প্রাথমিক শিক্ষা হোক মানসম্মত

প্রকাশিত: ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ, রবি, ২৪ জানুয়ারি ২১

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী শিক্ষাব্যবস্থার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো’র সাথে। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলোঃ

প্রথম আলো: করোনাভাইরাসের কারণে তো শিক্ষার্থীরা প্রায় এক বছর ধরে বিদ্যালয়ের বাইরে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে এর প্রভাব কী পড়তে যাচ্ছে?

রাশেদা কে চৌধূরী: গত বছরের মে-জুন মাসে আমাদের একটি ত্বরিত গবেষণায় শিশু-কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, এমন চারটি উদ্বেগের কথা উঠে এসেছিল। এক, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বাড়তে পারে। দুই, বাল্যবিবাহের হার বাড়তে পারে। তিন, শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপুষ্টির হার বাড়তে পারে। চার, শিশুশ্রম বাড়তে পারে। একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে আমাদের আরেকটি জরিপে দেখা গেল, আমাদের ওই চার আশঙ্কা জনমানুষের আশঙ্কার সঙ্গে মিলে গেছে। সেই নেতিবাচক প্রভাবগুলো ক্রমাগত দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তার সঙ্গে শিশু-কিশোরদের ওপর সহিংসতাও যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে মেয়েশিশুরা নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া দেখতে পাচ্ছি, সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও করোনাকালে পরিবারগুলোর আয়নিরাপত্তা ও খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবার অভাব-অনটনের মধ্যে থাকত ১০ শতাংশ, সেই সংখ্যা এখন বেড়ে গেছে প্রায় চার গুণ।

প্রথম আলো: এ ক্ষতি আমরা পোষাব কী করে?

রাশেদা কে চৌধূরী: যেসব উদ্বেগ আশঙ্কায় পরিণত হয়েছে বা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, সেগুলো আমাদের বড় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে শ্রেণিকক্ষের পঠনপাঠনের বিকল্প হিসেবে সরকারের নেওয়া অনেক উদ্যোগ তেমনভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেয়নি বা নিতে পারেনি। এসব ক্ষতি, বিশেষ করে বাল্যবিবাহ, ঝরে পড়া, শিশুশ্রম, লেখাপড়ার ক্ষতিসহ অন্যান্য ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য অন্তত দুই বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে, যেখানে আশু, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ থাকতে হবে। এ জন্য প্রথমে প্রয়োজন তথ্য জানা। শিক্ষাশুমারি করতে না পারলেও অন্তত জরিপ করে দেখতে হবে কত শিক্ষার্থীর কাছে আমরা বিকল্প উপায়ে পৌঁছাতে পারলাম এবং কত শিক্ষার্থীর জন্য পারলাম না। সম্প্রতি এমনও দেখা যাচ্ছে, নতুন বছরে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। তাই প্রকৃত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ও অতিরিক্ত ক্লাসের সুযোগ করে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে যারা শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে, তাদের দ্রুত ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রথম আলো: ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আবার বাড়ল। অন্যদিকে ইউনিসেফ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার পক্ষে কথা বলছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন কী করা উচিত?

রাশেদা কে চৌধূরী: আমাদের সাম্প্রতিক জরিপে মোটা দাগে অধিকাংশ অংশীজনই বিদ্যালয় খোলার পক্ষে মত দিয়েছে, তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে। তারা প্রত্যাশা করছে, যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা আসবে। আমরাও মনে করি, আগে থেকেই ঘোষণা দেওয়া উচিত, যাতে যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া যায়। কারণ, প্রস্তুতি নিতেও ন্যূনতম দুই সপ্তাহ সময় লাগবে। সরকার অবশ্য প্রস্তুতি হিসেবে আগেই ১২ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে খুলে দেওয়া উচিত। যেখানে করোনা সংক্রমণের হার কম বা লাগামের মধ্যে আছে, সেসব জায়গায়, বিশেষত গ্রাম এলাকায় কিশোর-কিশোরী ও যুবাদের জন্য আগে খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্যান্য এলাকায়ও সব শিক্ষার্থীর জন্য ধাপে ধাপে খোলা যেতে পারে।

প্রথম আলো: দেশে অনুভূমিকভাবে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু অনেকেই শিক্ষার, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। শিক্ষার মান বাড়াতে কী করা উচিত?

