প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষাব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে

প্রকাশিত: ৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ, বুধ, ১১ নভেম্বর ২০

নিউজ ডেস্কঃ

দেশের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় পিইসিই ও সমমান এবং জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করে দিতে পারে সরকার। একই সঙ্গে মাধ্যমিকে বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগগুলো বাতিল হতে পারে।

২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া একটি পাঠ্যক্রমের নতুন রূপরেখায় এ ছাড়াও রয়েছে আরো অনেক পরিবর্তনের প্রস্তাব। এতে শুধুমাত্র দশম শ্রেণীর পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে মাত্র পাঁচটি বিষয়ে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষা হবে দুটি ভাগে। একটি একাদশ শ্রেণীতে এবং অপরটি দ্বাদশ শ্রেণীতে। জাতীয় পাঠ্যক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) খসড়াটিতে অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি বা সমমান এবং পঞ্চম শ্রেণীর পিইসিই পরীক্ষা রাখার জন্য কোনো প্রস্তাব দেয়া হয়নি।

এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যক্রম) অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, আমরা দশম শ্রেণীর আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তাব দিইনি। তবে সরকার যদি এর আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা নিতে চায় তো নিতে পারে। এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, পিইসিই এবং জেএসসি পরীক্ষা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনেক চাপের মধ্যে রাখে। এর পরিবর্তে বিদ্যালয়ে নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর জোর দেয়া হবে।

পিইসিই পরীক্ষা চালু হয়েছিল ২০০৯ সালে এবং জেএসসি ২০১০ সালে। অনেক শিক্ষাবিদ এই পরীক্ষা দুটোকে অপ্রয়োজনীয় বলে অভিহিত করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ দেয়ার সমালোচনা করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, স্কুলের সব ক্লাস শেষ করে একটি পাবলিক পরীক্ষা হওয়া উচিত। অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাই যথেষ্ট। নতুন প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এসএসসি পরীক্ষা হবে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের ওপর। বাকি মূল্যায়ন হবে স্কুলেই।

এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে দুটি দফায়। পরবর্তীতে দুটি ফলাফল সমন্বয় করে চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত করা হবে। নবম ও দশম শ্রেণীতে দুই বছর পড়ার পর ১০টি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষা দেয়। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর সিলেবাস শেষ করে মোট ১২টি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পরীক্ষা দেয়। কয়েক দশক ধরে নবম শ্রেণী থেকেই শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায় শিক্ষা থেকে একটি বিভাগ বেছে নিতে হয়। বোর্ড কর্মকর্তাদের মতে এটি শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করছে।

একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা বাধ্যতামূলক বাংলা, ইংরেজি এবং আইসিটির পাশাপাশি বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে অন্য তিনটি বিষয় বেছে নিতে পারবে। এর পাশাপাশি তারা ভোকেশনাল কোর্স থেকে একটি বিষয় বেছে নেবে। সর্বশেষ ২০১২ সালে কারিকুলাম সংশোধন করা হয়েছিল।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা জানান, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে স্কুল পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ নেই। স্কুল লেভেলের সব শিক্ষার্থীর একই জ্ঞান থাকা উচিত। নতুন রূপরেখায় স্কুলের সাপ্তাহিক ছুটি শুধুমাত্র শুক্রবারের পরিবর্তে শুক্র ও শনিবার করা প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, গুণগত শিক্ষা চাইলে মানসম্মত শিক্ষক দরকার, যা খুবই কম। তিনি বলেন, শ্রেণীকক্ষে লেখাপড়া নেই। গরিব পরিবারের সন্তান প্রাইভেট পড়তে পারে না, গাইড পড়তে পারে না। তাহলে শিক্ষার মান আসবে কোথা থেকে? তিনি আরো বলেন, শিক্ষার মূল জায়গা শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষকরা হলেন শ্রেণীকক্ষের প্রাণ। তাই শ্রেণীকক্ষে লেখাপড়া নিশ্চিত করতে পারলে এবং শিক্ষককে শক্তিশালী করা গেলে গুণগতমান আরো বাড়বে।

অ্যাডভোকেট আব্দুল মোমিন শেখ বলেন, ১৯৬২ সালের বর্বর পাকিস্তানি শাসকদের জোর পূর্বক চাপিয়ে দেয়া শিক্ষানীতি বাতিলের আন্দোলনে, ওয়াজিউল্লাহরা প্রাণ দিলেন। এই দেশের মানুষ আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমেই নিজেদের ভাষা, স্বাধীনতা ও বঞ্চনা বৈষম্যের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছে যুগে যুগে। একটি শিক্ষা আন্দোলন জরুরি হয়ে পড়েছে, তা হলো অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে জাতীয়করণ এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার মানোন্নয়ন। সময়ের দাবি শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করার মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গুণগতমানের শিক্ষায় প্রয়োজন, গুণগতমানের মেধাবী শিক্ষক। সংবিধান সমুন্নত রাখতে দেশের মানুষের জোরালো দাবি স্বাক্ষরতামুক্ত দেশ গঠনের। শিক্ষা দিবস পালন করা তখনই সার্থক হবে যখন আমরা আগমী দিনে যারা হাল ধরবে তাদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারব। তিনি বলেন, একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
শিক্ষাবার্তা/এসআই

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.