পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন কে?

কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি- এমন আলোচনা এখন সর্বত্র। টানা দুই মেয়াদে দায়িত্বে থাকা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৩ এপ্রিল। সংবিধান অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রপতি দুবারের বেশি রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে পারেন না। সংবিধান সংশোধন করে আবদুল হামিদ আবার রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন কি না, এ নিয়েও আলোচনা আছে।
গতকাল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্ধারিত সময়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। আর সংবিধান সংশোধনের কোনো পরিকল্পনাও সরকারের নেই। সে জন্য অভিজ্ঞ ও দলমতের ঊর্ধ্বে জনপ্রিয় এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি আবদুল হামিদ আর পদে থাকতে পারছেন না। নতুন মুখই আসছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে- এটা নিশ্চিত।
কোন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি এবার বঙ্গভবনে আসীন হচ্ছেন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে এ বিষয়টি। যেহেতু বর্তমান সংসদে বিএনপি নেই, আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, এমপিদের দলের বাইরে ভোট দেওয়ার বিধান নেই, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের মনোনীত প্রার্থীই হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। দেখার বিষয় হচ্ছে, এ যাত্রায় কাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেন ক্ষমতাসীনরা। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরীসহ প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা, মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, সাবেক একজন প্রধান বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একাধিক উপাচার্যের নাম এ পদে আলোচনায় আছে।
রাষ্ট্রপতির চলতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিধান আছে সংবিধানে। সে অনুযায়ী দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে ২৪ জানুয়ারি থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। আইনজ্ঞদের মতে, প্রথম ৩০ দিনকে বোঝাবে। নির্বাচন কমিশনও তা-ই মনে করে।
সে অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারিতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু ও শেষ করতে হবে।রাষ্ট্রপতি সরাসরি ভোটে নয়, সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। তফসিল ঘোষণাসহ এ নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং স্পিকার হিসেবে দুবার দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি দলমত ঊর্ধ্বে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ¯েœহভাজন ছিলেন। আওয়ামী লীগের সর্বমহলে তিনি জনপ্রিয়। সুনাম ও সাফল্যের সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা, ডেপুটি স্পিকার ও দুবার স্পিকার হিসেবে। দীর্ঘ ৪২ বছরের অন্যতম প্রধান কর্মস্থল সংসদ থেকে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে। রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব পালনকালেও জনবিচ্ছিন্ন নন আবদুল হামিদ। তাঁর নিজের এলাকা কিশোরগঞ্জের মানুষ শত নিরাপত্তার মধ্যেও বঙ্গভবনে এসে ভিড় করেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য, কথা বলার জন্য বসে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সময় পেলেই ছুটে যান নিজ এলাকা মিঠামইনে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। নির্বাচন নিয়ে জটিলতা এড়াতে এ সময়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ ধরনের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় একজন দক্ষ, সাহসী এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিই রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকা জরুরি মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং সর্বশেষ ১৯তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন জিল্লুর রহমান। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কাকে দলের প্রার্থী করা হবে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। তবে ইতোমধ্যে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম আলোচিত হচ্ছে। যার নাম সর্বোচ্চ আলোচনায় আছে তিনি হলেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। দেশের জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। স্পিকার হিসেবে তিনি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিসরেও সুনাম অর্জন করেছেন। তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাকেও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন। নির্বাচনকালীন সময়ে যেহেতু রাষ্ট্রপতি পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে কারণে হয়তো তাকে রাষ্ট্রপতি পদে ভাবা হতে পারে। এ ছাড়াও সাবেক প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একাধিক ভিসির নামও আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক দুজন মন্ত্রীর নামও বলছেন কেউ কেউ। পরীক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হচ্ছে এমনটা আলোচনা আছে দলের ভিতরে-বাইরে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই বঙ্গভবনে বসানো হচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেবে সরকারি দল।