প্রথম শ্রেণির সাড়ে ৩২ লাখ শিক্ষার্থীর পাঠ নিয়ে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নতুন পাঠ্যক্রমে শুরু হতে যাচ্ছে প্রথম শ্রেণির পাঠদান। অথচ এ ব্যাপারে শিক্ষকদের এখনো কোনো প্রশিক্ষণ নেই। নতুন পাঠ্য বইয়ের ভুলত্রুটিও পরিমার্জন করা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন।জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, নতুন কারিকুলামে পাঠদান নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রায় সাড়ে ৩২ লাখ।

নতুন কারিকুলামে দেশে আগামী বছর থেকে প্রথম শ্রেণির পাঠদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন পাঠ্য বই। শিক্ষার্থীদের নতুন এই কারিকুলামে পাঠদানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পাঠ্য বইয়ের ভুলত্রুটি পরিমার্জন-পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর কোনোটিই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।কালের কন্ঠ

মো. ইব্রাহীম নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘পাঠ্য বইয়ের ভুল নিয়ে প্রতিবছর ব্যাপক সমালোচনা হয়। এবার তৈরি করা হচ্ছে নতুন কারিকুলামের বই। পর্যবেক্ষণ ছাড়া এসব বই ছাপা হলে ভুল থাকবেই। পাশাপাশি নতুন কারিকুলামের পাঠ্য বই পড়ানোর উপযোগী কি না, সেটি যাচাই না করে ছাপানো হবে ঝুঁকিপূর্ণ। ’

অন্য এক অভিভাবক তানজিলা আক্তার বলেন, ‘আগামী বছর আমার ছোট মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হবে। আগে শিক্ষকদের পাশাপাশি বাসায় বাচ্চাদের আমরাও পড়াতাম। এখন নতুন কারিকুলামের বই বাচ্চাকে কিভাবে পড়াব, বুঝতে পারছি না। একইভাবে প্রশিক্ষণ না নিয়ে শিক্ষকরাই বা কিভাবে ক্লাসে পাঠদান করবেন, বুঝতে পারছি না। ’

এনসিটিবির শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন কারিকুলামের জন্য দেড় হাজার প্রশিক্ষক তৈরি করা হবে। এনসিটিবি থেকে কোর ট্রেইনার ও মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করা ছাড়াও প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল বা গাইড বই তৈরির কাজ চলমান।

প্রশিক্ষণ বিভাগের ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ গোলাম মোস্তফা  বলেন, ‘ম্যানুয়াল তৈরি হলে নভেম্বরের শেষ দিকে প্রশিক্ষণ শুরু হবে। অনলাইন ও অফলাইন—এই দুই মাধ্যমে দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় অফলাইনেও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। কোর ট্রেইনার ও মাস্টার ট্রেইনাররা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) মাধ্যমে দেশজুড়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেবেন। ’

ডিপিই প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক উত্তম কুমার দাশ  বলেন, ‘সরকারি পর্যায়ে আমাদের তিন লাখ ৫৯ হাজার শিক্ষক রয়েছেন। সব শিক্ষককে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে না। সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকরা ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ পাবেন। কাউকে অনলাইনে, আবার কাউকে সরাসরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ’

তিনি বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ। এ প্রশিক্ষণ সরাসরি দেওয়ারও কিছু নেই। প্রশিক্ষণ গাইডের সফট কপি আমরা অনলাইনে দিয়ে দেব। শিক্ষকরা নিজেদের মতো করে সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নেবেন। ’

এনসিটিবির প্রাথমিক শিক্ষাক্রম সদস্য এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেন, বর্তমানে প্রথম শ্রেণির পাঠ্য বইয়ের পাইলটিং করে পর্যবেক্ষণ নিয়ে সংশোধন করা সম্ভব নয়। প্রাথমিকে ২০১২ সাল থেকে যোগ্যতাভিত্তিক পাঠদান চলছে। ফলে বর্তমানে তা পরিমার্জনের তেমন প্রয়োজন নেই।

শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগে থেকেই এই পদ্ধতিতে পাঠদান চালু করায় পরিমার্জিত কারিকুলামে পড়ানো শিক্ষকদের জন্য খুব কঠিন কাজ হবে না। এ ছাড়া প্রতিটি বইয়ে কিউআর কোড যুক্ত করা থাকবে, যেখানে পাঠদানের উপযোগী বিভিন্ন মডেল ভিডিও যুক্ত থাকবে। সেখান থেকেও তাঁরা প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। কোর ট্রেইনার ও মাস্টার ট্রেইনার তৈরির জন্য আমরা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করছি। ডিসেম্বর থেকে এই কার্যক্রম শুরু করা হবে। ’

নতুন শিক্ষাক্রম কোর কমিটির সদস্য আবুল মোমেন  বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্য বই প্রস্তুত করা কষ্টসাধ্য কাজ। প্রাথমিকে এ কাজে ধীরগতির কারণে এ বছর পাইলটিং করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দেওয়ায় আগামী বছর প্রথম শ্রেণিতে নতুন পাঠ্য বই তেমন ফলপ্রসূ হবে না। এ বছর পাঠ্য বইয়ের পাইলটিং করে তা পরিমার্জন এবং ধারাবাহিকভাবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে আগামী বছর থেকে সুফল পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমে শিখন শেখানোর পদ্ধতি আগের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। শিশুরা নিজেরা বিভিন্ন কাজ করার মাধ্যমে শিখবে, শিক্ষক সেখানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন। ফলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনেক। কিভাবে তাঁরা পড়াবেন, এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।