বঙ্গবন্ধু ও ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের গর্ব

প্রকাশিত: ১২:০২ অপরাহ্ণ, শনি, ৬ মার্চ ২১

 মোঃ হায়দার আলী।।

গত সপ্তাহে মরণবাঁধ ফারাক্কার কারণে পদ্মায় পানির আকাল, এর কিছুদিন পূর্বে ধর্ষনের শাস্তি মৃত্যু দন্ড, একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।। এর উপরে একটি কলাম লিখে ছিলাম সেগুলি দি বাংলাদেশ টুডে, এফএনএস, নতুনবাজার২৪ডটকম, শিক্ষাবর্তাসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছিল, এ সপ্তাহে কি বিষয়ে লিখবো তাই ভাবছিল এমন সময় পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া আমার ছোট ছেলে আজিজ আরিফিন জীম বললো বাবা আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাকে ডেকে ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকতে যেতে হবে গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদের হলরুমে কিন্তু কেন প্রশ্ন করলাম ?

সে বললো তোমার মোবাইল দাও নেট আছে তো? উত্তরে বললাম আছে। সে পাল্টা প্রশ্ন করলো গোটা বিশ্বে সাড়া জাগানো ভাষণ, শ্রেষ্ঠ ভাষন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ Google.com দেখি সে ভাষণটি আমার ছবি আঁকতে সহায়ক হবে। তথ্য উপাত্ত দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করলাম তাকে বুঝানোর জন্য। আর তথ্য উপাত্ত নিয়ে আল্লাহকে স্মরন করে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের উপর লিখা শুরু করলাম।

আট কোটি বাঙালি ওই মুহূর্তে তাদের অন্তরে যে আবেগ ও স্বপ্ন ধারণ করছিল, তারই প্রকাশ ঘটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শেষ বাক্যে। মুক্তি ও স্বাধীনতাসংগ্রামের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে বঙ্গ বন্ধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ভাইয়েরা আমার; আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।

আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কি অন্যায় করেছিলাম, নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলী বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করবো এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলবো, এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস।

তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস; বাঙলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে দশ বৎসর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ছয়দফা আন্দোলনে ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পর যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন। আমরা মেনে নিলাম।

তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা এসেম্বলীতে বসবো। আমি বললাম, এসেম্বলীর মধ্যে আলোচনা করবো; এমনকি আমি এ পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।

জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে, আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরও আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করলাম, আপনারা আসুন বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসেন, তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলী। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হবে। যদি কেউ এসেম্বলীতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচী পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলী চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলী বন্ধ করে দেওয়া হলো।

ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসাবে এসেম্বলী ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো। দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্দুকের মুখে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।

আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।

কি পেলাম আমরা? যে আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী আর্ত মানুষের বিরুদ্ধে, তার বুকের উপর হচ্ছে গুলী। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু। আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। টেলিফোনে আমার সঙ্গে তার কথা হয়। তাকে আমি বলেছিলাম, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলী করা হয়েছে, কি করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ১০ই তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকব।

আমি বলেছি, কিসের বৈঠক বসবে, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার উপরে দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন।

ভাইয়েরা আমার,
২৫ তারিখে এসেম্বলী কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি যে, ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। এসেম্বলী কল করেছে। আমার দাবি মানতে হবে: প্রথম, সামরিক আইন মার্শাল ল’ উইথ্ড্র করতে হবে, সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে, আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো, আমরা এসেম্বলীতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেম্বলীতে বসতে আমরা পারি না।
আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সে জন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে; শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমিগভর্ণমেণ্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না।

২৮ তারিখে কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন। এর পরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল,- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলী চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।

আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। আর এই সাতদিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়ে দেবেন।

সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবে না। মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান বাঙালি অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন রেডিও টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনেন, তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র নিবার পারে।

কিন্তু পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ববাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে নিউজ পাঠাতে চালাবেন। কিন্তু যদি এদেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝে শুনে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্ত্তত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। জয় বাংলা।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম- তার এই বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বোঝা গিয়েছিল পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। সেদিন তার ডাকেই রাতারাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিকামী সাড়ে সাত কোটি বঙ্গসন্তান। একাত্তরের অগ্নিঝরা ৭ মার্চ দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে গর্বের ও গৌরবের। তাই যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন তার এ ভাষণ মানুষের মণিকোঠায় থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শাহজাহান সিরাজ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের রাজসাক্ষী। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত উত্তাল জনতার আবেগ-অনুভূতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।

