প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের

নিউজ ডেস্ক।।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনের গ্রেড পয়েন্ট বাড়ানোর ফলে অনেক শিক্ষার্থী আবেদনের যোগ্যতাই হারিয়েছেন। ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনেক কলেজ এবারো চাহিদামতো শিক্ষার্থী না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, ভর্তির যোগ্যতা (গ্রেড পয়েন্ট) বাড়ানোর আড়ালে কৌশলে অনেক শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এমনো অনেক গরিব পরিবারের শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা স্বল্প খরচে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার ইচ্ছা থাকলেও এখন তাদের সেই আশা আর পূরণ হচ্ছে না।
সূত্র মতে, এ বছর নতুন নিয়মে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা এসএসসিতে জিপিএ ৩ দশমিক ৫ ও এইচএসসিতে জিপিএ ৩ পেয়ে ভর্তির আবেদন করতে পারবেন। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের একজন শিক্ষার্থীকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসএসসি ও এইচএসসি দুই পরীক্ষাতেই ন্যূনতম জিপিএ ৩ দশমিক ৫ থাকতে হবে। কিন্তু গত বছরও (২০২১ সাল) বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে একজন শিক্ষার্থী এসএসসিতে জিপিএ ৩ ও এইচএসসিতে জিপিএ ২ দশমিক ৫ পেয়ে ভর্তির আবেদন করতে পারতেন। আর মানবিক বিভাগে এসএসসিতে জিপিএ ২ দশমিক ৫ ও এইচএসসিতে জিপিএ ২ দশমিক ৫ পেয়ে ভর্তির আবেদন করতে পারতেন।
এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথমবর্ষে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল মানদণ্ডে নতুন যে পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে তা অবিলম্বে বাতিল করে আগের পয়েন্ট বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দুু’দিন আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এ দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষক, ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে একটি নির্দিষ্ট কৌশল সামনে নিয়েই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তির যোগ্যতা গত কয়েক বছরের চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই কৌশলের কারণে অথবা ভর্তির আবেদনের যোগ্যতা বাড়ানোর ফলে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত প্রান্তিক পর্যায়ের কলেজগুলো। তাই সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোর অধ্যক্ষরা শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই বিপাকে পড়েছেন। তারা কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
অনেক অধ্যক্ষ বলছেন, শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা বৃদ্ধি করায় অপেক্ষাকৃত কম জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়মুখী হবে। তাই সারা দেশের অনার্স অধিভুক্ত কলেজগুলো পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাবে না। এতে কলেজ পরিচালনার টাকা উঠবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কলেজের শিক্ষকরা বলছেন, অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে এ পর্যায়ের শিক্ষকদের বেতনভাতা দেয় কলেজগুলো। তাই যোগ্যতা বৃদ্ধি করায় শিক্ষার্থী কমলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রান্তিক কলেজগুলোর অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা।
যদিও অধিভুক্ত কলেজগুলোর অধ্যক্ষদের বক্তব্যের সাথে একমত নন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: মশিউর রহমান। তিনি বলেছেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষিত বেকার তৈরি বন্ধ করতে ভর্তির যোগ্যতা বাড়ানো হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী আগে কম জিপিএ নিয়ে ভর্তি হতো তাদের সংখ্যা খুবই কম। আর তারা ডিগ্রিসহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কোর্সে ভর্তির সুযোগ পাবেন।
অনেক অভিভাবক গতকাল সোমবার ফোনে নয়া দিগন্তকে জানান, উচ্চশিক্ষা সবার অধিকার। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তে অনেক গরিব পরিবারের সন্তানরা ভর্তির আবেদনই করতে পারছেন না। তারা এখন জমিজমা বিক্রি করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হবেন। অন্যথায় পড়ালেখাই বাদ দিতে হবে।
বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানান, হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত মোটেই সমীচীন হয়নি। এতে উচ্চশিক্ষা বাধাগ্রস্ত হবে। তবে আমি মনে করি উচ্চশিক্ষার পথ যদিও সবার জন্য উন্মুক্ত থাকাটাও জরুরি নয়, তারপরও বিকল্প খোলা না রেখে এমন সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়াটি গ্রহণ করা দরকার ছিল। এভাবে ভর্তির ঠিক আগে এসে গ্রেড পয়েন্টের মারপ্যাঁচে শিক্ষার্থীদের ভর্তির পথ রুদ্ধ করা উচিত হয়নি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ জাফর আলী সাংবাদিকদের বলেন, যোগ্যতা এক লাফে এত বাড়ানোয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়মুখী হবেন শিক্ষার্থীরা। এক্ষেত্রে শুধু জেলা শহর কিংবা বাইরের কলেজই নয় বরং ঢাকার কলেজগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়মুখী হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ব্যয়ও অনেকগুণ বাড়বে।