রাশেদা কে চৌধূরী: বাংলাদেশে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যার দিক দিয়ে বিরাট অর্জন হয়েছে। এমনকি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছেলে ও মেয়েদের সমতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ, মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। মান নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছেও আছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর দুই বছর অন্তর ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট’ করে থাকে। তাতে দেখা যায়, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা গণিত, বাংলা, ইংরেজিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনের দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা দিয়ে কিন্তু প্রকৃত মান বোঝা যায় না। শিক্ষার মান না বাড়ার একটি কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে পরীক্ষানির্ভর। শিক্ষার্থীরা প্রধানত পরীক্ষায় পাস বা জিপিএ-৫ পাওয়াকে কেন্দ্র করে পড়াশোনা করে। কিন্তু তাতে যুগোপযোগী জ্ঞান অর্জনে পিছিয়ে থাকে। এই জায়গা থেকে সরে আসতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতির দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ধারাবাহিক মূল্যায়নে জোর দিতে হবে। বৈশ্বিক বাস্তবতা ও যুগের চাহিদা বিবেচনা করে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট পরীক্ষা না নেওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর শিক্ষার মানের বড় নিয়ামক হলেন শিক্ষক। সাম্প্রতিক কালে প্রাথমিকে শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেড়েছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শিখন পদ্ধতি যথাযথ ব্যবহার করে জ্ঞান প্রদানে দক্ষতার অভাব রয়ে গেছে। এখনো মাধ্যমিকে সৃজনশীল প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে আমরা শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি প্রায়ই দেখে থাকি। তাই শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

প্রথম আলো: সরকার নতুন করে শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। খসড়া অনুযায়ী প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন বিষয় পড়তে হবে। আরও বড় কিছু পরিবর্তন আছে। আপনার এ ব্যাপারে অভিমত কী?

রাশেদা কে চৌধূরী: শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের পরিকল্পনাটি দীর্ঘদিন ধরে চলছে। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা থাকা দরকার। অভিন্ন বিষয় পড়ানোর ধারণাও ঠিক আছে। এটা করা গেলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে এখানে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথমত, এই অভিন্ন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আগে তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাতে এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে সক্ষমতা অর্জন করে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, আমাদের পাঠ্যসূচি ও বইপুস্তকেও যেন এর ধারাবাহিকতা থাকে। না হলে শিক্ষার্থীরা হোঁচট খেতে পারে।

প্রথম আলো: জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণি থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার কথা ছিল। এটি করা হলে কি এর কোনো সুফল আসত?

রাশেদা কে চৌধূরী: আমাদের একটি বড় অর্জন ছিল জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা। এটি সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা হোঁচট খেয়েছি। আমার মনে হয়, শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার কারণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এখানে দুটি মন্ত্রণালয়ের (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়) আরও সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। কিন্তু হয়নি। আইনি কাঠামো না থাকায় বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা ছিল না। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করা গেলে অনেক সুফল পাওয়া যেত। বিশেষত, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে সহজেই পড়তে পারত। দক্ষতা অর্জনও তাদের জন্য সহজতর হতো। পঞ্চম শ্রেণির পরই অনেকের ঝরে পড়ার ক্ষেত্রেও লাগাম টানা যেত।

প্রথম আলো: শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য শিক্ষা আইন ১০ বছরেও হলো না। আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে নানা অস্থিরতার পেছনে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন না হওয়ার ভূমিকা আছে কী?

রাশেদা কে চৌধূরী: এত দীর্ঘ সময়েও শিক্ষা আইনটি না হওয়া দুঃখজনক। এই আইনটি না হওয়ায় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নও ঠিকমতো হচ্ছে না। এর দায় প্রধানত দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তায়। এখানেও মনে হয় আমরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে গেছি। এ বিষয়ে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও বেশি সোচ্চার হওয়া দরকার ছিল। আমি মনে করি, দ্রুত শিক্ষা আইনটি প্রণয়ন ও বাস্তবায়িত হওয়া দরকার।

প্রথম আলো: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার কাজ দুটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এতে প্রায়ই আমরা সমন্বয়হীনতার কথা শুনি। এ ক্ষেত্রে আসলে কী করা কর্তব্য?

রাশেদা কে চৌধূরী: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উদাহরণ যদি দিই, তাহলে বেশির ভাগ দেশেই হয় অভিন্ন মন্ত্রণালয় অথবা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য একটি মন্ত্রণালয়, আরেকটি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য। আমাদের দেশেও এ রকম কিছু হওয়া দরকার।

প্রথম আলো: সার্বিকভাবে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা আপনি কেমন দেখতে চান?

রাশেদা কে চৌধূরী: স্বপ্ন ও প্রত্যাশার জায়গা থেকে যদি বলি, তাহলে প্রথমত বলব প্রাথমিক শিক্ষা কার্যকরভাবে সর্বজনীন ও মানসম্মত হতে হবে। কারণ, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই সব শিক্ষার ভিত্তি। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা কার্যকর করতে না পারলে শিক্ষার ওপরের স্তরগুলোতে মান অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, এ বছর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপন করতে যাচ্ছি। এখনো যদি প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বেশি ফারাক থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশের অনেক অর্জন ধরে রাখা কঠিন হবে। তবু স্বপ্ন দেখি, সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই।
সুত্রঃ প্রথম আলো

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.