শাহজান সিরাজ বলেন, ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভা ডাকি। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় আমাদের অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেন। একই সঙ্গে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান। আমরা ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভার প্রস্তুতি নিতে থাকি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ছিল রোববার।

বাঙালি জাতীর জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। পূর্বনির্ধারিত এ জনসভায় ভোর না হতেই সারা দেশ থেকে লাখ লাখ লোক রেসকোর্সের উদ্দেশে ঢাকা আসতে থাকে। বাঙালি জাতি সেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুক্তিকামী মানুষ তাদের নেতার মুখে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা শোনার জন্য এসেছিলেন। দেশের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে করণীয় কী, তা জানতে অধীর আগ্রহে ছিলেন মুক্তিকামী জনতা। তাদের দেহ ভঙ্গিমা দেখে মনে হয়েছিল তারা ঘর থেকে বের হয়েছে দেশ স্বাধীন করে বাড়ি ফিরবেন- এমন প্রত্যাশা নিয়ে।

তাদের মুখে নানা ধরনের স্বাধীনতার পক্ষের স্লোগান। এক হাতে গাঢ় সবুজ জমিনের মধ্যখানে লাল সূর্য এবং তার মধ্যখানে সোনালি মানচিত্রখচিত পতাকা এবং অন্য হাতে বাঁশের লাঠি। বঙ্গবন্ধুর সভাস্থলে আসতে দেরি হল। তিনি বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে ১০ লক্ষাধিক জনতার সম্মুখে ঐতিহাসিক সভামঞ্চে উঠলেন। তখন উত্তাল জনতার মুহুর্মুহু স্লোগানে ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে যায়। সর্বকালের সর্ববৃহৎ এই জনসভায় বঙ্গবন্ধু ১৯ মিনিটের ভাষণ দিলেন। সেই ভাষণে সারা দেশের মানুষের জন্য একটা সুনির্দিষ্ট বার্তা তিনি দিলেন। ঐতিহাসিক এ ভাষণটি দীর্ঘ না হলে সবদিক থেকেই তা ছিল পরিপূর্ণ।

ওইদিন তিনি তার বক্তৃতায় ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান এবং যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- তার এই বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বোঝা গিয়েছিল মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে এ ভাষণ প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন এ ভাষণ মানুষের মনের মণিকোঠায় থাকবে। সামরিক জান্তাশাসিত দেশ না হয়ে পাকিস্তান যদি হতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, তাহলে একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থাকতেন তার প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা।

একটি অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তিনি ৭ মার্চ স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় যে ভাষণ দেন, সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি এখন অনেকেরই প্রায় মুখস্থ। সে দিন তাঁর ওই ভাষণ দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। কোন পরিস্থিতিতে তিনি ওই ভাষণ দিয়েছিলেন, তা না জানলে বর্তমান প্রজন্মের মানুষের কাছে পাকিস্তান রাষ্ট্র, তার শাসকশ্রেণির চরিত্র এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিটি পরিষ্কার হবে না। যেকোনো মানুষের কাছে বিস্ময়কর মনে হবে, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ২৩ বছরের মধ্যে কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টি লাভ করে।

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ছিল ৩০০ আসনবিশিষ্ট। পশ্চিম পাকিস্তানে ৮৩ আসন পেয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। ওই নির্বাচন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার প্রতি জনগণের রায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপিপি, কাইয়ুম খানের মুসলিম লীগ প্রভৃতি চক্র গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতিনীতিতে অবিচল থাকেন। ৩ জানুয়ারি ১৯৭১, তিনি তাঁর দলের জনপ্রতিনিধিদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় শপথ গ্রহণ পরিচালনা করেন। ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা এবং জনগণের রায়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ পাঠ করান। শাসকগোষ্ঠীর চলমান ষড়যন্ত্রের মধ্যেই ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো সংবাদ সম্মেলন করে জানান, তিনি ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করবেন না।

তিনি অধিবেশন ‘বয়কট’ করবেন এই জন্য যে, ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হলে পাকিস্তানের স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। তা ছাড়া ঢাকায় এলে তাঁর দলের সদস্যরা জিম্মি হয়ে পড়বেন। এসব ছিল তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি ও ষড়যন্ত্রের অংশ। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া হঠাৎ তাঁর মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেন। পিপলস পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা দাবি করেন, তাঁদের দলের চাপেই প্রেসিডেন্ট তাঁর মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেছেন।

