প্রাথমিকের টিফিন ভাতা ও প্রাসঙ্গিক কথা

প্রকাশিত: ১২:১৮ অপরাহ্ণ, বুধ, ২৫ নভেম্বর ২০

অলোক আচার্য।।

যে কোনো স্তরের শিক্ষকতায় মেধাবী শিক্ষকের বিকল্প নেই। তার দক্ষতা এবং যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে সেই স্তরের প্রয়োগকৃত প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য কলাকৌশল কতটা দক্ষভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করা হবে। যেহেতু প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষাস্তরের প্রাথমিক স্তর এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাই এই স্তরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এই স্তর থেকে শিশু যেভাবে গড়ে উঠবে তার ভবিষ্যতেও তার প্রভাব থাকবে।

এই স্তরের শিক্ষকদের হতে হবে মেধাবী। আর মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে শিক্ষকদের মনের কথা শুনতে হবে। তাদের যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বেতন, পদোন্নতি এবং অন্যান্য সুবিধাধি প্রদান করতে হবে। দীর্ঘদিন আন্দোলনের পর প্রাথমিকে সহকারি শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১৩ করা হয়েছে। যদিও এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অতি দ্রæত এই গ্রেড বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে শিক্ষকদের দাবি ছিল ১১ গ্রেড। প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা দাবি ১০তম গ্রেড। গ্রেড পরিবর্তনের সাথে সাথে বেতনও বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে একজন প্রাথমিক শিক্ষকের টিফিন ভাতা হিসেবে দেওয়া হয় মাত্র দুইশত টাকা। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

একটি পুরো মাসে দুইশত টাকা টিফিন ভাতায় আদৌ কিছু করা যায় কি? এই বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক। একটি যৌক্তিক ভাতা নিধারণ করা উচিত। বহু স্থানে দুর্গম অঞ্চলে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে শিক্ষককে তার দায়িত্ব পালন করতে হয়। একটি সম্মানজনক বেতন গ্রেডের সাথে টিফিন ভাতার পরিমাণও যৌক্তিক হওয়া উচিত। যেকোনো চাকরিতে পদন্নোতি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেবল বেতনের জন্যই সবাই চাকরি করে না।

পদোন্নতির আশা মনের ভেতর লুকিয়ে রাখে সবাই। অন্যান্য সরকারি চাকরির মতো প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরিতে পদোন্নিতর সুযোগ থাকা উচিত এবং এটা তাদের পেশাগত দক্ষতা, কাজের প্রতি স্পৃহা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর তার মেধা এবং দক্ষতা, কাজের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উৎসাহ এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পার হলেও সেই পদ থেকে পদন্নোতি না হয় তখন তার মনে হতাশা বিরাজ করে। আর সেটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেকেই তার কাজের মূল্যায়ন চায়। সেই মূল্যায়ন যে কেবল বেতন বৃদ্ধির ভেতরেই সিমাবদ্ধ থাকে এমন ধারণা ঠিক নয়। চাকরিতে পদন্নোতি থাকা তাই একান্ত আবশ্যক।

প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে এটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একজন সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর নির্দিষ্ট সময় শেষে সহকারি প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক,সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ থাকে তাহলে শিক্ষকদের মধ্যে আগ্রহ সঞ্চার হবে। তারা তাদের দায়িত্ব পালনে সচেতন হবে। কারণ এই পদন্নোতির মাপকাঠি যদি শিক্ষকদের মেধা,দক্ষতা ইত্যাদি বিবেচনায় হয় তাহলে তারা তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে কাজ করবে। তারা তাদের কাজে অসন্তুষ্টি থাকবে না এবং সর্বোচ্চ সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দেয়ার কাজটি করে যাবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন যারা নিয়োগ পাচ্ছে তারা সর্বোচ্চ শিক্ষিত। এতদিন মেয়েদের ক্ষেত্রে যে শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল আগামী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে তা পুরুষ ও মহিলা সমান যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আবেদন চলছে।

করোনা কালীন সময়ে বেসরকারি চাকরিতে নিরাপত্তাহীনতা এবং বিপরীতে সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও সুবিধার কারণে সরকারি চাকরিতে সবার ঝোঁক বেশি। সামনের যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসবে তারাও শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে যথেষ্ট যোগ্য। তাদের সেই যোগ্য সম্মান দিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষার্থীদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষকদের কয়েকটি বিষয়ও গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ প্রাথমিক শিক্ষাসহ শিক্ষার সব স্তরে মেধাবী এবং আন্তরিক মানুষ প্রয়োজন যারা কেবল শিক্ষকতাকেই নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে দেখে থাকেন। এমন এক সময় আসবে যখন একজন তার মেধাকে সরকারি অন্য উচ্চ শ্রেণির চাকরিতে না দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করবে। এটা হয়তো অনেক দূরের কল্পনা। কিন্তু শিক্ষার জন্য উত্তম। একজন সহকারি শিক্ষক হিসেবে যখন কেউ যোগদান করেন তখন তাদের ভেতর পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক বা সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বা তার থেকেও বড় পদে চাকুরির আশা করতে পারে।

কারণ অন্য সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির সুযোগ যতটা রয়েছে এখানে ততটা নেই। সহকারি শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষকে উন্নীত হলেও সেই প্রক্রিয়াও খুব দীর্ঘ। প্রতিনিয়তই প্রাথমিক স্তরকে উন্নয়নের জন্য, কাঙ্খিত ফল লাভের জন্য,শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে নতুন নতুন সিদ্ধান্ত প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথেই সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য করার উদ্যেগ গ্রহণ করেছে। এভাবে শিক্ষকদের দাবি পূরণের সাথে সাথে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা আরও উন্নত হয়ে উঠবে।

লেখক-
কলাম লেখক

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.