প্রতিবেশীর অধিকার : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর।।

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধানের নাম। একজন মানুষ তার জীবন চলার পথে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে তার সবই যৌক্তিক সমাধান পেশ করেছে ইসলাম। একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে ইসলামের দিকনির্দেশনা অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও গঠনমূলক। ইসলাম সামাজিক জীবনযাপনে প্রতিবেশীর প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
প্রতিবেশী শব্দটির আরবি প্রতিশব্দ জার। এটির শাব্দিক অর্থ প্রতিবেশী, পাড়াপড়শি ইত্যাদি।

পরিভাষায় বলতে পারি, আমাদের বাসা-বাড়ির চার পাশে যেসব লোকজন বসবাস করেন তারা আমাদের প্রতিবেশী। চাই তারা নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করুক বা ভাড়া বাসায় বসবাস করুক। আর হাদিসের বর্ণনা মতে, নিজ বাড়ির চার পাশের চল্লিশ বাড়ি পর্যন্ত যারা বসবাস করেন তারা একে-অপরের প্রতিবেশী। বতর্মান সময়ে বহুতলবিশিষ্ট ফ্ল্যাটে বসবাসকারীরাও পরস্পর পরস্পরের প্রতিবেশী।

হাদিসের বর্ণনা মতে, হক বা অধিকারের আলোকে প্রতিবেশী তিন শ্রেণীর হয়ে থাকে। যেমন রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, কোনো কোনো প্রতিবেশী রয়েছে, যাদের হক মাত্র একটি। এমন কোনো কোনো প্রতিবেশী রয়েছে যাদের হক দুটি এবং এমন কতক প্রতিবেশী রয়েছে যাদের হক তিনটি। নিচে তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হলো-

১. এক হকবিশিষ্ট প্রতিবেশী তারা, যারা প্রতিবেশী কিন্তু আত্মীয় নয় এবং অমুসলিম।

২. দুই হকবিশিষ্ট প্রতিবেশী তারা, যারা প্রতিবেশী হওয়ার সাথে সাথে মুসলমান কিন্তু আত্মীয় নয়।

৩. তিন হকবিশিষ্ট প্রতিবেশী তারা, যারা প্রতিবেশী হওয়ার সাথে সাথে মুসলমান ও আত্মীয়ও বটে।

প্রতিবেশীর হক আদায়ের গুরুত্ব : প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা, তাদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ প্রদর্শন এবং পরস্পরের সাথে মিলেমিশে বসবাস করা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। চাই সে মুসলিম বা অন্য যেকোনো সম্প্রদায়ের হোক না কেন। এ বিষয়ের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর ইবাদত করো আল্লাহর, শরিক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। আর পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো এবং নিকট আত্মীয়, ইয়াতিম-মিসকিন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীদের সাথেও ভালো ব্যবহার করো।’ (সূরা আন নিসা, আয়াত-৩৬)

আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেছেন, জারি-যিল-কুরবা বলতে তাদের বুঝায়, যারা প্রতিবেশী হওয়ার সাথে সাথে আত্মীয়ও বটে। আর জারিল-জুনুব বলতে শুধু সেসব প্রতিবেশীকে বুঝায় যাদের সাথে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো কোনো তাফসিরকারকের মতে, জারি যিল-কুরবা এমন প্রতিবেশীকে বলা হয়, যারা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত ও মুসলমান। আর জারিল-জুনুব বলা হয় অমুসলিম প্রতিবেশীকে। (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন)

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা: ও হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা: থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, নবী করিম সা: বলেছেন, জিব্রাঈল আ: প্রতিনিয়তই আমাকে প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে তাকিদ দিচ্ছিলেন। এমনকি আমার ধারণা জন্মেছিল যে হয়তো প্রতিবেশীকে আমার সম্পত্তিতে হকদার করা হবে। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) আলোচ্য হাদিস দ্বারা প্রতিবেশীর অধিকারের গুরুত্ব সম্পর্কে জানা যায়।

হাদিসের আলোকে প্রতিবেশীর হক : প্রতিবেশীর হকের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি ঈমানদার নয়, আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি ঈমানদার নয়, আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি ঈমানদার নয়। সাহাবিগণের একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! লোকটি কে? জবাবে রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না। (সহিহুল বুখারি ও মিশকাত)

