পাঠ্যবইয়ে এবারও এত ভুল!

শিক্ষাবার্তা ডেস্ক; পাঠ্যবইয়ে ভুলের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এজন্য গত বছর প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানসহ এর কর্মকর্তাদের তলব করে তুলাধুনা করেন হাইকোর্ট। তবু এবার ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের বইও ভুলে ভরা, আছে তথ্যবিভ্রাট। কালবেলার অনুসন্ধানে দেখা যায়, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে ৩০টির বেশি অসংগতি আছে। সবচেয়ে বেশি ভুল ধরা পড়েছে দেশের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখায়। অন্যদিকে, এসব বইয়ের বিভিন্ন পত্র আর পুরোনো সালের পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়েছে।

এবার দুই ধরনের বই ছাপিয়েছে এনসিটিবি। এর মধ্যে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে বই হাতে পেয়েছে। আর অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে বই পেয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণয়ন করা বইগুলোতে এখনো ভুল রয়েছে। এ ছাড়া সব বইয়েই কমবেশি বানান ভুল পাওয়া গেছে। হাইফেন, ড্যাশ, কোলনসহ বেশিরভাগ যতিচিহ্নের ব্যবহারও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক হয়নি।

নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ের ১৮১ পৃষ্ঠায় অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও গণহত্যাবিষয়ক অংশের প্রথম লাইনে বলা হয়েছে—১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশজুড়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী নির্যাতন, গণহত্যা ও ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে। অথচ হানাদারদের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ তাণ্ডব শুরু হয় ২৫ মার্চের রাত থেকেই। ওই রাতের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার। আরেকটি বাক্যে ২৫ মার্চ রাতের অত্যাচারের কথা বলা হলেও প্রথম লাইনটি যেভাবে দেওয়া হয়েছে, তাতে বিভ্রান্তির অবকাশ রয়েছে।

একই বইয়ের ২০০ পৃষ্ঠায় একটি অংশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বলতে গিয়ে লেখা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। আসলে এটি হবে, রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান বিচারপতি নয়, রাষ্ট্রপতি শপথ পড়ান। আর ২০৩ পৃষ্ঠায় সংবিধানের বিভিন্ন ভাগে কোন কোন বিষয় থাকে, তাতে লেখা ‘পঞ্চম ভাগে জাতীয় সংসদ’ আসলে এটি হবে ‘পঞ্চম ভাগে আইন সভা’।

নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ৬ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা আছে—চারটি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। দল চারটি হলো—আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দল। মূলত ৫টি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল। অন্য দলটি ছিল পাকিস্তান খেলাফতে রব্বানী পার্টি। এই দলের নাম বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

একই বইয়ের ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা—১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়ে জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এখানে হবে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। পৃষ্ঠা ১৬-তে লেখা—পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক্রমণ চালায় ও নৃশংস গণহত্যা ঘটায়। রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পের জায়গায় হবে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, আর পিলখানা ইপিআরের ক্যাম্প নয়, সদর দপ্তর ছিল।

পৃষ্ঠা ২২-এ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস হলো, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

নবম-দশম শ্রেণির পৌরনীতি ও নাগরিকতা বইয়ের ২৩ পৃষ্ঠায় আইনের প্রকারভেদে ব্যক্তিগত ও সরকারি আইনের কথা লেখা হয়েছে। আসলে দেশে ব্যক্তিগত আইন বলে কোনো আইন নেই। একই বইয়ের ৬৩ পৃষ্ঠায় লেখা—প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান সচিব। আসলে সচিব হচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং অফিসার। প্রশাসনিক প্রধান হন মন্ত্রী। বইয়ের ‘রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক’ অংশ গঠনগতকে লেখা হয়েছে ‘ঠনগত’। ‘প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য’-কে লেখা হয়েছে ‘প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য’। ‘অধীনস্থ’-কে লেখা হয়েছে ‘অধীনস্ত’। বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের বিভিন্নপত্রে সময় উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৯ ও ২০২১ সালের। বড়দিনকে লেখা হয়েছে বড়ো দিন।

অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ের ৯৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে—বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৪ ও ২০০৯ সালে। এখানে ১৯৮৭, ২০০০, ২০০৭ ও ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার উল্লেখ নেই। ১৩১ পৃষ্ঠায় সরকারি পর্যায়ে থাকা পেপার মিলগুলোর মধ্যে পাকশীর নামও আছে। অথচ এই পেপার মিল এখন বন্ধ। এ ছাড়া, সিমেন্ট ও সার কারখানার পুরনো সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে। ২২ পৃষ্ঠায় ‘ব্রিগেড ফোর্স’-কে লেখা হয়েছে ‘ব্রিগেড ফোস’।

নতুন বইয়ে পুরোনো ভুল:

২০২২ সালের পাঠ্যবইয়ের ভুল নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই আলোকে অল্প কিছু তথ্য সংশোধন করলেও অধিকাংশ ভুল তথ্যেই এবারের বই বের হয়েছে।

নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা বইয়ের ১৯৬ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে—মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহিদদের স্মৃতি চির জাগরূক রাখতে, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ স্থাপিত হয় শিখা চিরন্তন। সঠিক তথ্য হলো—৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের স্থান ও ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানকে জাগরূক রাখতেই শিখা চিরন্তন স্থাপিত হয়।

বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের ১৭৮ পৃষ্ঠায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে এবারও উৎসব হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ, একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৭৯ পৃষ্ঠায় স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে বিভিন্ন বাহিনীর কুচকাওয়াজের কথা লেখা হয়েছে। অথচ এটি হয় কেবল বিজয় দিবসে। আবার স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে কুচকাওয়াজের ভুল উল্লেখ করলেও বিজয় দিবস অংশে কুচকাওয়াজের কথাই লেখা হয়নি।

অষ্টম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের ১১১ পৃষ্ঠার নিমন্ত্রণ পত্রে পহেলা বৈশাখ ২০২১ উপলক্ষে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ২০২২ সালের মার্চ। এই শ্রেণির বইয়ের নমুনা আমন্ত্রণপত্রে ব্যবহার করা হয়েছে ২০২২ সালের তারিখ।

বেশিরভাগ বইয়ে পুরনো পরিসংখ্যান :
দেশ এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, বদলাচ্ছে সূচক। অথচ এনসিটিবির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের বই হলেও তথ্য ব্যবহার হয়েছে ২০১৫-২০২০ সালের।

নবম-দশম শ্রেণির ভূগোল ও পরিবেশ বইয়ের ১০৬ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে—২০১৭ সালে জনসংখ্যা ৭.৬ বিলিয়নে এসে দাঁড়িয়েছে। এই হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হতে থাকলে ২০৩০ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৮ বিলিয়নে। অথচ এখনই বিশ্বের জনসংখ্যা ৮ বিলিয়নের ওপরে।

অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে মানব উন্নয়ন সূচক, রেমিট্যান্সের পরিমাণে পুরোনো তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের আয়তন, জনসংখ্যা, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, সাক্ষরতার হার ইত্যাদি তথ্য দেখানো হয়েছে ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে। ফলে ২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত ডিজিটাল জনশুমারির ফল এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ২০২২ সালের জনশুমারির ফল প্রকাশ না করতে পারলে ২০২১ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এমএসভিএবি (তৃতীয়) প্রকল্পের প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক ২০২০’ থেকেও তথ্য নেওয়া যেত। সেটিও করা হয়নি। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর কমনওয়েলথের প্রধান পরিবর্তন হলেও ‘পৌরনীতি ও নাগরিকতা’ বইয়ে স্থান পেয়েছে রানির নাম।

নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর পুরোনো সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও মাথাপিছু আয় দেখানো হয়েছে ২০১৯ সালের আবার কোথাও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক রিপোর্ট-২০১৮ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো রিপোর্ট-২০২০ অনুসারে। মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প ও বাণিজ্য খাতের অবদান দেখানো হয়েছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের। মোট দেশজ উৎপাদনে অর্থনীতির খাতগুলোর অবদান দেখানো হয়েছে অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২০ অনুসারে। খাদ্যশস্য উৎপাদন পরিস্থিতি (অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২০), জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান, (২০১৬-১৭ অর্থবছর), বৈদেশিক বাণিজ্য (অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮), এইডস রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০১৬ সাল) ও সড়ক দুর্ঘটনা পরিস্থিতি দেখানো হয়েছে ২০০১-২০০৪ সালের।

মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য এখন কেন ব্যবহার হবে? এটা ঠিক হয়নি। এ ছাড়া অন্য ক্ষেত্রেও অবশ্যই আপডেট তথ্য ব্যবহার করতে হবে। কারণ, করোনার পরে দেশের পুরো দৃশ্যপটই বদলে গেছে।’

সমসাময়িক পরিসংখ্যান ব্যবহার না করার কারণ জানতে চাইলে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা উৎসে বলে দেই কত সালের পরিসংখ্যান। উৎস থাকায় সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এটা আগেই মীমাংসিত। সরকারি অর্থবছর জুন থেকে জুলাই, আর আমাদের বই বের হয় ডিসেম্বরে। ফলে আমাদের এক থেকে দেড় বছরের গ্যাপ থাকে। এটা থাকবেই। উৎসটা ঠিক থাকলেই হয়।’

পাঠ্যবইয়ের ভুলের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবি সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান বলেন, ‘যেগুলো ভুল বলা হচ্ছে, তার সবগুলোই ভুল এটা আমাদের মনে হচ্ছে না। আমরা আরও কী কী ভুল বের হয় সেটা দেখতে চাচ্ছি। সংশোধনের প্রয়োজন হলে কমিটি গঠন করে তাদের যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হবে। যাচাই শেষে বই সংশোধনে প্রয়োজনবোধে চিঠি দেব। আর ভুলের পরিমাণ বেশি হলে ডিউ পার্ট আকারে স্কুলগুলোতে পাঠিয়ে দিব ফেব্রুয়ারিতে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা সব ভুল পর্যালোচনা করে দেখেছি। আমাদের পর্যালোচনায় একটাই ভুল মনে হয়েছে। সেটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর শপথের তথ্য। আমরা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত নিচ্ছি। লিখিত মতামত নিয়ে ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধনপত্র স্কুলগুলোতে পাঠাব। বাকিগুলো পূর্বাপর লাইন পড়লে ভুল নয়। এরপরও আমরা সবগুলো ভুল শর্ট আউট করছি।’

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/০৯/২৩