দোলনের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করে দলগুলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র সংস্কার ও আন্দোলনের জন্য ২৭ দফা ও ১০ দফা কর্মসূচি নির্দিষ্ট করে বিএনপি। এর সঙ্গে একমত পোষণ করে গণতন্ত্র মঞ্চ ১৪ দফা রূপরেখা প্রস্তুত করে, যা খুব শিগগির তারা ঘোষণা করবে বলে জোটের নেতারা জানিয়েছেন। গণতন্ত্র মঞ্চ ছাড়াও ২০-দলীয় জোটের নেতারা বিএনপির ঘোষিত রূপরেখার সঙ্গে একমত পোষণ করে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।

এর বাইরে আরও কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করছে বিএনপি। এর মধ্যে বাম ঘরানা এবং ইসলামী দলও রয়েছে। এসব দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও হয়েছে। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে ইসলামী দলগুলোর অনেককেই যুগপৎ আন্দোলনে পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা। বিশেষ করে হেফাজত ঘনিষ্ঠ দলগুলোর সঙ্গে বিএনপি নেতারা বেশি যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।