প্রাথমিক নিয়ে হুটহাট পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ হওয়া আবশ্যক

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক ‘শিফট’ বা এক পালায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করিবার প্রশাসনিক নির্দেশনায় যুক্তি থাকিলেও তাহা বাস্তবোচিত নহে। রবিবার সমকালে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন মোতাবেক, দেশের সাড়ে পঁয়ষট্টি সহস্র বিদ্যালয়ের অধিকাংশই চলে দুই পালায়। কারণ, শিক্ষক ও অবকাঠামো উভয় দিক হইতেই বিদ্যালয়গুলির সমস্যা রহিয়াছে; দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলিতে এ সংকট আরও প্রকট। বিদ্যমান সংকটের সমাধান না করিয়া এক পালায় শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করিবার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা উল্টো পথে হাঁটিতেছে কেন? এক শিফটে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক এই অর্থে, দুই পালায় শ্রেণি কার্যক্রম চলিলে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না; আবার বিকেলের পালায় শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগ রক্ষাও কঠিন কর্ম। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত না করিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক শিফট চালু হইলে উহা প্রাথমিকের সমস্যা যে আরও বাড়াইবে, তাহা অস্বীকার করা যায় না।

আমরা দেখিতেছি, এক পালা নিশ্চিত করিবার প্রয়োজনে দুটি বিদ্যালয়কে একীভূত করিবার মতো আরেকটি অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলিতেছে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন। শিক্ষার্থী কম থাকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহিত একীভূত করিবার নির্দেশনা একেবারেই অযৌক্তিক বলিয়া আমরা মনে করি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ূয়া কোমলমতি শিশুদের এক কিলোমিটারের দূরবর্তী জায়গায় যাইয়া প্রত্যহ শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করিবার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হইতে পারে না। ইহাতে শিশুদের ঝরিয়া পড়িবার শঙ্কা যেমন বাড়িয়া যাইবে, একইভাবে নিরাপত্তার প্রশ্নে ছাত্রীরাও অভিভাবকদের তরফ হইতে দূরের বিদ্যালয়ে যাইয়া পাঠগ্রহণে বাধার সম্মুখীন হইতে পারে। এতদ্ব্যতীত চর, হাওর ও পার্বত্য অঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকায় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাও প্রায় অসম্ভব হইবে। দুই পৃথক বিদ্যালয় একীভূত করা হইলে যেই বিদ্যালয়ে ক্লাস হইবে না, তাহার ভূমি, ভবন ও অন্যান্য সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণই বা হইবে কীভাবে? আমরা মনে করি, প্রাথমিকে এক পালায় শ্রেণি কার্যক্রম চালু করিবার জন্য এমন অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত শিশুদের উপর চাপাইয়া দেওয়া ঠিক হইবে না।

আমরা বিস্মিত, প্রাথমিকে এক পালার সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক সিনিয়র সচিবের আগ্রহে। সংশ্নিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ কাহারও সহিত কোনো পরামর্শ না করিয়া নিছক একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার খেয়াল এইভাবে প্রাথমিকের শিশুদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। দুঃখজনক বিষয় হইল, এহেন ঘটনা প্রাথমিক শিক্ষায় পূর্বেও একাধিকবার ঘটিতে দেখা গিয়াছে। গত ডিসেম্বরেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পিইসি তথা প্রাথমিক সমাপনী পাবলিক পরীক্ষা বাতিল হইবার পর হুট করিয়া বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত লইয়াছিল। শিক্ষাবিষয়ক যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও দীর্ঘ প্রস্তুতি প্রয়োজন বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ বরাবরই মনে করেন; বিশেষ করিয়া সিদ্ধান্তটি যদি প্রাথমিক শিক্ষার জন্য হয়, তখন কোমলমতি শিশুদের স্বার্থে সেটি আরও বেশি জরুরি হইয়া পড়ে।

এমনিতেই সংবিধানে সকলের জন্য অন্তত একটা স্তর পর্যন্ত একই পদ্ধতির মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করিবার কথা থাকিলেও বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বহু ধারায় বিভক্ত, যাহার ফলস্বরূপ শিক্ষায় বিশেষত, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট রূপ ধারণ করিয়া আছে। ইহা কাহারও অজানা নহে যে, সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কিন্ডারগার্টেন বা মানসম্মত বিদ্যালয়ের চাইতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ- যেখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী আসে অসচ্ছল পরিবার হইতে- প্রায় সকল ক্ষেত্রেই পিছাইয়া রহিয়াছে। ইহার মধ্যে যদি বিনা আয়োজনে প্রাথমিকে এক পালার শিক্ষা চালুর তুঘলকি সিদ্ধান্ত চাপাইয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে উক্ত বৈষম্য আরও বাড়িবে বৈ কমিবে না। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাতারাতি এক পালা চালুর নির্দেশনাটি পুনর্বিবেচনা করিবে। তবে যাহাদের সক্ষমতা রহিয়াছে, সেসব বিদ্যালয়ে এক পালা চলিতে কোনো সমস্যা নাই বলিয়াও আমরা মনে করি। কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাজীবন লইয়া এমন হুটহাট পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ হওয়াও আবশ্যক। সুত্রঃ সমকাল

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/২৩/২৩