প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করা নৈতিক দায়িত্ব। তাদের কোনো প্রকার কষ্ট না দেয়া, তাদের উপকার করা, দান করা এবং যথাসম্ভব গরিব প্রতিবেশীর দুঃখ-কষ্টে অংশীদার হওয়া ঈমানী দায়িত্ব। যেমন রাসূল সা: বলেছেন, সে ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানদার নয়, যে নিজে তৃপ্তিসহকারে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে। (বায়হাকি ও মিশকাত)

প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ে যতœশীল হওয়ার তাকিদ দিয়ে রাসূল সা: আরো বলেছেন, যখন তুমি তরকারি পাকাবে, তখন তাতে কিছু অতিরিক্ত পানি দিবে, যাতে করে তুমি প্রতিবেশীকে কিছু হাদিয়া দিতে পার। (সহিহ মুসলিম)

এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা: মুসলিম নারীদের উদ্বুদ্ধ করে আরো বলেন, হে মুসলিম রমণীরা! তোমরা প্রতিবেশীর বাড়িতে সামান্য বস্তু পাঠানোকে তুচ্ছ মনে করবে না। এমনকি তা যদি বকরির পায়ের সামান্য অংশও হয়। (সহিহ বুখারি)

প্রতিবেশীর হক আদায়ের গুরুত্ব কত বেশি নিচের হাদিস থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন লোক রাসূলুল্লাহ সা:-এর দরবারে এসে নিবেদন করল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক স্ত্রী লোকটি বেশি নফল সালাত আদায়, বেশি রোজা পালন ও বেশি দান-খয়রাতের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু সে তার প্রতিবেশীদের জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, সে জাহান্নামি। সে আবার আরজ করল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক স্ত্রী লোকটি সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, সে নফল সালাত কম আদায় করে, নফল রোজা কম রাখে এবং দানও করে কম কিন্তু সে মুখের ভাষা দিয়ে কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, সে জান্নাতবাসিনী। (মিশকাত) রাসূলূল্লাহ সা: আরো বলেছেন, কেয়ামতের দিন যে দু’জন ব্যক্তির মামলা সর্বপ্রথম পেশ করা হবে, তারা হলো দু’জন প্রতিবেশী। (মিশকাত)

এ নিয়ে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করিম সা:-এর নিকট আরজ করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ভালো করছি নাকি মন্দ করছি তা কী করে জানব? নবী করিম সা: বললেন, যখন তোমার প্রতিবেশীদের বলতে শুনবে যে, তুমি ভালো করছ, তবে প্রকৃতই তুমি ভালো করছ। আর যখন প্রতিবেশী বলবে তুমি মন্দ করছ, তবে মনে করবে ঠিকই তুমি মন্দ করছ। (ইবনে মাজাহ)

রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেছেন, যার অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহিহ মুসলিম)
উপরি উক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, প্রতিবেশী লোকটি কোন ধর্মের অনুসারী, কোন মতের মানুষ, কোন বর্ণের ব্যক্তি, সে গরিব নাকি ধনী, শিক্ষিত নাকি বোকা তা ভাবতে বলা হয়নি। কোনো প্রকার গোত্র বা বর্ণের ভেদাভেদ দূরীভূত করে মানবকল্যাণের কাজে সবাইকে এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে। একজন মুমিনকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করতে। জগতের সব মানুষের প্রতি উদার মনোভাব পোষণ ও মানবীয় আচরণ প্রদর্শনে ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করেছে বেশ কঠোরভাবে। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে আল্লাহর বান্দাদের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে সব প্রকারের প্রতিবেশীর সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ করা। যা ঈমানের অন্যতম দাবি।

প্রতিবেশীর হকের বিষয়ে যা জানতে পারলাম ব্যক্তিগত জীবনে আমরা যদি তা আমলে আনতে পারি তবেই সুন্দর একটি পৃথিবী গড়া সহজ হবে। ইসলামের সুমহান আদর্শের বদৌলতে এই দুনিয়া হয়ে উঠবে একটি সুখী সুন্দর স্বপ্নিল বসুন্ধরা।