এসব আলামত দেখে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এর মধ্যে ভুট্টো করাচিতে সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তা হবে ‘ডিকটেটরশিপ অব দ্য মেজরিটি’—সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ব।

এ জাতীয় আজেবাজে বক্তব্যের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। শুধু ২৮ ফেব্রুয়ারি বলেন, ভুট্টোর বক্তব্য গণতন্ত্রের পরিপন্থী। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ভুট্টো সাহেবের ইচ্ছা পাকিস্তানে সংখ্যালঘু দলের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক, ডিকটেটরশিপ অব দ্য মাইনরিটি বাংলার মানুষ মেনে নেবে না। বঙ্গবন্ধু বলেন, আমরা ৬ দফা কারও ওপরে চাপিয়ে দেব না। একজন সদস্যও যদি যুক্তিযুক্ত কোনো দাবি করেন, তা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

বঙ্গবন্ধু বলেন, দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মাওলানা ভাসানী, নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, মোজাফ্ফর আহমদসহ অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। অবাঙালি নাগরিকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তাঁরা এই মাটিরই সন্তান, এ দেশ তাঁদেরও দেশ, তাঁরা জনগণের সঙ্গেই থাকবেন; জনগণই তাঁদের নিরাপত্তা দেবে।’ ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের প্রস্তুতি হিসেবে ১ মার্চ আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হচ্ছিল পূর্বাণী হোটেলে।

সেই সময়ই রেডিওতে ঘোষিত হয়, প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন। শাসকশ্রেণির স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে বাংলাদেশের মানুষ আগেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে দলমত-নির্বিশেষে জনগণ রাজপথে নেমে পড়ে। তাদের কণ্ঠে স্লোগান: ‘তোমার আমার ঠিকানা—পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘পিন্ডি না ঢাকা—ঢাকা ঢাকা’ ইত্যাদি।

ওই মুহূর্তে আমি সিকান্‌দার আবু জাফরের সমকাল অফিসে বসা ছিলাম। কোলাহল শুনে বেরিয়ে আসি। দেখি রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। স্লোগানে উত্তাল। বঙ্গবন্ধু সংসদীয় দলের বৈঠক স্থগিত করে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি ছয় দিনের কর্মসূচি দেন। ২ মার্চ ঢাকায় পূর্ণ হরতাল এবং ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল। তিনি ঘোষণা দেন, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় ভাষণ দেবেন।

তিনি বলেন, ভুট্টোর দল ও কাইয়ুম খানের মুসলিম লীগ ছাড়াও আমরা শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারব। পূর্বাণীর চত্বর তখন লোকে লোকারণ্য। সেখান থেকে রাস্তায় নেমে দেখি বর্তমান বিমান বাংলাদেশ কার্যালয়ের সামনে ‘পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স’ সাইনবোর্ডটির ওপরে কাগজ সেঁটে লেখা ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স’। মতিঝিল থেকে গুলিস্তান চত্বরে এসে দেখি যেসব ভবনের দেয়ালে লেখা ছিল ‘জিন্নাহ এভেনিউ’, সেখানে ‘বঙ্গবন্ধু এভেনিউ’ আলকাতরা দিয়ে লেখা। বস্তুত ইয়াহিয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের কবর খোঁড়া হয়ে যায়।

ওই দিনই বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সহযোগিতা করতে চাই। তিনি পাকিস্তানিদের উদ্দেশে বলেন, আসুন, সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করুন। যদি অসহযোগিতা করেন, আমরাও শান্তিপূর্ণ অসহযোগের কর্মসূচি দেব। ২৩ বছর যাবৎ একই ষড়যন্ত্র করছেন, আর ষড়যন্ত্র করবেন না।’

কোনো রিপোর্টার জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘অপেক্ষা করুন। আমার জনগণ আমার সঙ্গে আছে। আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। আমরা ভালোর আশা করছি, তবে মন্দের জন্যও প্রস্তুত আছি। জনগণের অধিকার অর্জনের লড়াই চলবে। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য কোনো ত্যাগই বড় নয়।’ তিনি বলেন, ‘কাল থেকেই কর্মসূচি চলবে। ৭ মার্চ তিনি পরবর্তী কর্মসূচি জানাবেন রেসকোর্সের জনসভা থেকে।

