বর্ধিত ফি না কমালে গাড়িভাড়া বৃদ্ধির চাপ

নিউজ ডেস্ক।।

সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ জারি হওয়ার পর গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ৭৫টি পরিষেবার ফি বেড়েছে। এতে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ির পাশাপাশি খরচ বাড়ছে গণপরিবহনের। এ নিয়ে বাস মালিকরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া না জানালেও আপত্তি তুলেছে ট্রাক মালিক সমিতি। এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল রবিবার দুপুরে বিআরটিএর কার্যালয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।

সূত্র বলছে, বৈঠক থেকে বর্ধিত ফি কমানোর প্রস্তাব উঠবে। কিন্তু ফি যেহেতু বিধিমালার ওপর নির্ভর করে বেড়েছে, তাই চাইলেই ফি কমানো সম্ভব হবে না। কমাতে হলে নতুন জারি হওয়া বিধিমালা সংশোধন করতে হবে। ফি কমানো না হলে বাস মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর দাবি তুলবেন।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, নতুন বিধিমালার পরই সংশ্লিষ্ট খাতে খরচ বেড়েছে। যেকোনো কিছু বাড়লে প্রাথমিকভাবে একটা প্রতিক্রিয়া হবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে এই ফি তো বাড়াতেই হতো। আস্তে আস্তে বর্ধিত খরচ অভ্যাস হয়ে যাবে।

ফি বেড়েছে ২৩৩ শতাংশ পর্যন্ত : গত ২৮ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ কার্যকর করা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদসহ ৭৫টি পরিষেবার ফি নতুন হারে আদায় শুরু করেছে বিআরটিএ।

সড়ক পরিবহন বিধিমালা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নতুন করে সর্বোচ্চ ২৩৩ শতাংশ পর্যন্ত ফি বেড়েছে। এ ছাড়া বিআরটিএ মোটর ওয়ার্কশপের নিবন্ধন ও কন্ডাক্টরদের লাইসেন্সসহ ৯টি পরিষেবার ওপর নতুন করে ফি বাড়ানো হয়েছে। ১০০ সিসি পর্যন্ত তিন চাকার পরিবহনের নিবন্ধন ফি ৬৩৫ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার টাকা হয়েছে। ১০০ সিসির চেয়ে বেশি সক্ষমতার সব তিন চাকার পরিবহনের ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি এক হাজার ১৫০ থেকে বেড়ে এক হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে।

এ ছাড়া ১০০ সিসি সক্ষমতার মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি দুই হাজার টাকা এবং ১০০ সিসির চেয়ে বেশি সক্ষমতার মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি তিন হাজার টাকা, যা অপরিবর্তিত থাকবে। তা ছাড়া শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্মিত বিশেষ পরিবহনের নিবন্ধন ফিও ২৫ টাকা থেকে বাড়ানো হয়নি।

এদিকে ড্রাইভিং স্কুলগুলোকে লাইসেন্সের জন্য ১৫ হাজারের পরিবর্তে ২৩ হাজার টাকা দিতে হবে। আর প্রশিক্ষকের লাইসেন্স ফি ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে দুই হাজার টাকা।

বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, নতুন করে যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের বর্ধিত ফি দিতে হবে। ২৮ ডিসেম্বরের আগে যত আবেদন ছিল তাঁদের কাছ থেকে আগের ফি নেওয়া হবে। এখানে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বর্ধিত ফি প্রত্যাহার দাবি : বর্ধিত ফির কারণে গণপরিবহনের খরচ বেড়ে যাবে। এমন অবস্থায় বর্ধিত ফি প্রত্যাহার চেয়েছে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি। সম্প্রতি সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির এক জরুরি বর্ধিত ফি প্রত্যাহার করার দাবি তোলা হয়। সমিতির সভাপতি মো. তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এবং আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় এই খাত বিপর্যয়কর অবস্থায় রয়েছে। এ সময় গাড়ির ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ফি ৩৪৫-এর স্থলে ৫৭৫ টাকা, ফিটনেস এক হাজার ৬০৫ টাকার স্থলে দুই হাজার ৬৯৭ টাকাসহ যাবতীয় ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন আইনের ৫৩ ধারায় বলা হচ্ছে, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা তহবিল নামে একটি তহবিল গঠন করা হবে। এই তহবিল পরিচালনা করতে প্রতিটি মোটরযানের বিপরীতে মালিকদের কাছ থেকে বার্ষিক বা এককালীন চাঁদা আদায় করা হবে। মোটরযান মালিক বা প্রতিষ্ঠান তহবিলে এই চাঁদা দিতে বাধ্য। সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২-এর ‘দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা এবং বীমা’ শীর্ষক অষ্টম অধ্যায়ে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। যান মালিকদের চাঁদা দিয়ে আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন করতে বলা হয়েছে। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান মালিকরা বার্ষিক এক হাজার ৫০০ টাকা চাঁদা দেবেন। মিনিবাস, পিকআপ ৭৫০ টাকা, কার-মাইক্রোবাস ৫০০ টাকা এবং তিন চাকার যানের মালিকরা ৩০০ টাকা চাঁদা দেবেন। এ ছাড়া মোটরসাইকেল মালিকরা এককালীন এক হাজার টাকা চাঁদা দেবেন।

এসব কারণে বাসের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ কালের কণ্ঠকে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘বিধিমালা এখনো স্টাডি করছি। আমি এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রবিবারের বৈঠকে আমরা বর্ধিত ফি কমাতে বলব। যদি না কমানো হয়, তাহলে ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব তোলা হবে। ভাড়া না বাড়লে খরচ উঠবে না।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে বাস মালিকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি। তবে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছে। বিধিমালার আরো অনেক কিছু নিয়ে রবিবারের বৈঠকে আলোচনা হবে। কিছু তো কথা উঠবে—এটাই স্বাভাবিক।’

পরীক্ষার দিনই আঙুলের ছাপ : এদিকে চালকের লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষার দিনই আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিআরটিএ। আগামী মঙ্গলবার থেকে রাজধানীর সব বিআরটিএ সার্কেল অফিসে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগে ব্যাবহারিক ও লিখিত পরীক্ষা একই দিনে হতো। পরে সেই পরীক্ষায় পাস করলে আঙুলের ছাপ নেওয়ার জন্য নতুন তারিখ দেওয়া হতো। এখন নতুন পদ্ধতিতে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমবে, সময় বাঁচবে।

কিছুদিন আগেও লাইসেন্স ছাপানোর জন্য কার্ডের সংকট ছিল। সম্প্রতি দেশে দুই লাখ কার্ড আমদানি করা হয়েছে। বর্তমানে পুরনো লাইসেন্সের জট নেই জানিয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার আরো বলেন, পুরনো সব কার্ড বহু আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। নতুন যাঁরা আবেদন করছেন তাঁদেরও সময় মতো কার্ড দেওয়া হচ্ছে।