বাবার চলে যাওয়ার এক যুগ

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে ১ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ আজকের দিনে হঠাৎ বাবা চলে যায় না ফেরার দেশে। লোকমুখে শুনি মানুষ মারা যাবার ৪০ দিন আগে নাকি কিছু সিমটম দেখা যায় কিন্ত কোন সিমটমই তো পেলাম না। সুস্থ মানুষ রাত ১০ টা ৩০ বাজে । আমি আর বাবা গল্প করছি । হঠাৎ বাবা বললেন আমার যেন একটু খারাপ লাগছে আমি বাসার নিচ থেকে হেঁটে আসি। আমি তখন ধানমন্ডি থাকতাম ।

বাবা নিচে হাঁটতে গেলেন । কিছুক্ষণ পর বাসায় আসলেন । আমি বললাম কেমন লাগছে । বাবা বললেন একটু ভালো লাগছে। কিছুক্ষণ পর বাথরুমে গেলেন । বাথরুম থেকে ফিরে এসে বললেন খারাপ লাগছে । আমি ততক্ষনে   রেডি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাবা বললেন তেমন সমস্যা নেই একটু পরে যায়। আমি আবারো বললাম   বাবা চলো হাসপাতালে যায়। একে বারে কাছে ৩/৪ মিনিট লাগবে। বাবা যেতে রাজী হলন না। বাবা বললেন মাঝে মাঝে এমন হয়। হয়ত গ্যাসের সমস্যা ।  আমি গ্যাসের ট্যাবলেট খেয়েছি সমস্যা নেই। সুস্থ মানুষ কথা বলতে বলতে বমি করলেন ।

আমি বাবার কথা আর শুনলাম না জোর করে বাংলাদেশ মেডিক্যালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আমার বাসা থেকে ৪/৫ মিনিটের রাস্তা বাংলাদেশ মেডিক্যাল। মেডিক্যালে যেতে যেতে কথা বলছি। একেবারে মেডিক্যালের কাছে বাবা বমি করলেন আর সঙ্গে সঙ্গে রিকশায় আমার হাতের উপর নোয়ায়ে পড়লেন। মেডিক্যালে ইমাজেন্সিতে নিলাম। বললাম আইসিইউতে নিন। ডাক্তার বললো একটু পরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার বললেন সরি।

একেবারেই আকস্মিক ছিল প্রয়াণ। সুস্থ মানুষ বয়স তখন ৫৭/৫৮। রাত ১০টা ৩০ বাজে বললো খারাপ লাগছে ।  আর ১২টা ০৫  মিনিটে প্রয়াণ। সাড়ে বারোটায় রওয়ানা দিলাম ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় । বাসায় পৌছালাম ভোর ৫ টার সময়। সকাল ৯ টায় বাবাকে রেখে আসলাম চিরদিনের মতো। চিকিৎসা করানোর সুযোগটিও পাইনি। এই যন্ত্রণা হয়তো সারাজীবনই বয়ে বেড়াবে আমাকে। আব্বা প্রয়াত-এটাই হয়তো সত্য।

বাবাহীন একজন ছেলের জীবন যে কতটা বিয়োগান্ত হয়, তা হয়তো যাদের বাবা বেঁচে আছেন তারা কখনোই বুঝতে পারবে না। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় সত্যি আমি বড়ই একা। একটু ভালোবাসা দেওয়ার, সান্ত্বনা দিয়ে সামনে চলার প্রেরণা জোগানোর মানুষটি আজ বেঁচে নেই। বাবাকে ছাড়া কতটা অসহায় তা কল্পনাতীত। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। কেটে যাচ্ছে একেকটি দিন, মাস ও বছর ।

একেকটা দিন বড় একা লাগে, বাবার স্পর্শটুকু, বাবার সেই মায়াভরা ডাক আজো মাঝে মাঝে নিজেকে সারারাত জাগিয়ে রাখে। কেটে যাচ্ছে একেকটি দিন, মাস আর একেকটি বছর ঠিকই- কিন্তু আজও বাবার অনেকগুলো স্মৃতি, অনেক গুলো কথা, যা ভুলতে পারিনা, ভোলা যায়না।

 বাবা তুমি আমাদের সকলকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছো। তুমি বেঁচে থাকতে তোমার গুরুত্ব আমরা বুঝিনি। আজ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি তোমার অনুপস্থিতি। তোমার চলে যাওয়া আমাদের জীবনে বিশেষ করে আমার জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি।

১৯৮৬ সালের কথা আমি ৫ম শ্রেণি পাস করে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হবো। এলাকায় স্কুলে ভর্তি না করে ভর্তি করলেন ৪/৫ কিলোমিটার দুরে । অনেক নামীদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বাবার যে কথাটা আজো মনে পড়ে । বাবা স্কুলে ভর্তি করার পরে ঐ বাজারের একটা দোকানে আমাকে নিয়ে গেলেন এবং দোকানদারকে বললেন দাদা আমার ছেলেকে এই স্কুলে ভর্তি  করলাম। যখন যা চাই তা দিবেন এমনকি টাকা চাইলেও টাকা দিবেন আমি আপনাকে পরে  দিবো। আমি বাবা হয়েছি কিন্তু আমি কতটা পেরেছি আমার বাবার মত আমার সন্তানকে এতটা সুযোগ-সুবিধা দিতে।

আরেকটা স্মৃতি, আমি সবেমাত্র অনার্স পাস করেছি। গ্রামের একটা কলেজে গণিতের প্রভাষক প্রয়োজন । কলেজ কতৃপক্ষ আসলেন আমার বাবার কাছে চাকরি দিবে বলে, বাবা বললেন ওর লেখাপড়া শেষ হোক তারপর চাকরি করবে।

আমার বাবা সব সময় সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। বলতেন ভালো মানুষ হতে হবে। জানিনা ভালো মানুষ হতে পেরেছি কিনা ? আরেকটি কথা মনে পড়ে, বাবা বলতেন- তুমি যদি চুরি করো তাহলে তোমার মত মানুষের সাথে চুরি করবে। সবসময় বাবা তোমাকে মনে করি এবং তোমার আদর্শ ধরে রাখার চেষ্টা করি। বাবা বলতেন পিতা না হলে পিতার মর্যাদা বুঝা যায় না।

আমি এখন পিতা হয়েছি- এখন বুঝতে পারি পিতার মর্যাদা। আমার বাবা ছিলেন একজন আদর্শ বাবা। বাবার আদর্শ লালন করে ভালো মানুষ হতে চেয়েছি। জানিনা হয়েছি কিনা? কষ্ট লাগে যখন দেখি সন্তান তার বাবা মাকে একা রেখে চলে যায়। কিন্তু বাবা কখনও তার সন্তানকে ফেলে যাইনা। এই পৃথিবীতে সবাই চাই সে অন্যের চেয়ে বড় হতে, কিন্তু বাবা চাই তাঁর সন্তান বাবার চেয়ে বড় হোক।

হে আমার রব সন্তান হিসেবে তোমার কাছে আকুতি তোমার মেহমান হিসেবে আমার বাবা সহ পৃথিবীর সকল বাবা -মাকে কবুল করে নিও। আর বার বার শতবার বলি-রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ঈয়ানী সাগিরা।

লেখক: শিক্ষক, লেখক ও গবেষক ।