১ মার্চ থেকেই বাংলাদেশের মানুষ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু কী ঘোষণা দেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ওপর দেশের মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে স্বাধীনতার চেয়ে কম কিছু তারা আশা করছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু একজন গণতান্ত্রিক নেতার মতোই অত্যন্ত সংযত ছিলেন। যে জন্য দেশের বাইরের জনমত ছিল তাঁর পক্ষে। ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে পৃথিবীর অনেক দেশেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছিল। নাইজেরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতার জন্য বায়াফ্রা সশস্ত্র সংগ্রাম করছিল। রক্তপাত হচ্ছিল কিন্তু আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছিল না বিদ্রোহীরা। ইন্দোনেশিয়াতেও হচ্ছিল বিছিন্নতাবাদী আন্দোলন।

সেসব আন্দোলনের নেতিবাচক দিক ও দুর্বলতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল। তিনি উপলব্ধি করেন হঠকারিতার পরিণতি শুভ হয় না এবং হঠকারী নেতা কখনো বিশ্ববাসীর সমর্থন পান না। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর সংযত আচরণের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন তাঁর দিকে এবং তাঁর প্রতিপক্ষ পাকিস্তান সরকার ধিক্কৃত।

একাত্তরে যোগাযোগব্যবস্থা এখনকার মতো ছিল না। গণপরিবহন ছিল খুবই কম। তা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সভায় যোগ দিতে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা আসে। অনেকে আশপাশের জেলা থেকে হেঁটে এসেছে। সকালবেলায়ই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অর্ধেকের বেশি ভরে যায়। সাড়ে ১০টার দিকে আমি ঢাকা ক্লাবের সামনে এসে দেখি মাঠ প্রায় পূর্ণ। স্বাধীনতা লাভের স্পৃহা মানুষের চোখেমুখে। জ্বালাময়ী উত্তেজক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য বিখ্যাত বহু বাঙালি জননেতা। বঙ্গবন্ধুও ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা। পল্টন ময়দানে তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতাও শুনেছি। ৭ মার্চের তাঁর ভাষণটি খুব সংক্ষিপ্তও ছিল না, দীর্ঘও ছিল না। সব দিক থেকে তাঁর পরিমিতিবোধের প্রকাশ ঘটে তাঁর সেদিনের ভাষণে। বক্তৃতা নয়, তিনি যেন জনসমুদ্রের মানুষগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছেন।

তাঁর অনুসারী ও শ্রোতাদের সাংস্কৃতিক মান সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। তিনি তাদের বোধগম্য ভাষাতেই কথা বলেছেন। তিনি পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনীতির পটভূমি তুলে ধরেছেন। সরকারি বাহিনীর হাতে মানুষ মারা যাচ্ছিল প্রতিদিন। ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘২৫ তারিখ অ্যাসেমব্লি ডেকেছেন। রক্তের দাগ শুকায় নাই। রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের উপর পাড়া দিয়ে, অ্যাসেম্বলি খোলা চলবে না।’ বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না।

দেশের মানুষের অধিকার চাই।…আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায় রাখতে পারবা না।’ তাঁর ঘোরতর প্রতিপক্ষ ও শত্রুকেও সৌজন্য রক্ষা করে সম্বোধন করেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, জনাব ভুট্টো সাহেব। রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান এবং জাতীয় পরিষদে যোগদানের এমন চারটি শর্ত ঘোষণা করেন যা কারও পক্ষে অযৌক্তিক বলা সম্ভব ছিল না। সে জন্য পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেয়।

স্বনামধন্য অথচ অদূরদর্শী অনেককে, এমনকি তাঁর দলের কোনো কোনো নেতাকেও বলতে শোনা গেছে, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না কেন? তা তিনি করলে তা হতো বাঙালির জন্য চরম আত্মঘাতী। তাঁকে আখ্যায়িত করা হতো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে। তিনি জনগণনন্দিত গণতান্ত্রিক নেতা থাকতেন না। তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার অর্জনের পথ খোলা রাখেন।

৭ মার্চের পরও তিনি ইয়াহিয়া, ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। তাঁরা চেয়েছেন অস্ত্রের মাধ্যমে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে। কিন্তু নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র পশুশক্তি নিশ্চিহ্ন করতে চাওয়ায় বিশ্বজনমত বাঙালির পাশে দাঁড়ায়। তাই তো বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ৭ মার্চের ভাষণকে গর্ববোধ করি। সে ভাষন থেকে আমাদের অনেক কিছু শিখার আছে। বার বার ভাষণটি শুনে অনুসরণ অনুকরণ করতে হবে তা হলে দেশ প্রেম বৃদ্ধি পাবে, দেশ এগিয়ে যাবে ইনসাল্লাহ।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.