বইয়ের বদলে হাতে ভ্যানের হ্যান্ডেল

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ বয়স এখনও ১২ পেরোয়নি। কোমল হাতে এখন থাকার কথা ছিল বই-খাতা ও কলম। তবে শক্ত-সামর্থ্য মানুষের মতো তার হাত দুটি আঁকড়ে ধরে রাখে অটোভ্যানের হ্যান্ডেল। করোনাকালে স্কুল থেকে ঝরে পড়া মো. মনিরুল ইসলাম ঋণের টাকায় কেনা অটোভ্যান দিয়ে প্রতিদিন যাত্রীদের পৌঁছে দিচ্ছে গন্তব্যে। ভ্যান চালিয়ে হওয়া আয় দিয়ে অপর দুই ভাইয়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবস্থা হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের জীবিকার।

তাড়াশের দিঘি সদগুনা গ্রামের মৃত আমজাদ হোসেন মণ্ডলের ছেলে মনিরুল। এ বয়সেই সংসারের বোঝা চেপেছে তার কাঁধে। সে যখন অটোভ্যানে যাত্রী নিয়ে চলাচল করে, তখন অনেকের প্রশ্ন- স্কুলে না গিয়ে কেন ভ্যান চালায় সে? আরও অনেক কিছু জানতে চায় তার কাছে। সব প্রশ্নের জবাব একটাই- ‘আব্বা বেঁচে নেই। তাই সংসার চালাতে কাজ করতে হয়।’ প্রায় দুই বছর ধরে এভাবে অটোভ্যান চালিয়ে সংসারে একটু সচ্ছলতা ফেরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে সে।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পৌর বাজারের কালীমন্দির এলাকায় জটলা ছিল অনেকের। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অনেকে তার কাছে জিজ্ঞাসা করছেন, এত অল্প বয়সে অটোভ্যান চালানোর কারণ। পরে আলাপকালে মনিরুল জানায়, সে ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট। ছোটকালে বাবাকে হারিয়েছে, তাঁর কথা তেমন মনেও নেই। মা নবিরন বেওয়া, বড় বোন আম্বিয়া এবং ভাই আমিরুল ইসলাম (১৮) ও কামিরুল ইসলাম (১৫) আছে সংসারে। বোনের বিয়ে হয়েছে। ৬ শতাংশ খাসজমিতে টিনশেডের দু’কক্ষের বাড়ি তাদের।

পরিবারটির চাষাবাদের জমি নেই বলে জানান প্রতিবেশী মতিউর রহমান। আর সব জিনিসের দাম বাড়ায় এখন ‘ডালে-চালে’ সংসারটি চলছে, বলেন গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গোলাম রাব্বানী।

জানা গেছে, মনিরুল স্থানীয় দিঘি সদগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল। করোনাকালে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় শ্রমিকের কাজ পাওয়া কমে অপর দুই ভাই আমিরুল ও কামিরুলেরও। বেশিরভাগ দিন বসে থাকতে হতো। এতে সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন দেখা দিলে পড়াশোনার আশা ছাড়তে হয় মনিরুলের। এক পর্যায়ে ভ্যান নিয়ে পথে নামতে হয় তার।

মনিরুল জানায়, প্রথমে চাচাদের অটোভ্যান নিয়ে যাত্রী পরিবহন শুরু করে সে। এর আয়ে সংসারের খরচ জোগাতে থাকে। তবে তিন ভাইয়ের আয়ে এখন পরিবারের জীবিকার সংস্থান হয়। এরই মধ্যে ব্র্যাক থেকে মায়ের নামে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পুরোনো অটোভ্যান কিনেছে সে। ঋণের কিস্তি দিতে হয় তাকে। তার ভাষ্য, বিদ্যালয়ে ফেরার ইচ্ছা নেই তার। সংসার খরচ, ঋণের কিস্তি পরিশোধসহ অন্যান্য প্রয়োজনে অটোভ্যান চালানোর বিকল্প কিছুও জানে না সে।

মনিরুলের মা নবিরন বেওয়া বলেন, ‘টানাটানির সংসার। তার ওপর ঋণের কিস্তি দিতে হয়। কী করে ছেলেকে পড়াব। আমার ছেলেকে পড়ানোর মতো সামর্থ্য নেই। তাই সে কাজ করছে, কাজ করে খাক।’

দিঘি সদগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) খুরশীদ নাহার বলেন, কাজের জন্য বাইরে থাকায় মনিরুল ও তার মাকে অনেক সময় বাড়ি পাওয়া যায় না। তার পরও বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক মনিরুলকে স্কুলে ফেরাতে চেষ্টা করেছেন। তবুও ফেরাতে পারেননি তাকে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আশরাফ আলী বলেন, মনিরুলকে চেষ্টা করেও শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে ফেরাতে পারেননি। তবে সে যদি ফিরে আসে, তাহলে তার পড়ালেখার যাবতীয় খরচ দেওয়া হবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/২২/২৩